মঙ্গলবার ২০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

নরসিংদীতে নিরবচ্ছিন্ন এক করোনা যোদ্ধা মোঃ শাহ আলম মিয়া…

আপডেটঃ ৪:৩০ অপরাহ্ণ | মে ২৬, ২০২০

নিজস্ব প্রতিনিধি -: নরসিংদী থেকে : রাত তিন টা ঘড়ির কাটায়। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকী, রাত পোহালেই ঈদের নামাজ ,গৃহে অন্ত:সত্বা স্ত্রী অধ্যাপিকা মাশরোয়া জাহান আশা এবং বৃদ্ধা মাতা অজুবা বেগম। ঘরে নেই গৃহকর্তা নরসিংদী সদর এসি(ল্যান্ড) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়া ।
নরসিংদীর জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং দেশের অভ্যন্তরে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটি, নরসিংদী এর সম্মানিত সভাপতি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন এঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কুইক রেস্পন্স টিমের আহবায়ক ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়া নরসিংদী সদরের পশ্চিম কান্দাপাড়া এলাকায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারী অনিল চন্দ্র সাহা (৬৭)-এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে চলে গেছেন মেঘনার পাড়ে বেপারীপাড়া শ্মশানঘাটে।
সৎকারের কাজ ২৪মে দিবাগত রাত ১১ টায় শুরু হয়ে ২৫মে ঈদের দিন ভোর ৩ টায় শেষ হয়। এসময় জেলা প্রশাসনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রইছ আল রেজুয়ান ও ফায়ার সার্ভিস এর সদস্যরা তাকে সহযোগিতা করেন।
শুধু অনিল সাহা নয়, লাশের অন্তেস্টিক্রিয়ায় সামাজিক বাঁধা দূর করতে দিনে-রাতে তিনি শ্মশানে ছুটে যাচ্ছেন পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে । মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে বৌয়াকুড় এলাকার বলরাম দাস ও নিখিল দাস,দত্তপাড়ার সুধীর সাহা, মাধবদীর শংকর ধরের লাশ দাহ করেছেন ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহআলম মিয়া নিজে উপস্থিত থেকে।
করোনা মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র ৩১নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে নরসিংদীর জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং দেশের অভ্যন্তরে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটি, নরসিংদী-এর সম্মানিত সভাপতি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন কর্তৃক করোনা বিষয়ে নরসিংদী সদর উপজেলার কুইক রেসপন্স টিমের আহবায়ক-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে দিন-রাত যিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন , যার কাছে সময়ের কোন বালাই নেই, করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয় যাকে স্পর্শ করতে পারেনি,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে,মানুষকে স্বচেতন করে, করোনা আক্রান্তদের প্রতি সদয় করতে যার কোন বিকল্প নেই এবং ইতোমধ্যে যিনি নিজ কর্মগুণে নরসিংদীবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন তিনিই হলেন- নরসিংদী সদর এসি(ল্যান্ড) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়া।
গত ১৬মে,২০২০ শনিবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যূবরণকারী বলরাম দাস-এর মূত্যূর সংবাদ পেয়ে আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসী ভয়ে পালিয়ে যায়। ঘোর আতঙ্ক সৃষ্টি হয় পুরো এলাকা জুড়ে। বলরামকে সৎকার করার কেউ নেই। রাত সাড়ে ১১টায় খবর পেয়ে লাশ নিয়ে শ্মশানে ছুটে গিয়েছিলেন এই সাহসী, দৃঢ়চেতা, করোনার সম্মুখযোদ্ধা, করোনা প্রতিরোধে নরসিংদী সদর উপজেলার কুইক রেসপন্স টিমের আহবায়ক ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়া।
অপরদিকে, ১৮ মে ’২০২০ মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সহধর্মিনী শাহেরা আক্তার সায়লা(৪৩)করোনা উপসর্গে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে গনেরগাঁও কবরস্থানে সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে দাফন করেন এসি(ল্যান্ড) মোঃ শাহ আলম মিয়া। অন্যদিকে মাধবদী নুরালাপুর হাজী শরীফ হোসেন মুক্তার করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। তাকেও মোঃ শাহ আলম মিয়া’র নেতৃত্বে শামতলী ঈদগাহ মাঠ কবরস্থানে রাত সাড়ে ১০টায় দাফন করা হয়।
শুধু মোঃ শাহ আলম মিয়া একা নয় নরসিংদীর সুধীজন তাঁর পরিবারের সকলকেই করোনা যোদ্ধায় আখ্যায়িত করেছেন। কারণ,ঝুকি জেনেও তাঁর কাজে কোন বাঁধা সৃষ্টি না করে তাকে জনসেবায় নিয়োজিত থাকতে উৎসাহিত করেছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা । সকলের মুখে নরসিংদীতে মানবতার এক জীবন্ত কিংবদন্তী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়া ।
নরসিংদী জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থেকে নিজ কর্মদক্ষতায় এপর্যন্ত তিন জন জেলা প্রশাসকের অধীনে দায়িত্ব পালন করে সকলের সুদৃষ্টি আকর্ষণে নিজেকে একজন দক্ষ কর্মকর্তায় পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি । যখন যে দায়িত্ব পেয়েছেন তা সফলতা আর সততার সাথে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। পুরস্কৃত হয়েছেন একাধিব বার একাধিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ।
নরসিংদী জেলা প্রশাসনে দীর্ঘদিন এনডিসি হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহআলম মিয়া।
নরসিংদীর সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক,সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথেও রয়েছে তাঁর সুসম্পর্ক । এ জেলার নিম্ন থেকে উচু স্তরের সকল পর্যায়ের মানুষের কাছে তিনি সমধিক জনপ্রিয় ।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে নরসিংদী সদরে যোগদানের পর ভূমি ব্যবস্হাপনা এবং তাঁর দাপ্তরিক গঠনমূলক কাজের স্বচ্ছতার জন্য তিনি তাঁর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্নেহভাজন এবং প্রশংসিত হয়েছেন। ভূমি অফিসে আগত সেবা প্রার্থীদের নিকটও তাঁর গঠনমূলক সেবা কার্যক্রমের কারণে রয়েছে ব্যপক জনপ্রিয়তা।
গুণী কর্মকর্তা হিসেবে মোঃ শাহ আলম মিয়া ২০১৭ ও ২০১৮ সালে “আন্তর্জাতিক পাবলিক সার্ভিস ডে” উপলক্ষে পর পর দু’বছরই সেরা কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছেন। সততা ও কর্মনিষ্ঠার জন্য ২০১৯ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি । এছাড়াও তিনি কারিতাস বাংলাদেশে কাজ করাকালে ২০১৪ সালে ‘ত্যাগ ও সেবা দিবসে’ শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তিনি একজন দক্ষ সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ । তাঁর মধ্যে রয়েছে মানবিক গুণাবলীর সমারোহ । মরণঘাতি ‘করোনা ভাইরাস’ বিশ্বব্যাপী একটি আতংকের নাম। আর এই আতংকের মধ্যে মানুষ যখন ঘরে বন্দী, তিনি তখন মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মানুষের জীবন-জীবীকা সুরক্ষার জন্য। প্রতিদিন নরসিংদীর জনপদের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন। কখনো মানুষকে ঘরে ফেরানোর কার্যক্রম, সামাজিক দূরুত্ব নিশ্চিত করন, ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কখনো ত্রাণ বিতরণ, কখনো ‘করোনা আক্রান্ত’ রোগীর বাড়ী লকডাউন, হাসপাতালে নেওয়া,রোগীর বা অসহায়দের বাড়ি খাবার পৌঁছে দেয়া,সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ, ‘করোনা আক্রান্ত’ হয়ে মারা গেলে তার সৎকার সম্পন্ন করণ, কখনো কৃষকের মাঠে ধান কেটে দেওয়া, কখনো মাস্ক সেনিটাইজার বিতরণ, এভাবেই তাঁর অনবচ্ছিন্নভাবে দিন-রাত ছুটে চলা। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এই অবিচল, সাহসী, দৃঢ়চেতা, করোনাযোদ্ধা মোঃ শাহ আলম মিয়ার নাম এখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মুখে মুখে।
তাঁর স্ত্রী অধ্যাপিকা মাশরোয়া জাহান আশা এবং বৃদ্ধা মাতা অজুবা বেগম একই ছাদের নিচে বসবাস করেন। অথচ তাদের কারো সাথে খুব একটা দেখা হয় না,কথা হয় না,তাঁর কোন কাজে তাঁরা বাঁধাও দেন না । কারণ তিনি করোনা রোগীদের সংস্পর্শেই বেশিরভাগ সময় থাকেন। তাই তার রুম নিজের মতো করে আলাদা করে নিয়েছেন। খাবার দাবারের জিনিসপত্র,কাপড়-চোপড় সব কিছুই আলাদা। বলা যায়, নরসিংদীবাসীর জন্য জীবন যেন উৎসর্গ করেছেন তিনি।
মোঃ শাহ আলম মিয়া’র সহধর্মিনী অধ্যাপক মাশরোয়া জাহান আশা বলেন, সংকট সারা জীবন থাকবে না। আমিতো একজন মানুষ । অথচ নরসিংদীর লাখো মানুষ সংকটে রয়েছে। আমার স্বামী সঠিক কাজই করছেন। তাঁর জন্য সকলে দু’আ করবেন , তিনি যেন করোনা যুদ্ধে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে ।
মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় দক্ষতার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে “মোবাইল কোর্ট হিরু” হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়া। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, যার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন তিনিও নিজেকে সংশোধন করে মোঃ শাহ আলম মিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে- যা সচরাচর কখনো দেখা যায় ন।
আমার সকল অর্জন জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন মহোদয়ের জন্য—মোঃ শাহ আলম মিয়া
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহ আলম মিয়ার কাছে তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আদর্শের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে । তার ইচ্ছা জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। আর এ নির্দেশনাটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছেন নরসিংদীর মান্যবর জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। আমাকে হাত ধরে তৈরী করেছেন আমার মাতৃতূল্য জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। তিনি আমার অভিভাবক। আমাকে হাতে কলমে কাজ শিখিয়েছেন, মানবিক হতে সাহস যুগিয়েছেন, পরিশ্রমী হতে উদ্বুধ্য করেছেন। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন ‘মানুষ মানুষের জন্য’ । আজ যদি আমার কোন অর্জন হয়ে থাকে তবে এটা তাঁরই পরিচর্যার ফসল। আমি আমার স্যারের জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি দীর্ঘজীবী হোন। আপনারাও আমার জন্য দু’আ করবেন । আমি আমার স্যারের যে আদর্শ ধারণ করে আজ এতদূর এগুতে পেরেছি তা যেনো ধরে রাখতে পারি। তাঁর আদর্শ থেকে আমি যেনো কোনদিন বিচ্যুত না হই।
তিনি বলেন, মানবিক বিপর্যয় রোধে জেলা প্রশাসনের এসকল কর্মকাণ্ড অব্যাহত আছে ও থাকবে। জনসেবায় শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবো।