সোমবার ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ ইং ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

নজরদারীতে পুলিশ কক্সবাজার হোটেল মোটেল জোনে অপহরণ চক্র

আপডেটঃ ৫:৫৮ অপরাহ্ণ | আগস্ট ১৫, ২০১৪

জসিম উদ্দিন সিদ্দিকী কক্সবাজার
কক্সবাজার হোটেল মোটেল জোনে বেড়েছে অপহরণসহ বিকাশে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা। শহরের হোটেল মোটেল জোনসহ নির্মাণধীন প্ল্যাট বাসায় এ ঘটনা ঘটে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র প্রকাশ, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাতœ চরমভাবে বেড়ে যাওয়ায় যুব সমাজ যেমন অধপতনের দিকে ধাপিত হচ্ছে তেমনি মাদকের অর্থ যোগানের জন্য খুন অপহরণ ছিনতাই চুরি ডাকাতি চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমুলক ঘটনা ক্রমশ: বাড়ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ফাঁকি দিয়ে চিহ্নিত এসব সন্ত্রাসীরা পুরো হোটেল মোটেল জোনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এই অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। যার কারণে সৈকত এলাকায় বেড়াতে আসা লোকজনের মাঝে অপহরণ ও বিকাশে মুক্তিপণ আদায়ের আতংক বিরাজ করে। সম্প্রতি শহরের কিলার রকি ও দেলু আটক হওয়ার পর ফের বেপরোয়া হয়ে পড়েছে তাদের অন্য সহযোগি সদস্যরা। কক্সবাজার সদর মডেল থানায় তাদের বিরুদ্ধে খুন, চাদাবাজি, অপহরণ, ছিনতাইসহ ডজন ডজন মামলাও রয়েছে। থানার কতিপয় কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অংকে ম্যানেজ করে ব্যাংকে লেনদেন করতে যাওয়া-আসা জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীদেরকে প্রকাশ্যে ডাকাতি, ছিনতাইসহ মুক্তিপণ আদায় করে আসছে ওই চক্রের সদস্যরা। ১৫ আগষ্ট বিকালে কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে আসা মহেশখালী উপজেলার ছোটমহেশখালী এলাকার নুরুল আলম জানান, ১৩ আগস্ট রাত ২টার দিকে শহরের কলাতলীর হোটেল মোটেল জোনের ক্লাসিক সী-রিসোর্ট নামের একটি ভবনের সপ্তম তলা থেকে মোরশেদুল আলম (১৮) নামের এক যুবককে বিকাশে মুক্তিপণ দিয়ে উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপহৃত মোরশেদুল আলম মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের লম্বাঘোনা গ্রামের জহিরুল হকের ছেলে বলে জানা গেছে। অপরদিকে, অপহরণকারি চক্রের সদস্য আব্দুল¬াহ আল মামুন নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। তিনি দু:খ করে বলেন,বলতে গেলে কক্সবাজার হোটেল মোটেল জোনটি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যর পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়তে হয়ে আসছে কোন না কোন হোটেলে অপহরণ, ইয়াবা ও বিভিন্ন চোরাই মালামালের লেনদেন।
সুত্রে আরো জানা গেছে, শহর-শহরতলীর হোটেল মোটেল জোনে এ অপ-কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে একটি ক্ষমতাধর সিন্ডিকেট চক্র। এনিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারীও কমতি নেই বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কক্সবাজারের হোটেল মোটেল ও কটেজ জোনে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক, পতিতা ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা নিরাপদে এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে। হোটেলে নিয়োজিত কর্মচারীদের সহযোগিতায় হোটেল মোটেল জোনে চক্রটি মোটা টাকার মাধ্যমে নিরাপদে অপরাধিরা এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্টান হওয়ায় আইনশৃংখলা বাহিনীর নজরদারী কম থাকার সুবিধাও পেয়েছেন অপরাধী চক্র। এছাড়া হোটেল-মোটেল জোনে প্রতিনিয়তে হত্যাসহ ঘটে আসছে নানা ধরণের রহস্যজনক ঘটনা। একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে পর্যটন শহর কক্সবাজারের সুনাম ক্ষুন্ন হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব-দরবারে।
আরো জানা গেছে, কক্সবাজার শহরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হোটেলের মধ্যে হোটেল শৈবাল, হোটেল প্রবাল হোটেল উপল, হোটেল লাবনীসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন সৈকত পাড়া এলাকার নিশান গেষ্ট হাউজ, সী-পাল, সাউথ বীচ রিসোর্ট, হোটেল বেভিউ, থ্রী-স্টার রিসোর্ট, গ্রাউন্ড বীচ রিসোর্ট, হোটেল আলফা, ইকরা বীচ, সমুদ্র বিলাস, ক্যানিমা রিসোর্ট, এন এম কর্টেজ, সাগর বিলাস, প্রাইম পাকর্, বীচ ভিউ, ফাহিম কর্টেজ, সী ওয়েলকাম, হোটেল শামস, শাহ আমানত কটেজ, চৌধুরী কটেজ, সী-পাল-২, ঢাকা কটেজ, বু-ওয়াটার, রংধুনু কটেজ, সী ল্যান্ড কটেজ, আইল্যাডিয়া, সী-কিং, সী-কক্স, প্রতীক জিনিয়া,লাইট হাউজের ফয়সাল কটেজ, এসএম কটেজ, মামস কটেজ, সী-শার্ক রিসোর্ট,সবুজ ছায়া রিসোর্ট, রহমানিয়া কটেজ, ছায়ানীড়, রমজান কটেজ, শহরের জিয়া কমপ্লেক্স, ঢাকা হোটেল, সাতকানিয়া হোটেল, নজরুল বোডিং, আহসান বোডিং, থানার পিছন রোডের যমুনা গেষ্ট হাউজে এ অবৈধ কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে ঐ চক্রটি। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শহরের রুমালিয়ারছড়ার যুবক এবং হোটেল সী-পাল কটেজের ভাড়াটিয়া মালিক ইলিয়াছ, সৈকত পাড়াস্থ হোটেল সাউথ বীচ এর ভাড়াটিয়া মালিক তসলিম, গিয়াস উদ্দিন, ফয়েজ, টেকনাফের ইয়াবা ইসছাক, আবছার, শহরতলীর লারপাড়ার বাসিন্দা শাহজাহান আনসারী, নোহা চালক নাছির, লাল মোহাম্মদের ছেলে বশির আহমদ, ইয়াবা কালাম,বাসর্টামিনাল এলাকার ত্রাস মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ আলম, মোক্তার আহমদ, পতিতা ব্যবসায়ী সেলিম, মাহবুব, নুরুল হুদা, কলাতলীর ফয়েজ পুলিশ সদস্য কামরুল, কাইয়ুম, আনসার জিন্নাহ, আবুবক্কর, ঢাকাইয়া সুমন, কলাতলীর মফিজ, সৈকত পাড়ার রোহিঙ্গা কামাল, কালা খোরশেদ, আমির আলী, মাইক্রেচালক রোহিঙ্গা শাহেদ, মর্জিনা, থ্রী-স্টারের ইসমাঈল, টমটম চালক সদ্বীপের বাসিন্দা জামশেদ, বাসর্টামিনাল এলাকার সেলিম, কবির, শহরের ঘোনাপাড়ার বাসিন্দা আমির, ৬নং এলাকার ছিনতাইকারী শাকিব, ফাতেরঘোনার মোক্তার মাঝির ছেলে মামুন, রোহিঙ্গা সেলিম, মোহাজের পাড়ার কামাল, পাহাড়তলীর ইয়াবা ভুলু, ইয়াবা সোহেল, শফিক, টেকপাড়ার মিজান, শাহাবউদ্দিন, ইউসুফ আলী ঘোনার জসিমসহ আরো নাম অজানা অনেকেই ওই ভয়ংকর সিন্ডিকেটে সরাসরি জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগিদের। চক্রটি হোটেল মোটেল কটেজ জোনে নিয়মিত অপরাধমুলক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে এমনটি দাবী স্থানীয়দেরও। অপরদিকে হোটেল মোটেল জোনে  টেকনাফ, উখিয়া ও শহরের আলোচিত দাগী আসামী অপহরণ চক্রসহ ইয়াবা ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই হোটেল মোটেল জোনকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। স্থানীয় অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীও হোটেলে আমোদ-ফূর্তি করতে ভীড় জমায়। এতে জড়িয়ে পড়ে অপহরণ মুক্তিপণ আদায়, ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসার মত ঘটনায়। তাদের মধ্যে অনেকেই কয়েক ঘন্টার মনোরঞ্জনের জন্য মাদক সেবনসহ পতিতাদের নিয়ে ঢুকে পড়েন হোটেলে। এসবের সহযোগী ও নীরব সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন শহরের হোটেল মোটেল ও রেঁস্তোরা কর্মচারীরা। পুলিশ সুত্র জানিয়েছে, অপহরণ চক্রের সদস্যরা পুলিশের কাছে ধরা পড়লে গভীর রাতে তাদেরকে বাঁচানোর জন্য শহরের রাজনৈতিক নেতারা প্রানপণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। সেজন্য অপরাধিদের নিমূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
কক্সবাজার গোয়েন্দা পুলিশের ওসি একে এম মনজুরুল আলম জানিয়েছেন, হোটেল মোটেল জোনে সম্প্রতি অপহরণ মুক্তিপণ আদায়ের মত ঘটনা বেড়েই চলছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে কৌশলে অপহরণকারীদের আটকও করে যাচ্ছে। কিন্তু সঠিক তথ্য পেলে গডফাদারকে ধরে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনর্চাজ মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, কিছু অপহরণকারী আটক করে আদালতে ১৬৪ করা হয়েছে। অবশিষ্টদের ধরতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ওসি আরো জানান, অভিযান চালানো হলে ক্ষমতাধর নেতারা বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে আসল অপরাধিদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন অপহরণকারী চক্র যতই শক্তিশালী হউক না কেন কেউ ছাড় পাবে না, আশাকরি দ্রুত চক্রটি পুলিশের হাতে ধরা পড়বে।
এনিয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানিয়েছেন, কক্সবাজার দেশের বৃহত্তম একটি পর্যটন রাজধানী। প্রকৃতির দেওয়া বিশাল এই সমুদ্র সৈকতে নিয়মিত দেশ-বিদেশ হতে বিভিন্ন শ্রেণীর পর্যটক আসছে। যদি কোন চক্র হোটেল মোটেল জোনে অপরাধমুলক কর্মকান্ড চালিয়ে থাকে তাহলে তাদের অবশ্যই কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তিনি বিষয়টি আইনশৃংখলা বাহিনীর মাধ্যমে সত্যতা খুঁেজ বের করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে দায়িত্ব দেন।
অভিযুক্ত হোটেল কটেজে গুলোর ব্যাপারে আরো অধিকতর গোয়েন্দা নজরদারীসহ খোজ-খবর নিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলা পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।