শুক্রবার ৫ই মার্চ, ২০২১ ইং ২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

কণ্যা শিশু জন্ম নেওয়ায় হাসপাতালে ফেলে গেলেন মা….

আপডেটঃ ৯:৪৪ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ২৮, ২০২১

ময়দুল ইসলাম, বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি-: পৃথিবীর আলোর মুখ দেখতেই নিমর্ম এক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে শিশুটি। মা-বাবার ভালোবাসা-আবেগ-অনুভূতি কোনো কিছুই স্পর্শ করতে পারেনি শিশুকে। কন্যা হয়ে জন্ম নেওয়াই ছিল শিশুটির বড় অপরাধ। এ কারণে উত্তরের বয়ে যাওয়া প্রচ- শৈত্যপ্রবাহে শীতের রাতের অন্ধকারে শিশুটি হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে যায় তার নিষ্ঠুর মা-বাবা। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার মধ্যরাতে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
আজ বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যান হাসপাতালের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। খবর পেয়ে অনেক নিঃসন্তান দম্পত্তি শিশুটি দত্তক নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে শিশুটি বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচ্ছন্নতাকর্মী জোবেদা বেগমের বাড়িতে রয়েছে।এলাকাকাবাসী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের নিরাপদ বিশ্বাসের ছেলে প্রদীপ বিশ্বাস তার গর্ভবতী স্ত্রী পল্লবীকে নিয়ে বুধবার বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। ওই দিন পল্লবীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতে স্বাভাবিকভাবে পল্লবী একটি ফুটফুটে সন্তান জন্ম দেন। যখন তারা জানতে পারেন সন্তানটি ছেলে নয় মেয়ে হয়েছে। এতে পাষ- মা-বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। আনন্দের পরিবর্তে নেমে আসে বিষাদ। তাদের ঘরে পপি রানী (৯) ও দীপা (৫) নামে আরো দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। এবারে পরিবারের আশা ছিল ছেলে জন্ম দেবে পল্লবী। কিন্তু কন্যাসন্তান জন্ম হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। অভাব আর অনটনের সংসারে তিন কন্যা সন্তানের ভরণ-পোষণ করা নিয়ে চিন্তায় পড়েন তারা। রাতেই স্বামী-স্ত্রী পরিকল্পনা করেন শিশুটিকে হাসপাতালের বিছানায় রেখে তারা পালিয়ে যাবেন। পরিকল্পনা মতে রাতের কোনো একসময় ছাড়পত্র না নিয়ে শিশুটি হাসপাতালের বিছানায় ফেলে পল্লবী ও তার স্বামী প্রদীপ পালিয়ে যায়। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যান জোবেদা বেগম। আজ বৃহস্পতিবার সদ্যোজাত সন্তান ও তার মাকে খুঁজে না পাওয়ায় ঘটনাটি প্রকাশ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শিশুটিকে সন্তান দত্তক নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু হয়। ভিড় বাড়ে হাসপাতাল চত্বরের ভেতরে জোবেদার বাড়িতে। জোবেদা বেগম বলেন, শিশুটি নিজের সন্তান মনে করে নিয়েছি। এর মধ্যে ওর জন্যে আমরা শীতের অনেক জামা কাপড় কিনেছি। পরম যতœ আর মায়া-মমতায় আমরা শিশুটি বড় করে তুলতে চাই। আমার ছোট বোন মোমেনার বুকের দুধ খাচ্ছে শিশুটি। এখন অনেকেই এসে ভিড় করছে বাড়িতে। আবার অনেকেই আমার কাছ থেকে দত্তক নিতে চাইছে।
ওদিকে, দুপুরের দিকে হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় শিশুটির পিতা প্রদীপ বিশ্বাসকে। এ সময় তিনি বলেন, আমি পথে-ঘাটে ঝালমুড়ি বিক্রি করে অতিকষ্টে সংসার চালাই। আমার আগের আরো দুটি মেয়ে আছে। তাদের ভরণপোষণ দিতে পারছি না। এবার আশা ছিল ছেলে হবে। কিন্তু সেই আশা পূরণ হলো না। এ কারণে একজন হিন্দু পরিবারকে শিশুটিকে দত্তক দিতে চেয়েছি। কিন্তু হাসপাতালের স্টাফ শিশুটি নিতে চাইলে রাতে তাকে দিয়ে চলে যাই। এখন শুনছি দত্তক দেওয়া-নেওয়া নিয়ে নাকি অনেক ঝামেলা। এ কারণে শিশুটি বাড়ি নিয়ে যাব।
বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হোসাইন বলেন, আমার জানামতে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া দত্তক নেওয়া যায় না। আমরা শিশুটিকে উদ্ধার করে তার বাবার কাছে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছি।
বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আরশাদ হোসেন বলেন, স্বাভাবিকভাবে শিশুটির জন্ম হয়েছে। সকালের দিকে দেখা যায় হাসপাতালে শিশু ও তার মা নেই। রাতের কোনো একসময় প্রসুতি ওই মা পালিয়ে গেছে। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে ফেলে গেলেন মা।