রবিবার ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ ইং ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

অনুসন্ধানী জাহাজ জরিপ-১০ মাওয়ায় পদ্মা চষে বেড়াচ্ছে

আপডেটঃ ৬:০৭ অপরাহ্ণ | আগস্ট ০৯, ২০১৪

উচ্চ ক্ষমতার অনুসন্ধানী জাহাজ জরিপ-১০ শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে মাওয়ার দুর্ঘটনা স্থলে পৌঁছেছে। অনুসন্ধানী জাহাজ কাণ্ডারী-২ এবং সাইট স্ক্যান সোনার ব্যবহার করে তিস্তা, সন্ধানী, আইটি ৯৭ ও ব-দ্বীপ শুক্রবার সকাল থেকে ‘পিনাক-৬-এর সন্ধানে নামে। এসব তথ্য নিশ্চিত করে নৌবাহিনী সদর দফতরের উপপরিচালক কমান্ডার হাবিবুল আলম জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা তল্লাশির পর এখন নতুন করে আরও নতুন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন তারা। জরিপ-১০ পৌঁছায় অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার হয়েছে। লঞ্চের অবস্থান শনাক্ত না হওয়ায় উদ্ধারকারী জাহাজ ‘নির্ভীক’ ও ‘রুস্তম’ মাঝ পদ্মায় অলস বসে আছে। এদিকে দীর্ঘ ৫ দিনে লঞ্চের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে স্বজনহারা পরিবারগুলো। অনেকেই লাশের জন্য পদ্মা পাড়ে কষ্টের প্রহর কাটাচ্ছেন।
ডুবন্ত পিনাকের হতভাগ্য যাত্রীদের লাশ ভেসে উঠছে ভাটির বিভিন্ন নদীতে। শুক্রবার আরও ৪ লাশ উদ্ধার হয়েছে। এই নিয়ে উদ্ধারকৃত লাশের সংখ্যা ৪০। এর মধ্যে ভোলা থেকে ১০, শরীয়তপুর থেকে ১০, বরিশাল থেকে ৯, চাঁদপুরে ৫, লক্ষ্মীপুরে ১, মাদারীপুরে ১ ও ঘটনাস্থল মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে ৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।
৪০ লাশের মধ্যে ২৪ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় তা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৬ লাশ মাদারীপুর জেলার শিবচরের পাঁচ্চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্পে রাখা হয়। সেখান থেকে পচাগলা ১২ মরদেহ অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। বাকি ৪ লাশ ওই প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্যাম্পে আছে স্বজনের শনাক্তের অপেক্ষায় আছে। লাশগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জামা কাপড় দেখে কোনক্রমে শনাক্ত করা হচ্ছে। তাই উদ্ধারকৃত লাশের অর্ধেকই রয়েছে শনাক্তহীন। স্বজনরা লাশ শনাক্তের জন্য ডিএনও টেস্টের দাবি করেছেন।
মুন্সীগঞ্জের ডিসি সাইফুল হাসান বাদল বলেছেন, লঞ্চ উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তাদের তালিকায় এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে ১২৫। লঞ্চ উদ্ধারে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহা খন্দকার জানান, দুর্ঘটনাস্থলে প্রবল ঘূর্ণি স্রোত এবং পানির গভীরতা প্রায় ৮০/৯০ ফুট। ঘূর্ণাবর্তের কারণে সেখানে গর্ত হচ্ছে, আবার বালু জমা হচ্ছে। তাই লঞ্চটি স্রোতে দূরে সরে বালুর নিচেও চাপা পড়ে থাকতে পারে। তাই পিনাক-৬ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হস্তান্তর হওয়া লাশের পরিচয় ॥ মাওয়া ঘাটে পুলিশের সাব-কন্ট্রোলরুমের তথ্য অনুযায়ী হস্তান্তর হয়েছে ২৪ লাশ। এর মধ্যে শুক্রবার ৬ লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর হলো- বরিশাল থেকে উদ্ধার মাদারীপুরের উত্তর বাঘরকান্দি গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে নুর আলম (১৪), শরীয়তপুর থেকে উদ্ধার বড়দিয়া গ্রামের ইমদাদ হোসেনের মেয়ে মেরী (৪০), ভোলা থেকে উদ্ধার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার উত্তর কাশিপুরের আলী জব্বরের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪৫), ভোলা থেকে উদ্ধার হওয়া বরিশালের গৌরনদীর ভুয়াকাঠির আব্দুল রশিদের পুত্র আল আমিন (২৫), ভোলা থেকে উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের চরপাগলা গ্রামের মরহুম বাদশা মিয়ার ছেলে কাজী আনোয়ারুল (৬৫) ও বরিশাল থেকে উদ্ধার ফরিদপুরের ভাঙ্গার মাধবপুরের রফিক উদ্দিনের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪০)।
নাসরিনের পরিণতি হচ্ছে পিনাকের ॥ ২০০২ সালে চাঁদপুরের মেঘনা বক্ষে এমভি নাসরিন খান এবং আরিচায় এমএল রায়পুরা লঞ্চের পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে পদ্মায় ডুবে যাওয়া এমএল পিনাক-৬ লঞ্চটির। অনেক দিন চেষ্টার পরও ওই দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চও খুঁজে না পাওয়ায় এক পর্যায়ে উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা হয়েছিল। পিনাকের ক্ষেত্রেও টানা ৫ দিনের নজিরবিহীন বিফল উদ্ধারযজ্ঞের পর যে কোন সময় উদ্ধার তৎপরতা পরিত্যক্ত ঘোষণা হতে পারে। ফলে লঞ্চটি উদ্ধার সম্ভবনা একেবারে ক্ষিণ হয়ে আসছে। পদ্মায় যেহারে পলি প্রবাহিত হয় তাতে গত পাঁচদিনে লঞ্চটি নদীর যে স্থানেই থাকুক না কেন তা পলির নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কাই বেশি। পরবর্তীতে লঞ্চটি শনাক্ত করা গেলেও এটি উদ্ধারের মতো অবস্থা থাকবে না কিংবা এখনও আছে বলে মনে হয় না। বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে তল্লাশির পরও লঞ্চটি পাঁচদিনে শনাক্ত না হওয়া নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আগের এ ধরনের ঘটনায় অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা এমন অভিমত দিয়েছেন।
যে কোন লঞ্চ ডুবির ঘটনায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের মালিক পক্ষ থেকেও লঞ্চটি উদ্ধারে অংশগ্রহণ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এ ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টো ঘটনা। মালিককে ধরতে পারছে না প্রশাসন। এমনকি লঞ্চটি উদ্ধার করা না করায় কোন লাভ না থাকায় মালিক পক্ষের তেমন ভূমিকা নেই।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, লঞ্চটি উদ্ধারের যাবতীয় ব্যয় লঞ্চের মালিক পক্ষকে বহন করতে হবে। কিন্তু এবার যে ব্যয়বহুল অভিযান তাতে এত ব্যয় আদৌ মালিকপক্ষের কাছ থেকে সরকার আদৌ আদায় করতে পারবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
পিনাক-৬ লঞ্চডুবির সময় ওইস্থান অতিক্রমকারী ফেরি কেতকীর নোঙর না করা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির ওই ফেরিটি থামিয়ে যাত্রী উদ্ধারে ভূমিকা রাখলে হতাহতের ঘটনা কমত বলেও মনে করছেন অনেকে।
সমুদ্রপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ফকরুল ইসলাম বলেন, ফেরিটি কেন থামায়নি তা বোধগম্য নয়। আমাদের নির্দেশনা অনুসারেও যে কোন নৌযান দুর্ঘটনার সময় আশপাশে থাকলে সেটি থামিয়ে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়ার নির্দেশ রয়েছে।
তবে মাওয়ায় ফেরি সার্ভিস দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিসির সহকারী ম্যানেজার শেখর চন্দ্র রায় দাবি করেন,‘ কেতকী ফেরিটি দুর্ঘটনাস্থল অতিক্রম করার সময় তাৎক্ষণিক বয়া ফেলে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির যাত্রীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু নদীর অবস্থা ভাল না থাকায় ওইস্থানে ফেরিটি থামানোর মতো অবস্থা ছিল না। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান বলেন, তদন্ত কামিটির কাছে বিষয়টি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে ফেরি বিভাগের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ফেরিটি অবশ্যই থামানো যেত। এমনকি ফেরিটি লঞ্চটির কাছাকাছি গিয়ে একটি রশি ফেলে বেঁধে ফেললে লঞ্চটি নিখোঁজ হতো না আর ফেরিরও কোন সমস্যা হতো না। কারণ ফেরির সক্ষমতা অনেক বেশি ছিল।
উৎসুক জনতার ভিড় ॥ মাওয়া ঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনা দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় বেড়েছে। কমেছে স্বজনহারাদের ভিড়। শুক্রবার সরেজমিনে মাওয় ঘাট ঘুরে দেখা যায় উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো পদ্মায় লঞ্চটি শনাক্ত করতে অনুসন্ধান করে চলেছে। এসব দেখতে সকাল থেকেই কিছু কিছু লোকজন মাওয়া ঘাটে জড়ো হয়। দুপুরের পরে উৎসুক এ জনতার ভিড় বাড়তে থাকে। বিকেলে তা পরিণত হয় মহাহুলস্থূলে। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসেছে এ পদ্মার পারে লঞ্চটি উদ্ধার তৎপরতা দেখছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী যা বলেন ॥ নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সন্ধ্যার দিকে মাওয়ার পদ্মা সেতু রেস্টহাউসে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির তলদেশে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা সার্চ করা হবে। প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা সার্চ করা হয়েছে। এখন নতুন জায়গায় অনুসন্ধান চলবে। পদ্মায় প্রচ- ঘূর্ণিস্রোতে লঞ্চটি অনেক দূরে ভেসে যেতে পারে। ৪টি পদ্ধতিতে দড়ি টেনে সাইট স্ক্যান সোনার এবং ইকোসাউন্ডার দিয়ে অনুসন্ধান চলছে। ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে পদত্যাগ করবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অতীতে আরও দুর্ঘটনা ঘটেছে কিন্তু এখন তা অনেক কমে এসেছে।
শুধু প্রিয়জনের লাশের জন্য ॥ পাঁচদিনের নজিরবিহীন ব্যর্থ উদ্ধার কার্যক্রমে স্বজনহারা মানুষগুলো শোকে পাথর হয়ে গেছে। তাদের দিকে তাকালে যে কারই চোখে জল আসবে। এখানে নেই কোন রাজনৈতিক বিভেদ নেই কোন ধনী গরিবের ব্যবধান। সীমাহীন শোক ভর করেছে তাদের চেহারায়, না দেখলে বিশ্বাসই করা যাবে না।
এর শেষ কোথায় জানে না স্বজনরা। পাঁচ দিনেও পাওয়া যায়নি কারও বাবা, কারও বোন, কারও স্ত্রী, প্রিয় সন্তানকে। জীবিত পাবেন সেই আশা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাশ পাওয়ার আশাও ছেড়ে বসেছেন অনেকে।
পদ্মার পারে কয়েক দিন খেয়ে না খেয়ে অনেকেই নির্ঘুম কাটাচ্ছেন।