মঙ্গলবার ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় : রুটিন ভিসি মাহবুবের রুটিন অনিয়ম ও দুর্নীতি

আপডেটঃ ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ | অক্টোবর ২০, ২০১৯

সানজিদুর রহমান-বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়-:বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পেয়েই রুটিন বিরতিতে শুরু করে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা। এর আগেও সদ্য সাবেক ভিসির আস্থা ও আনুকুল্যের সুযোগ নিয়ে সে নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়মসহ ব্যাপক দুর্নীতি করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি আর কেউ নন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার এ কে এম মাহবুব হাসান। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে উপাচার্য না থাকায় সেই সুযোগে বিগত ৫ মাস ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নানা ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ছিল সে! এই সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এই কয়েক মাসে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।

ভিসি নিয়োগ না হওয়ায় একাডেমিক কাউন্সিল, অর্থ কমিটি এবং সিন্ডিকেট সভা হচ্ছে না বলে একদিকে অনেকটাই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে শিক্ষাকার্যক্রমে। অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলাদলি চরমে উঠেছে, নিজের স্বার্থ হাসিলে এতে সরাসরি ইন্ধন যোগাচ্ছে মাহবুব হাসান। নিয়ম লঙ্ঘন করে যথেচ্ছভাবে অর্থ ব্যয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অনুগত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের শারীরিক-মানসিকভাবে লাঞ্ছিত ও হেনস্থা করার ঘটনা ঘটছে প্রায়শই।  গত ৭ অক্টোবর তার মেয়াদ শেষ হলেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে চক্রান্ত করে যাচ্ছে সে।

এ সম্পর্কে বরিশালের শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ ও বরিশাল বিএম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক শাহ সাজেদা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগের ভিসিবিরোধী আন্দোলনে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তাদের নিয়ে ট্রেজারার মাহবুব হাসান সব সময় পরিকল্পনা করছেন। তিনি দালালবেষ্টিত থাকেন। বিরোধী মত দমন করেন।’

উপাচার্য হওয়ার শর্ত অনুযায়ী যোগ্যতা না থাকলেও ভিসি হওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে জোর তদবির করে যাচ্ছে এ কে এম মাহবুব হাসান। গত ৫ মাস বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে তার বেশি সময় কেটেছে ঢাকায়। কথিত আছে, নিজেই ভিসি হওয়ার জন্য সদ্য সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হকের নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তিনি যেন দ্বিতীয় মেয়াদে না আসতে পারে, এ জন্য ভিসিবিরোধী আন্দোলনে কলকাঠি নাড়ে মাহবুব হাসান। আন্দোলনকারীদের পেছনে অনেক অর্থও ঢেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ৭ অক্টোবর মেয়াদ থাকলেও ছুটির কারণে গত ৩ অক্টোবর ছিল তার শেষ কর্মদিবস।  কিন্তু সব কুর্কীতির ফাইল সরাতে তিনি ছুটির সময়েও কতিপয় বহিস্কৃত কর্মকর্তা বরুণ কুমার দে ও মোঃ আতিকুর রহমানকে নিয়ে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেছেন। অনেক ফাইল গায়েব করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগে জানা গেছে, প্রায় এক মাস উপাচার্যশূন্য থাকাবস্থায় গত ২৫ জুন উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পায় ট্রেজারার এ কে এম মাহবুব হাসান। এরপর থেকেই আগের ভিসির অনুসারী শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশকে শায়েস্তা করতে শুরু করে সে। নিয়ম অনুযায়ী রুটিন উপাচার্য বেতন-ভাতাদি পরিশোধ ছাড়া প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা খরচ করতে পারবেন। কিন্তু নিয়মবহির্ভুতভাবে গত ৪ মাসে পছন্দের বিভিন্ন ঠিকাদারকে প্রায় ১২ কোটি টাকার ঠিকাদারি বিলই পরিশোধ করেছে মাহবুব হাসান। 

জানা গেছে, তৎকালীন ভিসি ড. এস এম ইমামুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তহবিলে ৬৭ লাখ টাকা জমা রেখে যান। ভর্তি পরীক্ষা ইস্যুতে খরচের অজুহাত দেখিয়ে নতুন চেক বই তুলে ওই তহবিল থেকে রুটিন উপাচার্য মাহবুব হাসান লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ উপাচার্য ছাড়া অন্য কেউ এ তহবিলের টাকা তুলতে পারবে না বলে নীতিমালায় রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভর্তি পরীক্ষার খরচ মেটাতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি আবেদন থেকেও আয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। সে টাকারও কোনো হিসাব নেই। অথচ সদস্য সাবেক রুটিন উপাচার্য ও ট্রেজারার মাহবুব হাসান ভর্তি পরীক্ষার নামে মোটা অঙ্ক উত্তোলন করে এখন স্থায়ী উপাচার্য হওয়ার মিশনে নেমেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী মুরশিদ আবেদীন বলেন, ‘ট্রেজারার মাহবুব হাসান রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন ভিসির। অথচ ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও অনিয়ম করে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছেন। যেমন কম্পিউটার, প্রজেক্টর ক্রয় বাবদ ৭০ লাখ টাকার বিল করেছেন তিনি। রুটিন দায়িত্বে থেকে কোনোভাবেই এসব কাজ করতে পারেন না তিনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ট্রেজারার এ কে মাহবুব হাসান গত চার বছর একইসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ভাড়া নিয়েছে,  এটা নিয়মবিরুদ্ধ। এটি নিয়ে অডিট আপত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (ইউজিসি)। সরকারি কর্মকর্তা কেবল একটি জায়গা থেকে বাড়ি ভাড়া উত্তোলন করতে পারবেন, এটি সরকারি বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে। তিনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে ২০ হাজার বাড়িভাড়া নিলেও থেকেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজে, সেখানে ভাড়া বাবদ কর্তন করেছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা। গত চার বছরে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছেন ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে বিনাবেতনে অস্থায়ী প্রভাষককে পিএইচডি করার অনুমতি দিলেও, মাহবুব হাসান সিন্ডিকেটকে ডিঙিয়ে একক ক্ষমতা দেখিয়ে প্রভাষক তানিয়া ইসলাম ও আতিকুল হক ফরাজীকে ১২ লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টাকা বিল পরিশোধ করেছে, যা সুম্পষ্ট অনিয়ম। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কর্তৃক বিনাবেতনে ছুটিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কীভাবে তিনি ছুটির সময়কালের বেতনভাতা পরিশোধ করতে পারেন, এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। 

কথিত আছে, আতিকুল হক ফরাজী ও তানিয়া ইসলাম তার নানা কুকর্মে সহযোগিতা করেছে বলে অবৈধভাবে এই পুরস্কার দিয়েছে মাহবুব হাসান। আতিকুল হক ফরাজী নানা সময় গোপনে সাবেক ট্রেজারার মাহবুবের হয়ে কাজ করেছে। তানিয়া ইসলাম সাবেক ট্রেজারারের পাশের গ্রামের বলে জানা গেছে। এসব কারণে বিধিবর্হিভুতভাবে ও সিন্ডিকেটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখি আতিকুল হক ফরাজী ও তানিয়া ইসলামকে ১২ লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টাকা দিয়েছে, যা সুস্পষ্ট অনিয়ম, অন্যায় ও অপরাধ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা নানাভাবে খরচ দেখিয়ে তা নিজের উপাচার্যের স্বপ্ন পূরণ করার তদবিরের পেছনে ব্যয় করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যেক বিভাগে ফ্রিজ, ওভেন ও ফটোকপিয়ার মেশিন ক্রয়ের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মাহবুব হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ে রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরে জন্য ফ্রিজ ও ওভেন কেনাকাটা করছেন। সে এ কাজের জন্য নিয়মমাফিক কোনো টেন্ডার, কোটেশন ছাড়াই দশ লক্ষ টাকা মালামাল ক্রয় করেন। প্রাক্কলন ও পন্য যাচাই যারা এই বিল সে পরিশোধ করে। কেনাকাটার জন্য প্রকৌশল শাখা জানানোর নিয়ম থাকলেও এই কাজের জানানো হয়নি। 

সাদেক হোসেন খোকার আমলে ঢাকা সিটি কপোরেশনে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিয়োগকৃত ও পরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া বহিস্কৃত কর্মকর্তা বরুণ কুমার দে, আরেক শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আতিকুর রহমান, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মোঃ মুহসীন উদ্দিন, মোঃ আরিফ হোসেন, তানভীর কায়ছার, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক জ্যোতির্ময় বিশ্বাসসহ অনেকেই ছিল তার কুকর্মের সঙ্গী।

প্রথম ভিসি হারুনুর রশীদ খানের সময় অনার্স ও মাস্টার্সে দ্বিতীয় শ্রেণি নিয়েও নিয়মবহির্ভুতভাবে নিয়োগ পায় ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোঃ আরিফ হোসেন। ইংরেজি বিভাগের অযোগ্য ও অদক্ষ এ শিক্ষককে নিয়ে সাবেক ভিসির আমলে প্রশ্ন ওঠে এবং তা বিতর্কের জন্ম দেয়। বিতর্কিত ও অযোগ্য শিক্ষক মোঃ আরিফ হোসেন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অনুসারী শিক্ষকরা ট্রেজারার মাহবুব হাসানের কাছে নানা অবৈধ ও অনৈতিক সুবিধা নেয়। মাহবুব হাসান এসব শিক্ষকদের দ্বারা অন্যদের নানাভাবে হেনস্তা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সিনিয়র শিক্ষক, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. হাসিনুর রহমানকে কুৎসিত ও নোংরাভাবে অপমান অপদস্ত করার কারণে তিনি আন্দোলনের পর থেকে স্বেচ্ছাছুটিতে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। আন্দোলনের ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার হুমকির মুখে তিনি এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারেননি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিরোধী মত দমনে নামে এ কে এম মাহবুব হাসান। প্রায়শই তিনি সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ধমকাচ্ছেন, প্রকাশ্যে চাকরি খেয়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন ও নানা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। শিক্ষক-কমকর্তাদের নানাভাবে হেনস্তা, যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়াই শোকজ, অনুগত কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা ও হেনস্থা করেন তিনি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর তার ইন্ধনে উপ-পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) সুব্রত কুমার বাহাদুরকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করেন ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আতিকুর রহমান। এ নিয়ে সুব্রত কুমার বাহাদুর রুটিন ভিসি মাহবুবের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ রুটিন ভিসির পছন্দের লোক আতিকুর রহমান। রুটিন ভিসির প্রশ্রয় ও ইন্ধনে এভাবে অনেককে নাজেহাল করেছেন তিনি।

এ ছাড়াও মাহবুব হাসানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আতিক কিছুদিন আগে অর্থ ও হিসাব শাখার এক কর্মকর্তার রুম দখল করে তাকে বের করে দিয়ে এই বিভাগে কাজ করা শুরু করে। আর্থিক অনিয়ম করতে সহকারী পরিচালক মোঃ আতিকুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার বরুণ কুমার দে-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মাহবুব হাসান। অর্থ ও হিসাব শাখার বহিস্কৃত সহকারী রেজিস্ট্রার বরুণ কুমার দে সম্প্রতি হিসাব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেনের কক্ষ দখল করে বসা শুরু করেন। বহিস্কৃত হয়েও তিনি এই দাপট দেখাতে পেরেছেন মাহবুব হাসানের অপকর্মের সঙ্গী ও ছত্রছায়ায় থাকেন বলে।

অনুগত কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অপমান ও হেনস্থা করা এই কয়েক মাসে ছিল রুটিন ঘটনা। মাহবুব হাসানের মানসিক অত্যাচারে আইটি প্রকৌশলী এস এম আবরার জাহিন চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বুয়েটিয়ান এ প্রকৌশলীকে টানা পাঁচদিন মানসিকভাবে হেনস্থা করে সে। আগের ভিসির শেষ সিন্ডিকেটে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি পেলেও যোগদান করতে গিয়ে অপমান-অপদস্ত হন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের উপ-পরিচালক মোঃ হুমায়ুন কবীর ও সহকারী পরিচালক  মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, প্রকৌশল কার্যালয়ের  নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মুরশীদ আবেদীন এবং অর্থ ও হিসাব দপ্তরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার বাহাদুর। সহকারী রেজিস্ট্রার নিত্যানন্দ পালকে নানাভাবে হেনস্থা করে মাহবুব হাসান। ভয়ে বেশ কিছুদিন সে বরিশালে প্রবেশ করতে পারেনি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের দোকানে চা খাওয়ার ‘অপরাধে’ সম্প্রতি  প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মামুন অর রশিদ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের সেকশন অফিসার আবু হাচান, অর্থ দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ হাসিব মিয়াসহ কয়েকজনকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে গালাগালাজ করে ও হুমকি দেয় মাহবুব হাসান। এভাবে সামান্য কারণে ডেকে খারাপ আচরণ করা ছিল নিত্য ঘটনা।

গত রমজান মাসে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযানের উদ্বোধন করে রুটিন ভিসি মাহবুব হাসান। কিন্তু পরিচ্ছন্নতায় খরচ দেখিয়ে তিনি তার অনুগত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরা সবাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নেতৃত্বস্থানীয় চিহ্নিত ছাত্র। এটিকে সাবেক ভিসি হটানোর ও তাকে সমর্থনের জন্য উপহার হিসেবেও দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাড়াই এসব ছাত্রদের জন্য গত রমজান মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ খরচ করে ইফতার পার্টিও দিয়েছে মাহবুব হাসান। 

এ কে এম মাহবুব হাসান গত চার মাসে বৃক্ষরোপন ও পরিষ্কার পরিছন্নতা অভিযানের নামে গুটিকয়েক শিক্ষক-কর্মকর্তা-ছাত্রদের নিয়ে ভাগাভাগি করে লুটে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। গত চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদে অপরিকল্পিত ও লোক-দেখানো বৃক্ষরোপন অভিযানের সূচনা মাহবুব হাসান প্রথম করেছে, যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরল ঘটনা। এসব লোক-দেখানো কর্মকাণ্ড করে ফটোসেশনে ব্যস্ত থাকলেও পাঁচ মাসে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও বাৎসরিক ক্যালেন্ডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারেননি রুটিন ভিসি। ২৬শে মার্চ সার্ভারে অগ্নিকান্ডের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ নেই, ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়নি।

পছন্দের ঠিকাদার না হলে মাহবুব হাসান বিল আটকে দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় দিবস, মহান ২৬শে মার্চের বিল সে দেয়নি। এ ছাড়াও আলোকসজ্জা কাজের জন্য মাহবুব হাসানের হয়ে ঠিকাদার নজরুল ইসলামের কাছে ১০% চাঁদা দাবি করে তার বিশ্বস্ত সহযোগী মোঃ আতিকুর রহমান। সেই ঠিকাদার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কখনও কাজ করবে না বলে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ও ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে ডেকোরেশনের কাজের তিন লক্ষ টাকার বিল না দেওয়ার কারণে স্ট্রোক করে মারা গেছেন ঠিকাদার অংকন ডেকোরেটরের মালিক পংকজ রায়। তিনি বিলের জন্য ট্রেজারার মাহবুব হাসানের দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন।

কথিত আছে, ভিসি ইমামুল হকের কার্যকালের শেষ পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা তৈরি করতে ট্রেজারার মাহবুব হাসানের ইন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভার রুমে গত ২৬শে মার্চ পরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তার ইন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ‘পুকুরচুরি’র ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সব সোলার ব্যাটারি চুরি, ভিসির বাসভবনে চুরি, ডরমিটরিতে চুরিতে ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এর ভাগ-বাটোয়ারার সঙ্গে এ কে এম মাহবুব হাসান নিজেও জড়িত বলে তার অনুগতরা সিসি ক্যামেরায় চুরির ঘটনায় ধরা পড়ার পরও এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি তার পছন্দের প্রকৌশলী ‘প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ট্রাস্ট ভবন-এর দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী দপ্তরের আবু মুহাম্মদ বসিরকে দিয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের নামে ৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে। অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বসিরের নামে ২০১৬ সালে ঠিকাদারের বিদ্যুৎ বিল ১৬ লক্ষ টাকা আগের ভিসি ইমামুল হক পরিশোধ না করলেও মাহবুব হাসান বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে দেয়। বসিরও তার অন্যায়-অনিয়মের অংশীদার, এ কারণেই এ পক্ষপাতিত্ব করে সে।

শিক্ষক-কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে গেলে যে কেউ আঁতকে উঠবে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়, না বস্তি! অনুসারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দ্বারা একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের সব জায়গায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের নামে নোংরা দেয়াল লিখন করে এ কে এম মাহবুব হাসান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে বস্তি বানিয়ে রেখেছিল। বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক কর্মকর্তাদের নাম ও পদবি উল্লেখ করে লাল কালিতে বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে, ‘আমরা ভিসি ইমামুল হকের পা চাটা দালাল। আমাদের থুথু মারুন’। এসব দেয়াললিখন মাহবুব হাসানের সরাসরি নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় করা হয়েছে- এমনটি স্বীকার করেছেন খোদ সাবেক ভিসিবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় শিক্ষক-কর্মকর্তারাও। প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্বে থেকে এমন হীন, কুরুচিপূর্ণ কর্মকাণ্ড দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ দেয়াললিখন মুছে দেওয়া ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করা ট্রেজারার এ কে এম মাহবুব হাসান বরাবর একাধিকবার লিখিত দিলেও সে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়নি। নিজে এর পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে বলে দেয়াললিখনের সিসিটিভি ফুটেজ থাকলেও এ বিষয়ে সে বরাবরই নীরব। পরে শিক্ষক সমিতি উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি এসব দেয়াললিখন মুছে দেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা জানান, ‘ভিসি হটানোর পেছনে ইন্ধন যোগানোর তার (মাহবুব হাসান) একটিই উদ্দেশ্য ছিল, নিজে উপাচার্য হওয়ার উচ্চাশা পূরণ করা। তিনি নিজেও ছিলেন সাবেক ভিসির নিয়োগপ্রাপ্ত ও আস্থাভাজন। ভিসি হটিয়ে রুটিন উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়েই ট্রেজারার বিরোধী মতের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শায়েস্তা করতে নামেন। দেয়ালে দেয়ালে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের নামে নোংরা দেয়াললিখন কয়েক মাস ধরে শোভা পায়! পরিস্থিতির পরিবর্তন তো দূরাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এখন আগের চাইতে অনেক খারাপ হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা পরিচয় দিতেই লজ্জা লাগে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, মাহবুব হাসানের নারীঘটিত সমস্যা নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে জানাজানি হলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। সুন্দরী নারী শিক্ষকদের প্রতি তার রসময় কথোপকথন অন্য শিক্ষকদের অস্বস্তিতে ফেলে। সে প্রায়ই তার কক্ষে নারী শিক্ষকদের ডেকে পাঠাত। নারী শিক্ষকরা একসময় উঠতে চাইলে বলত, ‘আরে, বসো বসো। তোমাদের মতো সুন্দরীরা সামনে থাকলে কাজে উদ্দীপনা আসে।’ অনেক নারী শিক্ষকই এ ধরনের মন্তব্যে অস্বস্তিতে পড়েন।

৭ অক্টোবর ট্রেজারার মাহবুব হাসানের ৪ বছরের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক সম্মান প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৮ ও ১৯ অক্টোবর। ভিসি না থাকায় ভর্তি পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কমিটির সদস্য এবং বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ ইউনুস বলেন, ‘আগের ভিসি চলে যাওয়ার পর অভিভাবকহীন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ৬ মাস ধরে সিন্ডিকেট মিটিং নেই। ট্রেজারারের মেয়াদও ৭ অক্টোবর শেষ। দ্রুত ভিসি নিয়োগ হওয়া দরকার।’

সার্বিক বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন উপাচার্য ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মাহবুব হাসান বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা তহবিল থেকে মাত্র ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে বিভিন্ন কমিটিকে দিয়েছি। নানা অভিযোগের বিষয়ে যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা সে দিতে পারেনি। তার এ বক্তব্য মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয় বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তারা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অচলাবস্থা নিরসনে অতি দ্রুত যোগ্য একজন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সহকারী অধ্যাপক আবু জাফর মিয়া বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ ভিসি না থাকায় একাডেমিক, অর্থ ও সিন্ডিকেট সভা হচ্ছে না ছয় মাস ধরে। ফলে সিলেবাস ও ফলাফল কার্যত অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না। খণ্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ হচ্ছে না। অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। এমন অবস্থা কাটিয়ে তুলতে পূর্ণাঙ্গ ভিসি নিয়োগ দেওয়া জরুরি।’