মঙ্গলবার ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

মহাকাশ ভ্রমণে যুগান্তকারী যত উদ্ভাবন….

আপডেটঃ ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ | নভেম্বর ০৩, ২০১৯

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক :বহুকাল আগ থেকে ঘুরতে থাকা মহাকাশ গবেষণার চাকা বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রবল বেগ পেয়েছে। মানুষ এখন মঙ্গল কিংবা চাঁদে উপনিবেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। কেবল স্বপ্ন দেখছে বললে ভুল হবে, স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেকদূর এগিয়েও গেছে। পৃথিবীর কক্ষপথে মহাকাশ স্টেশনে বিজ্ঞানীরা স্বশরীরে কাজ করছে বছরের পর বছর, বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহে মানুষের তৈরি মহাকাশযান পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত। প্রত্যেক বছর মহাকাশ গবেষণায় খরচ করা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল এবং বৃহৎ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বাৎসরিক বাজেট ২১ বিলিয়ন ডলার। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেটের ০.৪৯%।

দীর্ঘদিন যাবত সরকারিভাবে বিশ্বের অনেক দেশ মহাকাশ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও মহাকাশে মানবজাতির পদক্ষেপে নেতৃত্ব নিতে শুরু করেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশ কয়েকটি উদ্ভাবনী সংস্থার পাঠানো মহাকাশযান উড্ডয়নের সময় এবং উড্ডয়নের পরপরই ক্র্যাশ করেছে। বেশ ব্যয়বহুল এই গবেষণাক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ এবং ধৈর্যশক্তির। তা না হলে এই সেক্টরে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যায়। প্ল্যানেটারি রিসোর্স এবং ডিপ স্পেস নামের দুইটি স্টার্ট-আপ মহাকাশে খনির সন্ধানে তাদের কার্যক্রম শুরু করে ব্যর্থ হয়, কিছুদিনের মধ্যেই তারা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। তবে প্রতিটি ব্যর্থতাই সফলতার নতুন দ্বার উন্মোচন করে।

সম্প্রতি বেসরকারি রকেট নির্মাতা সংস্থা স্পেস এক্স এমন একটি রকেট সিস্টেমের প্রটোটাইপ প্রকাশ করেছে যা মঙ্গলগ্রহে বাণিজ্যিকভাবে মানুষ পাঠানোর কাজে ব্যবহার করা হবে। ইতোমধ্যে স্পেস-এক্স বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে একটি মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে।

মহাকাশ শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে বরং বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন সুবিধা চালু করতে যুগান্তকারী ১১ উদ্ভাবন নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

* পুনরায় ব্যবহারযোগ্য এবং রুটিন ফ্লাইট পরিচালনা করতে সক্ষম রকেট

মহাকাশ গবেষণায় সবচেয়ে বড় এবং সফল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্পেস এক্স এমন ধরনের রকেট তৈরি করেছে যা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য। অর্থাৎ বিমানের মতো করেই রুটিন ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে রকেটের মাধ্যমে।

বাণিজ্যিকভাবে মহাকাশে কার্যক্রম চালানো উদ্দেশ্যে ২০০২ সালে ইলন মাস্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্পেস এক্স। কক্ষপথে সফল উড্ডয়নের ১১ বছর পর ইলন মাস্ক ৫০ এর দশকের সাইফাই উপন্যাসের প্রচ্ছদের রকেটগুলোর মতো এমন রকেট তৈরি কাজে হাত দেন যা ভার্টিকালি (উল্লম্বভাবে) অবতরণ করতে এবং উড়তে পারে। ইলন মাস্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল বারবার ব্যবহারযোগ্য এরকম একটা রকেট তৈরি করা।

ইতোমধ্যে স্পেস এক্স ৫২ বার চেষ্টায় পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ৪৪টি বুস্টারকে সফলতার সাথে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছে। অবতরণের পর সামান্য সংস্কারের পরেই বুস্টারগুলোকে পুনরায় উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছিল। এই রকেটের মাধ্যমে রুটিন ফ্লাইট পরিচালনা করে অনেক কম খরচে পৃথিবীর কক্ষপথে, চাঁদ, এমনকি মঙ্গলে নিয়মিত যাতায়তের পরিকল্পনা করছে স্পেস-এক্স।

উল্লেখ্য যে, বর্তমানে মহাকাশে যেসব রকেট পাঠানো হয় তা একবারই ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ মহাকাশে পাঠানো রকেটের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। তার আগেই রকেটটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয় অথবা নিজ থেকেই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি এই সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করে দেখিয়েছে স্পেস-এক্স।

মহাশূন্যের ৫০ মাইলের-ও বেশি উঁচুতে ২০ মিনিটের জন্য মহাকাশ পর্যটকদের ভ্রমণ করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভার্জিন গ্যালাকটিক

২০০৪ সালে স্পেসশিপ-ওয়ান নামে একটি এয়ার-লাঞ্চড রকেট তিনজন ক্রুকে মহাকাশে নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে দুইবার সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলারের আনসারী-এক্স পুরস্কার অর্জন করেছিল। এটা এমন এক অর্জন ছিল যা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযানে করে মহাকাশ পর্যটদের মহাকাশ ভ্রমণের যুগের যাত্রা শুরু করেছিল। এ অর্জনের পরপরই ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রানসন বাণিজ্যিকভাবে মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভার্জিন গ্যালাকটিক প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্পেসশি-টু এর কাজ শুরু করে দেন। এবার তার উদ্দেশ্য ছিল, এমন একটা রকেট তৈরি করা যা ছয়জন যাত্রী এবং দুইজন ক্রুসহ মহাশুন্যের সীমান্তে পৌঁছে যাত্রীদের কয়েক মিনিটের জন্য জিরো গ্র্যাভিটি (মহাকর্ষহীনতা) অনুভবের সুযোগ করে দেবে।

যদিও ভার্জিন গ্যালাকটিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তবুও তাদের তৈরি প্রোটোটাইপটি দুইবার মহাশুন্যের ৫০ মাইল গভীরে ভ্রমণ করে এসেছে। এছাড়াও আমেরিকান মানদণ্ডে স্পেসফ্লাইট হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে সম্প্রতি এফএএ কারমান লাইনে মহাশুন্যের নতুন সীমানা নির্ধারণ করেছে, যা ৬২ মাইল উঁচু।

ভার্জিন গ্যালাকটিক নিউ ম্যাক্সিকোর লাস ক্রুসেস এ তাদের স্পেসপোর্ট নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে এবং আরো দুইটি স্পেসশিপ-টু তৈরির কাজ করছে। বাণিজ্যিকভাবে মহাকাশে রুটিন ফ্লাইট কবে থেকে নিয়মিত হবে জানানো হয়নি। তবে ভার্জিন গ্যালাকটিকের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রানসন এ বছর বলেছেন, ‘আমি আগামী বছরই মহাকাশে যাচ্ছি।’

বোয়িং সিএসটি-১০০ স্টারলাইনার, পরবর্তী প্রজন্মের ক্রু ক্যাপসুল যা বেসামরিক পর্যটকদের মহাকাশ স্টেশন ভ্রমণ করাতে সক্ষম

বোয়িং সিএসটি-১০০ স্টারলাইনার জিমিনি এবং অ্যাপোলো মিশনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি মূলত নভোচারীদের মহাকাশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তৈরি একটি ক্রু ক্যাপসুল। প্রথম দেখায় বোয়িং সিএসটি-১০০ স্টারলাইনারকে অ্যাপোলো ক্যাপসুলের আধুনিক সংস্ক্ররণ বলেই মনে হবে। তবে এই ক্যাপসুলটি অধিক সংখ্যক যাত্রী বহনে সক্ষম। এটি সাতজন ক্রুকে বহন করতে পারবে এবং প্রায় সাত মাস কক্ষপথে ঘুরে বেড়াতে পারবে বলে জনিয়েছে নাসা। নাসা এই ক্যাপসুলটিকে ১০ বার পর্যন্ত পুনঃব্যবহারের উপযোগী হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে। তবে নাসা স্টারলাইনারকে পরবর্তীতে তাদের বাণিজ্যিক স্পেসশাটলের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট তৈরি করছে স্পেস-এক্স

২৮ সেপ্টেম্বর, স্পেস-এক্স প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক স্টারশিপের সবশেষ প্রটোটাইপটি উন্মোচন করেন। এই স্টারশিপটি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট হতে চলেছে। এটিকে দুটি ধাপে ডিজাইন করা হয়েছে। এর প্রটোটাইপ ডিজাইনে দেখানো হয়েছে, মূল স্পেসশিপটি একটি হেভি বুস্টারের উপর বসানো আছে। আগামী দুই বছরের মধ্যেই এটি মহাকাশে উড়ে যাবে ধারণা করা হচ্ছে।

‘স্যাটার্ন ভি’ যা এ পর্যন্ত ৯ বার মানুষকে চাঁদে পাঠিয়েছে, লো আর্থ অরবিটে এটি ১৩০ টন জ্বালানি বহনে সক্ষম। অপরদিকে স্পেস-এক্সের এই স্টারশিপটিকে ১৫০ টন জ্বালানি ধারণক্ষমতা নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। পৃথিবী থেকে উড্ডয়ন এবং পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জ্বালানি একসাথেই ধারণ করতে পারবে এই স্টারশিপটি।

সর্বোচ্চ শক্তি অর্জনের জন্য এই রকেটটিতে তরল মিথেন এবং তরল অক্সিজেন পুড়িয়ে ২৪টি র‌্যাপ্টর ইঞ্জিন চালু রাখা হবে। এই রকেটের সাথে সোভিয়েত এন-ওয়ানকে তুলনা করা হলেও সোভিয়েত ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি ওই রকেট এখনও ভুপৃষ্ঠ থেকে ২৫ মাইলের উপরে উঠতে পারেনি। কারণ তারা ৩০টি ইঞ্জিন ব্যবহার করলেও ইঞ্জিনগুলোকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়নি। তবে স্পেস-এক্স সফলতার সাথে ইঞ্জিন ক্লাস্টার এবং ফায়ারিং নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে এক্সিয়োম

আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র বা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের ভাগ্য অনেকটা অনিশ্চিত। কারণ এর আয়ুষ্কাল শেষ হতে চলেছে আগামী পাঁচ বছর পর। এরপর এটিকে কোনো বাণিজ্যিক অপারেটরদের কাছে বিক্রি করা বা ডিওরবিটেড করে প্রশান্ত মহাসাগরে বিধ্বস্ত করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তবে ইতোমধ্যেই মহাকাশ স্টেশনের শুন্যস্থান পূরণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে এক্সিয়োম নামক একটি প্রতিষ্ঠান। মহাকাশ গবেষণা এবং মহাকাশ পর্যটন শিল্প উভয়ের সুবিধার্থে আলাদা একটি স্পেস স্টেশন নির্মাণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এক্সিয়োম নামের এই প্রতিষ্ঠানটি।

তবে এক্সিয়োমই মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে ইচ্ছুক একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু নাসার সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করছে তারা এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের একজন প্রোগ্রাম ম্যানেজারও জড়িত আছে তাদের সাথে। এক্সিয়োম ১০ দিনের জন্য নিয়মিত মহাকাশ স্টেশন পরিদর্শনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২০ সালের পর থেকে তারা মহাকাশ স্টেশনে নিজস্ব মডিউলগুলো বসিয়ে তা চালু করা শুরু করবে।

এক্সিয়োম জানিয়েছে ১.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়েই তারা সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে নাসার ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৬০ বিলিয়ন ডলার।