মঙ্গলবার ২০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

শুধু যোদ্ধাই নয়, হাতে ওদের নতুন পৃথিবীও……….

আপডেটঃ ৭:১৭ অপরাহ্ণ | মে ২৮, ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক -: সম্মুখ সারির যোদ্ধা শম্পা দাস ও রোকসানা। একজন থাকেন ঢাকায়,অন্যজন শেরপুরে। একে অপরের মধ্যে সামান্যতম জানা শোনাও নেই। কিন্তু কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে অনেক মিল। তারা দু’জনেই প্রথমবারের মতো মা হতে চলেছেন। পেশায় দু’জনই নার্স। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন করোনা ভাইরাসে।এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজের জন্য নয় তাদের সব চিন্তা এখন অনাগত সন্তানকে নিয়ে। তবে করোনা মোকাবেলায় সম্মুখসারির এই দুই যোদ্ধা নিজের দায়িত্বের প্রতিও যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার মধ্যেই যেন খুঁজে পান প্রশান্তি।
২০১৬ সাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউ বিভাগে যোগ দেন শম্পা। এখন দায়িত্ব পালন করছেন সিনিয়র নার্সের। সাতমাসের অন্তঃস্বত্ত্বা শম্পা ২১ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত হবার পর সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন ১৫ মে।
শম্পা জানালেন, আগে কিছুটা ভয় কাজ করলেও করোনা আক্রান্ত হবার পর তা দূর হয়ে গেছে। শম্পা বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হয় তখন খুব বেশি ভয় পেতাম। কিন্তু নিজে যখন করোনা আক্রান্ত হলাম তখন সেই ভয় যেন কোথায় মিলিয়ে গেল।
বাইরের পৃথিবী, বিবর্ণ ঈদে ভালো আর মন্দ মিলিয়েই চলছে সেবা শম্পা তার পরিবারিক উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, আমি যখন করোনা আক্রান্ত হলাম তখন পরিবারের অনেকেই আমার এবং আমার অনাগত সন্তানের জন্য হা হুতাশ করতো, চিন্তা করতো। কিন্তু আমি ভেঙে পড়িনি। কেননা, আমি শিশুদের জন্য নির্ধারিত আইসিইউতে কাজ করি। প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর কষ্ট, সুস্থ হয়ে উঠা দেখি। ওইটুকু ওইটুকু শিশুদের কষ্টের কাছে তো আমার কষ্ট কিছুই না। ওইসব শিশুরাই আমাকে শক্তি জুগিয়েছে। শক্তি জোগায়।
শেরপুর সদর হাসপাতালে কর্মরত রোকসানাও কাজে যোগ দিয়েছিলেন ২০১৬ সালে । ১৭ মে নমুনা পরীক্ষায় রোকসানার দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ২৩ মে পুনরায় নমুনা দেয়া হয়েছে। রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। নিজের জন্য নয় অনাগত সন্তানের জন্য দুঃশ্চিন্তায় আছেন রোকসানা। হঠাৎ করেই ব্লিডিং শুরু হওয়ায় দুঃশ্চিন্তার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোকসানা বলেন, তিন মাস হলো আমি কনসিভ করেছি। ২৩ মে দ্বিতীয় বারের পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছি। কিন্তু রিপোর্ট এখনো হাতে পাইনি। হঠাৎ করেই ব্লিডিং শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন তো আল্ট্রাসাউন্ডও করাতে পারছি না। তবে সব ঠিক থাকলে সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিতে চান রোকসানা। পেশার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে রোকসানা বলেন, আমার কাজটা কী তা আমি জেনেই এই পেশায় এসেছি। তাই এখন পিছু হটতে চাই না।
পাঁচ বছর যাবৎ বারডেম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে কর্মরত অলিভিয়া ভাস্কিও সন্তান সম্ভবা। তবে এটি তার দ্বিতীয় সন্তান। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অলিভিয়া করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হন ২৮ এপ্রিল। সুস্থও হয়েছেন। ২৭ মে থেকে কাজে যোগ দেবেন।
সম্মুখসারির করোনাযোদ্ধা………………….
অলিভিয়া বলেন, এমনিতে কোনো সমস্যা না হলেও প্রেগনেন্সির এই সময়ে কিছু শারীরিক সমস্যা হচ্ছে আমার। আশা করছি তা কাটিয়ে উঠে কাজে যোগ দিতে পারবো। তবে যদি বেশি সমস্যা হয় তবে ছুটির আবেদন করবো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক জানান, তিনি চারমাসের সন্তান সম্ভবা। করোনা আক্রান্ত হবার পর সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, করোনাকে নিয়েই আমাদের এখন বাঁচতে হবে। তাই একে ভয় পেলে তো চলবে না। এই ভাইরাস থেকে বাঁচার কৌশলটা আমাদের সবার জানা। কিন্তু তা মানতে হবে। কিছু পেশার ধরণই থাকে আলাদা। চিকিৎসক, সাংবাদিক ও পুলিশের চাকরি তেমনি পেশা। পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। আমি তাই বিশ্বাস করি। একদিন আমরা করোনাকে জয় করবো।
বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) হিসেব অনুযায়ী, করোনা আক্রান্ত মোট চিকিৎসদের মধ্যে ১৫ জন সন্তান সম্ভবা। আর সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি এন্ড রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্তদের মধ্যে ১০ জন নার্স সন্তান সম্ভবা। তাদের অনেকেই সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। অনেকে দ্বিতীয়বারের পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন। রেজাল্ট পাবার অপেক্ষা করছেন।