সোমবার ২০শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং ৭ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

ইতিহাসে ৬ ডিসেম্বর: বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত…

আপডেটঃ ২:০২ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক :চ্যানেল সেভেন – : ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ছিল সোমবার। এ দিনটি ছিল স্বাধীনতাকামী জনতার জন্য খুবই সুখের দিন। কোমল হৃদয়ের বাঙালিরা যে সময়ের প্রয়োজনে পাথর-কঠিনও হতে পারে তা জানিয়ে দিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। ঢাকা বিমানবন্দর অকেজো হওয়ায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাইলটগণ তৃতীয় দেশের সাহায্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। এদিন দখলমুক্ত হয় যশোর ও কুড়িগ্রামসহ বেশকিছু জনপদ। দেশের প্রথম মুক্ত জেলা শহর হিসেবে নিজেদের নাম ইতিহাসে লিখিয়ে নেন যশোর বীরযোদ্ধারা।
এদিকে ভারত এদিন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সংসদে দাঁড়িয়ে ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর সূত্র ধরে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত কবি আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক গ্রন্থে এদিনের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- ‘নিয়াজীর নির্দেশে পাকবাহিনী বেসামাল হয়ে পড়ে। এগোনো অসম্ভব, পিছু হটা আরও অসম্ভব। ময়নামতি, জামালপুর, হিলি, চট্টগ্রামে ওরা যেভাবে ছিলো সেভাবেই রয়ে গেল কিন্তু সিলেট এবং যশোরের ঘাঁটি ছেড়ে পালালো। মিত্রবাহিনী একই চেষ্টা করছে যাতে পাকবাহিনী কোথাও জড়ো হতে না পারে। এরই মধ্যে (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তুমুল করতালির মধ্যে সংসদে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করলেন। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণ বিপুলভাবে মিত্রবাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে এলেন। একজন অধ্যাপক টিনের বহর মাথায় নিয়ে গেছেন তিন মাইল, মহিলারা পর্যন্ত ব্রিজ তৈরিতে সাহায্য করেছেন।’
এদিন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে কূটনৈতিক স্বীকৃতি। বেলা এগারোটার সময় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ মারফত ঘোষণা করা হলো, ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতের পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব উত্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘বাংলাদেশের সব মানুষের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ এবং সেই সংগ্রামের সাফল্য এটা ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট করে তুলেছে যে তথাকথিত মাতৃরাষ্ট্র পাকিস্তান বাংলাদেশের মানুষকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ অসমর্থ। বাংলাদেশ সরকারের বৈধতা সম্পর্কে বলা যায়, গোটা বিশ্ব এখন সচেতন যে তারা জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়, জনগণকে প্রতিনিধিত্বকারী অনেক সরকারই যেমনটা দাবি করতে পারবে না। গভর্নর মরিসের প্রতি জেফারসনের বহু খ্যাত উক্তি অনুসারে বাংলাদেশের সরকার সমর্থিত হচ্ছে ‘পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত জাতির আকাঙ্ক্ষা বা উইল অব দ্য নেশন’ দ্বারা। এই বিচারে পাকিস্তানের সামরিক সরকার, যাদের তোষণ করতে অনেক দেশই বিশেষ উদগ্রীব, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণেরও প্রতিনিধিত্ব করে না।’
পাকিস্তান সরকারের আমলা, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের সচিব ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম তার ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ গ্রন্থে সেদিন ভারত সরকারের তৎপরতার কথা স্মরণ করেন এভাবে, ‘৬ ডিসেম্বর সকালে আমরা কয়েকজন সচিব ও কর্মকর্তা ভারতীয় উচ্চপর্যায়ের সফরকারী দলের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়। ভারতীয় দলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। বৈঠক চলার সময়েই লক্ষ্য করলাম চারদিকে একটা চাঞ্চল্য। পাশের ঘরে রেডিও শোনা যাচ্ছে। গভীর আগ্রহের সঙ্গে ভারতীয় কয়েকজন কর্মকর্তা রেডিও শুনছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে ভাষণ দিচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিসেস গান্ধীর দৃঢ় এবং সুস্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে এল। ভারত সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারতীয় পার্লামেন্টে তুমুল হর্ষধ্বনি আর করতালি দিয়ে সকলে সংবাদটিকে স্বাগত জানালেন। বিকেল ৪টায় অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের অফিস কক্ষে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হলো কয়েক ঘণ্টার ব্যবস্থায়। এতে বিশেষ কয়েকটি বিষয় সংশ্লিষ্ট ছিল বিধায় সচিবরা নিজেদের মধ্যে কার্যপত্র প্রস্তুতের দায়িত্ব বণ্টন করে নিয়েছিলেন।’
আরও কিছু দালিলিক প্রমাণে পাওয়া যায়, সেদিন ভারতের লোকসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য শেষ না হতেই ভারতের সংসদ সদস্যদের হর্ষধ্বনি আর ‘জয় বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে ফেটে পড়ে।
তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান ও আজাদ-এর খবর অনুযায়ী, এদিন ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সরকারকে বৈধ সরকার বলেও ঘোষণা দেন। মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দেওয়া এক চিঠিতে ইন্দিরা গান্ধী তার এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তার আগেই ভুটানের রাজা জিগমে ওয়ানচুক বাংলাদেশের বাস্তব অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে বৈধ বলে স্বীকার করে নেন। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় পাকিস্তান এদিন ভারতের সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় উপ-নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। এ নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল।