মঙ্গলবার ৭ই জুলাই, ২০২০ ইং ২৩শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

বেপরোয়া দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্র, মহামারি সময়েও…

আপডেটঃ ৫:০৪ অপরাহ্ণ | জুন ১৮, ২০২০

নিউজ ডেস্কঃ গত কয়েক দিনে সাতটি ডোমেস্টিক ভায়েলেন্সের (পারিবারিক সহিংসতার) বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। করোনার এই প্রাদুর্ভাবের সময় যেখানে সচেতন মানুষ তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত, সেখানে কিছু মানুষ নিজের জাত চেনাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। সাতটি অভিযোগের সবই স্ত্রীকে স্বামীর প্রহার সম্পর্কিত। তারা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত স্বামী!’
ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়রুল ইসলাম ফেসুবক স্ট্যাটাসে এই ভয়ংকর তথ্য তুলে ধরেন। পুলিশ সদর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মার্চ থেকে মে- এই তিন মাসে সারাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ১৪০টি। শুধু তাই নয়, করোনা মহামারির মধ্যে খুন, ধর্ষণ, চুরি-ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনাও প্রতিদিন ঘটছে। তিন মাসে খুন হয়েছে ৯৬০টি, ছিনতাই ১৭০টি, নারী নির্যাতন ২১৪০টি এবং শিশু নির্যাতন ৪৭৫টি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীরা বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে নতুন নতুন কৌশলও ব্যবহার করছে। থেমে নেই মাদক সিন্ডিকেট সদস্যরাও। নানা কৌশলে মাদক কেনাবেচা চলছেই। গত তিন মাসে সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৭৭০টি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী সমকালকে বলেন, এই সংকটকালে নারী ও শিশুদের দিকে মনোযোগী হতে হবে। অনেকেই নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করছেন না। তাই সাহস নিয়ে ভিকটিমকে কথা বলতে হবে। সরকারি- বেসরকারি দপ্তরগুলোর ভিকটিমের পাশে থাকা জরুরি। তাদের আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ রোধ করা কঠিন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, সমাজে অপরাধপ্রবণ লোক পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায়। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় বড় যে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সব ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। আরও কয়েকটি ঘটনার তদন্ত চলছে।
করোনাকালে অপরাধ চিত্র :পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাকালে পরিস্থিতির মধ্যে চলতি বছরের মার্চ মাসে সারাদেশে মোট মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ১৪৫টি। মার্চে ডাকাতি হয়েছে ২৫টি, খুনের ঘটনা ২৭৫, ধর্ষণের ঘটনা ৪৯০টি, নারী নির্যাতন ১০০৫টি, শিশু নির্যাতন ২১০টি, অপহরণ ৩৮, চুরির ঘটনা ৫৫৮টি। এপ্রিলে ডাকাতি ১০টি, খুন ২৭৫টি, ধর্ষণের ঘটনা ৩৩৫, নারী নির্যাতন ৪৬৫, শিশু নির্যাতন ১২৫, অপহরণ ৮টি, চুরি ২৯০টি।
মে মাসে ডাকাতি ১২টি, খুন ৩৬০টি, ধর্ষণ ৩৫৫টি, নারী নির্যাতন ৬৭০টি, শিশু নির্যাতন ১৪০টি, চুরি ৩৯০টি। তবে সারাদেশে চুরি-ছিনতাইয়ের বাস্তব ঘটনা আরও বেশি। কারণ অনেক ঘটনায় অনেকেই মামলা করেন না। তাই পরিসংখ্যান দিয়ে সঠিক অপরাধ চিত্রের ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। মুখে মাস্ক লাগিয়ে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই :মুখে মুখোশ পরে চুরি বা ডাকাতি করা দুর্বৃত্তদের পুরোনো অভ্যাস। তবে চলমান করোনাভাইরাসের এই সময়ে দুর্বৃত্তরা এখন মুখ ঢাকতে সেই মুখোশ পরছে না। বরং ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার মাস্ক মুখে দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে চুরি-ডাকাতি। এতে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে বিপাকে পড়ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কারণ সিসিটিভি ফুটেজে এসব অপরাধীকে দেখা গেলেও তাদের মুখ চেনা যাচ্ছে না।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২১ মে চকবাজারের বেগম বাজারে একটি গুদামে লুট হয়। এর আগে গত ১৬ মে বকশীবাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা একটি রিকশাযাত্রীর কাছ থেকে এক লাখ ৮২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তিনজনের মুখে মাস্ক। পুলিশ তিন সপ্তাহ ধরে তদন্ত করছে কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ১১ মে বুয়েট এলাকা থেকে রাইড শেয়ারিংয়ের একজন চালককে মারধর করে তার মোটরসাইকেলটিও নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। চকবাজার থানার ওসি মওদুত হাওলাদার জানান, প্রত্যেকটি ঘটনায় দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল। তাই সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার দৃশ্য দেখা গেলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তবে নানাভাবে পুলিশ অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গত মে মাসে পুরান ঢাকার ইসলামপুর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের মাইক্রোবাস থেকে দুর্বৃত্তরা ৮০ লাখ টাকার বস্তাই লুট করে নিয়ে যায়। যদিও ওই ঘটনায় ডিবি পুলিশ ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনাটিতেও দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল।
গত ৩ মে রাতে যাত্রাবাড়ীর মীরহাজীরবাগে একটি ওষুধের দোকানের শাটার ভেঙে দুর্বৃত্তরা তিন লাখ টাকার মালপত্র লুট করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দোকানে ঢোকা দুই দুর্বৃত্তের মুখে মাস্ক ছিল।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম জানান, ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। তবে দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক থাকায় একটু সময় লাগছে। ৩ জুন মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ডিআইটি সড়কে একটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের দোকানের তালা কেটে প্রায় ২০ লাখ টাকার মালপত্র চুরি হয়। সে সময়ও দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গত ৭ জুন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দুর্বৃত্তরা মাইক্রোবাস থামিয়ে গুলি করে একটি পোশাক কারখানার ৮০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। ওই ঘটনায় দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল কিনা তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও করোনাকালেই ঘটল এমন দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার ফরিদপুর সদরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময়ে জনতার পিটুনিতে দুই ছিনতাইকারী নিহত হয়।
থেমে নেই খুনোখুনি : করোনা সংকটের এই সময়ে মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর চেষ্টা আর প্রার্থনা করছে, ঠিক এই সময়টাতেও সামান্য ঘটনা নিয়ে হয়ে যাচ্ছে খুনোখুনি। পূর্বশত্রুতা থেকে শুরু করে স্বার্থের দ্বন্দ্ব আর সামাজিক কারণেও বাড়ছে খুনোখুনি। অপহরণের পরও ঘটছে খুনের ঘটনা। আধিপত্য বিস্তার নিয়েও খুনের ঘটনা ঘটছে। ১০ মে নড়াইলের কাশিপুর ইউনিয়নের গন্ডব গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন খুন হন।
২৩ এপ্রিল গাজীপুরের জৈনাবাজার এলাকায় মা ও তিন সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ৫ জুন যশোরের চৌগাছা থানা এলাকার একটি রাস্তার পাশ থেকে বিপুল হোসেন নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে স্থানীয় ডিবি পুলিশ ওই হত্যাকাণ্ডে তিনজনকে গ্রেপ্তার করলে বেরিয়ে আসে পরকীয়ার কারণে খুন হন ওই তরুণ।
গত মঙ্গলবার গাইবান্ধায় একটি পুকুর থেকে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ৪ থেকে ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে অন্তত ১০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এর মধ্যে রংপুরে আসাদুল হক নামের একজন সিনিয়র আইনজীবীকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে পাবনা শহরের একটি বাড়ি থেকে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তাসহ একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয় পুলিশ ধারণা করছে, ডাকাতিতে বাধা দেওয়ায় ডাকাত দল ওই তিনজনকে খুন করে মালপত্র লুট করেছে। এ ছাড়া একই দিন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি গ্রামের বাড়ি থেকে মা ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বলে ওই থানার ওসি আব্দুস সালেক জানিয়েছেন। গত ৫ জুন বগুড়া শহরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ মিনিস্টারকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। সেদিনই একই জেলার শাহজাহানপুর থানা এলাকায় একটি ফসলের ক্ষেত থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ধারণা করছে, ওই তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ৪ জুন ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার হরিশংকরপুর এলাকায় স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটছে গণধর্ষণের মতো অপরাধও :গত ৩১ মে রাজধানীর জুরাইনের একটি বাসায় এক তরুণীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় ৪ জুন কদমতলী থানায় মামলা হয়। পুলিশের শ্যামপুর জোনের এডিসি নাজমুন নাহার জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানার পর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ধর্ষকদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। এরই মধ্যে জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে। ১ জুন বাদাম খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর চান মিয়ার গলিতে একটি নির্জন বাসায় এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ওই ঘটনায় জড়িত সুজন মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। গত কয়েক দিনে সাতটি ডোমেস্টিক ভায়েলেন্সের (পারিবারিক সহিংসতার) বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। করোনার এই প্রাদুর্ভাবের সময় যেখানে সচেতন মানুষ তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত, সেখানে কিছু মানুষ নিজের জাত চেনাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। সাতটি অভিযোগের সবই স্ত্রীকে স্বামীর প্রহার সম্পর্কিত। তারা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত স্বামী!’
ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়রুল ইসলাম ফেসুবক স্ট্যাটাসে এই ভয়ংকর তথ্য তুলে ধরেন। পুলিশ সদর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মার্চ থেকে মে- এই তিন মাসে সারাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ১৪০টি। শুধু তাই নয়, করোনা মহামারির মধ্যে খুন, ধর্ষণ, চুরি-ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনাও প্রতিদিন ঘটছে। তিন মাসে খুন হয়েছে ৯৬০টি, ছিনতাই ১৭০টি, নারী নির্যাতন ২১৪০টি এবং শিশু নির্যাতন ৪৭৫টি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীরা বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে নতুন নতুন কৌশলও ব্যবহার করছে। থেমে নেই মাদক সিন্ডিকেট সদস্যরাও। নানা কৌশলে মাদক কেনাবেচা চলছেই। গত তিন মাসে সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৭৭০টি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী সমকালকে বলেন, এই সংকটকালে নারী ও শিশুদের দিকে মনোযোগী হতে হবে। অনেকেই নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করছেন না। তাই সাহস নিয়ে ভিকটিমকে কথা বলতে হবে। সরকারি- বেসরকারি দপ্তরগুলোর ভিকটিমের পাশে থাকা জরুরি। তাদের আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ রোধ করা কঠিন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, সমাজে অপরাধপ্রবণ লোক পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায়। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় বড় যে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সব ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। আরও কয়েকটি ঘটনার তদন্ত চলছে।
করোনাকালে অপরাধ চিত্র :পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাকালে পরিস্থিতির মধ্যে চলতি বছরের মার্চ মাসে সারাদেশে মোট মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ১৪৫টি। মার্চে ডাকাতি হয়েছে ২৫টি, খুনের ঘটনা ২৭৫, ধর্ষণের ঘটনা ৪৯০টি, নারী নির্যাতন ১০০৫টি, শিশু নির্যাতন ২১০টি, অপহরণ ৩৮, চুরির ঘটনা ৫৫৮টি। এপ্রিলে ডাকাতি ১০টি, খুন ২৭৫টি, ধর্ষণের ঘটনা ৩৩৫, নারী নির্যাতন ৪৬৫, শিশু নির্যাতন ১২৫, অপহরণ ৮টি, চুরি ২৯০টি।
মে মাসে ডাকাতি ১২টি, খুন ৩৬০টি, ধর্ষণ ৩৫৫টি, নারী নির্যাতন ৬৭০টি, শিশু নির্যাতন ১৪০টি, চুরি ৩৯০টি। তবে সারাদেশে চুরি-ছিনতাইয়ের বাস্তব ঘটনা আরও বেশি। কারণ অনেক ঘটনায় অনেকেই মামলা করেন না। তাই পরিসংখ্যান দিয়ে সঠিক অপরাধ চিত্রের ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। মুখে মাস্ক লাগিয়ে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই :মুখে মুখোশ পরে চুরি বা ডাকাতি করা দুর্বৃত্তদের পুরোনো অভ্যাস। তবে চলমান করোনাভাইরাসের এই সময়ে দুর্বৃত্তরা এখন মুখ ঢাকতে সেই মুখোশ পরছে না। বরং ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার মাস্ক মুখে দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে চুরি-ডাকাতি। এতে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে বিপাকে পড়ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কারণ সিসিটিভি ফুটেজে এসব অপরাধীকে দেখা গেলেও তাদের মুখ চেনা যাচ্ছে না।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২১ মে চকবাজারের বেগম বাজারে একটি গুদামে লুট হয়। এর আগে গত ১৬ মে বকশীবাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা একটি রিকশাযাত্রীর কাছ থেকে এক লাখ ৮২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তিনজনের মুখে মাস্ক। পুলিশ তিন সপ্তাহ ধরে তদন্ত করছে কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ১১ মে বুয়েট এলাকা থেকে রাইড শেয়ারিংয়ের একজন চালককে মারধর করে তার মোটরসাইকেলটিও নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। চকবাজার থানার ওসি মওদুত হাওলাদার জানান, প্রত্যেকটি ঘটনায় দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল। তাই সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার দৃশ্য দেখা গেলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তবে নানাভাবে পুলিশ অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গত মে মাসে পুরান ঢাকার ইসলামপুর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের মাইক্রোবাস থেকে দুর্বৃত্তরা ৮০ লাখ টাকার বস্তাই লুট করে নিয়ে যায়। যদিও ওই ঘটনায় ডিবি পুলিশ ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনাটিতেও দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল।
গত ৩ মে রাতে যাত্রাবাড়ীর মীরহাজীরবাগে একটি ওষুধের দোকানের শাটার ভেঙে দুর্বৃত্তরা তিন লাখ টাকার মালপত্র লুট করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দোকানে ঢোকা দুই দুর্বৃত্তের মুখে মাস্ক ছিল।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম জানান, ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। তবে দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক থাকায় একটু সময় লাগছে। ৩ জুন মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ডিআইটি সড়কে একটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের দোকানের তালা কেটে প্রায় ২০ লাখ টাকার মালপত্র চুরি হয়। সে সময়ও দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গত ৭ জুন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দুর্বৃত্তরা মাইক্রোবাস থামিয়ে গুলি করে একটি পোশাক কারখানার ৮০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। ওই ঘটনায় দুর্বৃত্তদের মুখে মাস্ক ছিল কিনা তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও করোনাকালেই ঘটল এমন দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার ফরিদপুর সদরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময়ে জনতার পিটুনিতে দুই ছিনতাইকারী নিহত হয়।
থেমে নেই খুনোখুনি : করোনা সংকটের এই সময়ে মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর চেষ্টা আর প্রার্থনা করছে, ঠিক এই সময়টাতেও সামান্য ঘটনা নিয়ে হয়ে যাচ্ছে খুনোখুনি। পূর্বশত্রুতা থেকে শুরু করে স্বার্থের দ্বন্দ্ব আর সামাজিক কারণেও বাড়ছে খুনোখুনি। অপহরণের পরও ঘটছে খুনের ঘটনা। আধিপত্য বিস্তার নিয়েও খুনের ঘটনা ঘটছে। ১০ মে নড়াইলের কাশিপুর ইউনিয়নের গন্ডব গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন খুন হন।
২৩ এপ্রিল গাজীপুরের জৈনাবাজার এলাকায় মা ও তিন সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ৫ জুন যশোরের চৌগাছা থানা এলাকার একটি রাস্তার পাশ থেকে বিপুল হোসেন নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে স্থানীয় ডিবি পুলিশ ওই হত্যাকাণ্ডে তিনজনকে গ্রেপ্তার করলে বেরিয়ে আসে পরকীয়ার কারণে খুন হন ওই তরুণ।
গত মঙ্গলবার গাইবান্ধায় একটি পুকুর থেকে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ৪ থেকে ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে অন্তত ১০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এর মধ্যে রংপুরে আসাদুল হক নামের একজন সিনিয়র আইনজীবীকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে পাবনা শহরের একটি বাড়ি থেকে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তাসহ একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয় পুলিশ ধারণা করছে, ডাকাতিতে বাধা দেওয়ায় ডাকাত দল ওই তিনজনকে খুন করে মালপত্র লুট করেছে। এ ছাড়া একই দিন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি গ্রামের বাড়ি থেকে মা ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বলে ওই থানার ওসি আব্দুস সালেক জানিয়েছেন। গত ৫ জুন বগুড়া শহরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ মিনিস্টারকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। সেদিনই একই জেলার শাহজাহানপুর থানা এলাকায় একটি ফসলের ক্ষেত থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ধারণা করছে, ওই তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ৪ জুন ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার হরিশংকরপুর এলাকায় স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটছে গণধর্ষণের মতো অপরাধও :গত ৩১ মে রাজধানীর জুরাইনের একটি বাসায় এক তরুণীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় ৪ জুন কদমতলী থানায় মামলা হয়। পুলিশের শ্যামপুর জোনের এডিসি নাজমুন নাহার জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানার পর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ধর্ষকদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। এরই মধ্যে জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে। ১ জুন বাদাম খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর চান মিয়ার গলিতে একটি নির্জন বাসায় এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ওই ঘটনায় জড়িত সুজন মিয়া নামে একজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ।