শনিবার ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ ইং ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

পিনাক-৬ উদ্ধারের আর কোন আশা নেই

আপডেটঃ ৬:১৮ অপরাহ্ণ | আগস্ট ০৯, ২০১৪

পাঁচ দিন ধরে টানা অনুসন্ধানে ডুবে যাওয়া ‘পিনাক-৬’ সন্ধানে খোঁজ মেলেনি। এটির আদৌ খোঁজ পাওয়া যাবে কিনা সে রকম আশার আলো নেই। এরপরও চলছে অনুসন্ধান কাজ। নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, গত বছর এখানে কোন লঞ্চ ডুবেনি। তবে বাল্কহেড ও বড় ট্রলার, নৌকা ডুবেছে তার আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারপরও গোটা দুনিয়ায় যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তা এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে। চেষ্টা চলানো হচ্ছে। নতুনভাবে শুক্রবার সকালে অনুসন্ধান বহরে যোগ হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে আসা দেশের সর্বাধুনিক ও বহুমুখী প্রযুক্তিসমৃদ্ধ টাগ বোট জরিপ-১০। কিন্তু সুফল নেই। তাই দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা।
দুর্ঘটনার শুরু থেকে অনুসন্ধান কাজ তদারকিতে যুক্ত আছেন এমন একজনের সঙ্গে একান্তে কথা হয়। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরাসরি অনুসন্ধান কাজে নিযুক্তদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদককে জানান, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন খোদ অনুসন্ধানকারীরা। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তসহ নানা কারণে এখনও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
অনুসন্ধান কাজে নিযুক্ত নৌ-বাহিনী অংশের সার্বিক তদারকির দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম বলেন, জরিপ-১০ নিয়ে অনুসন্ধানের সর্বশেষ ধাপে আছি আমরা। শনিবারের মধ্যেই একটি সিদ্ধান্ত পর্যায়ে আসতে হতে পারে। এখন আগে থেকে সার্চ করার পরিধি বাড়িয়ে নদীর মাঝ অংশের ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত সার্চ করা হবে।
সেই সিদ্ধান্তটি কি হতে পারে? জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অনুসন্ধান অভিযান সফল হলে ডুবে যাওয়া লঞ্চের ঠিকানা জানা যাবে, না হয় মালয়েশিয়ার হারিয়ে যাওয়া বিমানের মতো হবে।’
লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর শুরু হওয়া অনুসন্ধানের প্রথম থেকে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছেন নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট সিদ্দিক। শুক্রবার দুপুরে টেলিফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। সার্বক্ষণিক অনুসন্ধানে নিযুক্ত এই কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ১২ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত প্রায় সবটুকু এলাকা ঘুরেছি আমাদের অনুসন্ধান যন্ত্র নিয়ে। কিন্তু কোন কিছুই পাইনি। আজকে অনুসন্ধান এরিয়া আরও বাড়ানো হচ্ছে।
লঞ্চটিকে কি এখনও খুঁজে পাওয়া সম্ভব? নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক উদ্ধারকর্মী বলেন, তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর লঞ্চটি পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছি। দুর্ঘটনাস্থলে পানির ওপর দিকে যত স্রোত নিচে আরও বেশি স্রোত। এই সময়ে পানির মধ্যে মাটিও থাকে প্রচুর। কোন জায়গায় আটকে গিয়ে বালু চাপা পড়ে গেছে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, নদীর তলদেশে বড় বড় গর্তও রয়েছে। তলদেশ সমান নয়। তাই সন্ধান করতে গিয়েও নানা সমস্যা হচ্ছে। হয়ত লঞ্চটি এমন কোন গর্তে পড়ে পলি চাপা পড়েছে।
মসজিদে মসজিদে দোয়া ॥ মাওয়ার ‘পিনাক-৬’ ডুবে নিহতদের স্মরণে মুন্সীগঞ্জ ও মাদারপুরের মসজিদে মসজিদে বাদ জুমার বিশেষ দোয়া হয়েছে। পাঁচ দিন ধরে লঞ্চ উদ্ধার না হওয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়া বিষয়টিও গুরুত্ব পায় এই দোয়ায়। জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল বলেন, লঞ্চ ডুবির ঘটনায় যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মসজিদে মসজিদে জুমার পর এই দোয়া করা হয়। সকল অনিশ্চয়তা কাটিয়ে লঞ্চটি উদ্ধার এবং নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়ার জন্যও দোয়া করা হয়।
বিলম্ব আর পরিকল্পনার অভাব ॥ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেয়া এবং পরিকল্পনার অভাবে খোঁজ মিলছে না পিনাক-৬। রয়েছে সমন্বয়হীনতা। তাই অত্যাধুনিক জাহাজ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঁচ দিনেও লঞ্চটির সন্ধান দিতে পারেনি উদ্ধারকারীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেয়ার কারণেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না লঞ্চটি। অভিযোগ উঠেছে উদ্ধার কাজে সরকার বা সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাব ছিল। এমনকি, ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর কার্যত উদ্ধার অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। এরপরও পেরিয়ে গেছে চার দিন। অগ্রগতি বলতে কিছু নেই।
স্বজনদের অপেক্ষার পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তম’ ঘটনার ১২ ঘণ্টা পর মাওয়ায় আসে। কিন্তু ‘রুস্তম’ মূলত শনাক্ত হওয়া ডুবে যাওয়া লঞ্চকে টেনে তুলে। লঞ্চ শনাক্ত হয়নি বলে রুস্তম অলস বসে আছে। এরপর তলব করা হয় ‘নির্ভীক’। পরদিন দুপুরে আসে ‘নির্ভীক’। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে পলি পড়ে লঞ্চটি মাটির নিচে চাপা পড়তে পারে। উদ্ধার অভিযান শুরু করতে অধিক সময় নেয়ার কারণেই মূলত লঞ্চটি উদ্ধারকারীদের রেঞ্জের বাইরে চলে যায়।
উদ্ধারকারীরা দাবি করেছে লঞ্চটি স্রোতের কারণে দূরে সরে যেতে পারে অথবা লঞ্চের ওপর পলি জমার কারণে লঞ্চটি এখনও খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। ঠিক সময়ে কাজ শুরু করতে পারলে হয়ত লঞ্চটি খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু সন্ধান পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকর্মীরা যথেষ্ট প্রশিক্ষিত নয় বলেও প্রশ্ন উঠেছে। উদ্ধারকর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হলে উদ্ধার কাজ আরও সহজ হতো। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামসুজ্জোহা খন্দকার বলেন, উদ্ধার তৎপরতায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানে কোন গাফিলতি নেই। সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিএনপির সমবেদনা ॥ শুক্রবার সকালে লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনদের খোঁজখবর এবং কাজের অগ্রগতি দেখতে মাওয়ায় আসে বিএনপির একটি টিম। এই টিমের প্রধান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন লঞ্চডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ও নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। তিনি উদ্ধার কাজে সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, যদি অতীতের ঘটনাগুলোর বিষয়ে তদন্ত এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হতো তবে এ দুর্ঘটনা ঘটত না। বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারের সব ক্ষেত্রেই সেবামূলক বিষয়ে অব্যবস্থাপনা দেখা যায়। ফলে দেশের সব জায়গায়ই বিশৃঙ্খলা ঘটে। এ সময় জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীসহ এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-প্রকাশনা সম্পাদক শফি বিক্রমপুরী, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবু সাইদ খোকন, কেন্দ্রীয় যুবদলের সিনিয়র সভাপতি আব্দুস সালাম আজাদ, জেলা বিএনপির সেক্রেটারি রিপন মল্লিক, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম, সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক একেএম মহিউদ্দীন খান মোহন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি মাওয়া লঞ্চঘাট এলাকায় নিহতদের উদ্দেশে প্রার্থনা করেন। এদিকে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট মহসিন মিয়া লঞ্চ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেন এবং নিহতদের পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানান।
মাওয়া রেস্ট হাউসে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নৌ-মন্ত্রী ॥ মাওয়া ঘাটের অদূরে পদ্মা সেতু রেস্ট হাউসে শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে আসেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহা খন্দকার। ডুবে যাওয়া লঞ্চের অনুসন্ধান তৎপরতার খোঁজ নিতে আসা শাজাহান খান এসেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক সদস্য (পরিকল্পনা) ভোলানাথ দে, প্রত্যক্ষভাবে অনুসন্ধান তৎপরতার সমন্বয়কারী নৌ-বাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম প্রমুখ। এই বেঠক শেষেই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিং করেন নৌমন্ত্রী।