বৃহস্পতিবার ৪ঠা মার্চ, ২০২১ ইং ১৯শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

পনেরো আগস্ট ॥ শোকোত্তর চেতনার পটভূমি

আপডেটঃ ১০:২৮ অপরাহ্ণ | আগস্ট ১৬, ২০১৪

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী
-দৈনিক জনকণ্ঠ
10612771_264905917032607_5341753968746276174_n

মানবদেহের অঙ্গবিশেষে অপঘাতজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য একটা জৈবপদ্ধতি প্রাকৃতিকভাবে কার্যকর হয়ে তাকে স্বাভাবিক কাজের যোগ্য করে তোলে। ব্যান্ডেজ করা ক্ষতস্থান চোখের আড়ালে ড্যামেজ কীভাবে রিপেয়ার করে তার কোন ডাক্তারী ব্যাখ্যা না জেনেও উপশমের আনন্দ আমরা অনুভব করতে পারি। দৃশ্যের হাজিরা থেকে বস্তুগত গুরুত্বের সংবেদ অভিন্ন না হলেও মানসিক আঘাতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল। কিন্তু ব্যক্তিবেদনার চেয়ে জাতিগত সামষ্টিক বেদনার আলাদা মাত্রা থাকে, কেননা জাতিগত বেদনার সঙ্গে আদর্শবোধের যোগ না থেকে পারে না। সে কারণে জাতিক অপঘাতকালের ধারায় প্রশমিত হয়ে তার অন্তর্গত চেতনার অভিঘাতকে নিঃশেষিত করে না। শোকোত্তরকালে শোক-শক্তির মধ্যে যোগসূত্র গড়ে ওঠে। তবু তার অন্তর্নিহিত গভীরতর তাৎপর্যের রেশ থেকে যায় এবং নতুন প্রকর্ষের আলোকে তার একটা আদর্শমান প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। প্রকৃতি-নির্ধারিত অমোঘ মানবসম্পর্কে যে দুর্বলতা নিহিত, তাতে আঘাত লাগলেও শোকসঞ্চার হয়, কিন্তু সে শোক সব সময়ে ন্যায়বোধের প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্ট নয়। যে শোকের সঙ্গে রক্ত সম্পর্ক বা অমোঘ মানবিকতার যোগসূত্র নেই, তা আসে আদর্শের চেতনা থেকে এবং সেই চেতনার প্রতি চিন্তার সমর্থন থেকে।

অখণ্ড পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ-জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রধান প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধুর জীবনে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ যে অপঘাত নেমে আসে তা অন্যায্যতার উৎস থেকে আবর্তিত, তাই আদর্শবাদী মনের কাছে তা অবশ্যই ব্যক্তিক ও জাতিগত শোকোৎসার দাবি করে। তাঁর অকালপ্রস্থান তাই স্মৃতি থেকে মুহূর্তের জন্যও অপসারিত হয় না। বাঙালী ভুলতে পারে না রাষ্ট্রস্থপতির সেই অন্যায্য পরিণতি। কারণ তাঁর জীবন ও রাজনীতি ছিল মঙ্গলচিন্তার ছকে বাঁধা, যার প্রতি বাঙালীর সমর্থন শর্তহীন। কালপঞ্জির হিসাবে ১৫ আগস্টের আসা-যাওয়া একটা উপলক্ষ মাত্র। একটা স্মৃতিস্মারক হিসেবে দিনটি আমাদের এবং আমাদের জাতিকে জাগিয়ে রাখে প্রতিবাদ-প্রতিশোধের স্পর্ধায়। এমন একটি দিনের প্রহর বিষাদের ছায়া ফেলে মনকে যেমন আচ্ছন্ন করে, তেমনি সৃষ্টিপ্রবণ মনকে কল্যাণের দিকে আকর্ষণ করে এবং চূড়ান্তভাবে নতুন শক্তিতে জেগে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে। সমাজের ভাঙ্গন থেকে ব্যক্তিমনের ভাঙ্গন। সমাজের অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি হৃদয়েও ক্ষতের সৃষ্টি। তখন একটা প্রতীকের শক্তি থেকে জীবনের প্রত্যয়গুলো নতুনতর নবায়ন-আকাক্সক্ষা জাগাতে পারে। আত্মনবায়নের এই শক্তি আমরা পাই বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিয়োগান্তক যবনিকা থেকে। শুনতে অস্বাভাবিক হলেও ১৫ আগস্ট আমার কাছে শোকের এবং আনন্দের যুগল উৎস। শোক আসে অবলোপের বিষাদ থেকে আর আনন্দ আসে অভিপ্রায়ের রূপান্তর থেকে। অপঘাতের অবিকল্পতা যখন আমাকে কষ্ট দেয় তখন আমার জন্য আনন্দ একটি রিসাইকল্ড প্রোডাক্ট হিসেবে সামনে এসে সান্ত¡না দেয়, বলে : তুমি তাঁর জীবন থেকে সেই অনুপ্রেরণা ছেঁকে তোলো যা তোমাকে আনন্দিত করবে সৃষ্টিশীল নতুন সংস্কারের অভিপ্রায়ে। বাংলাদেশের পলিমাটিতে প্রতিভার ফলন যে হারে সম্ভব তা কিন্তু ঘটানো যায় না, ঘটে না বিষয়টি অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন সত্য, রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনি তা অসত্য নয়। বঙ্গবন্ধু সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। শের-ই-বাংলা এবং মওলানা ভাসানীরও আলাদা মূর্তি আছে, পৃথক ভাব-ঐতিহ্যে তাঁরা বলীয়ান, বিশেষ মর্যাদারও অধিকারী, বঙ্গবন্ধুর চেহারাচিত্র এ দেশের মানুষের মনোলোকে স্থায়ী উজ্জ্বলতায় স্থির হয়ে আছে।

গাঙ্গেয় পলি-কাদার কোলে দোল খেয়ে বাঙালী শিশুরা মাটির গড়নে গড়ে ওঠে। বড় হয়ে তারা মাটিকে ভালবাসে, মাটিতে সম্ভাবনার বীজ বোনে। কেউ মাটি কেটে তার মধ্যে মনের মাধুরি ঢেলে মৃৎপাত্র গড়ে, কেউ মাটির গর্ভ থেকে টেনে তোলা বাঁশ-কাঠ কেটেকুটে আসবাব বানায়, কেউ চামড়ার পেটে লোহার চাবুক চালিয়ে পায়ের শোভা বাড়ায়, কেউ গার্বেজের তলানি থেকে জীবনের কুসুম তুলে আনে। বঙ্গবন্ধু ভালবাসতেন তাদের সবাইকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি এসব মানুষের ভালবাসা প্রগাঢ় ছিল বলেই তাঁকে হৃদয়ের মূর্তি ভেবে চুম্বন করেছে তারা। একাত্তরের বিজয় এবং তার পরকালের রাষ্ট্র সংগঠন, এই দুটি অধ্যায়ের মধ্যে ফারাক দেখিয়ে তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয় পৃথিবী থেকে, এমন কথা যারা বলে তৃপ্তি পায়, তাদের জানা উচিত, প্রথম অবস্থাটিকে যারা মানতে পারেনি, দ্বিতীয় দশায় তারা কী করে আস্থা আনবে। যারা হন্তারক তাদের তরবারি ধুয়ে ফেলা যায়; কিন্তু হাতের রক্তচিহ্ন পানিতে মোছে না। এ হচ্ছে ফেরকাবাদী গোত্রগোষ্ঠীর এক তেলেসমাত। এই গোষ্ঠী তারাই যারা পাকিস্তানের পদ্মকস্তুরি রুমালে বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। তাদের মধ্যে যারা সবলে টিকে আছে তাদের জিহ্বা বেড়েছে, লালা উৎপাদন-প্রণালীও এখন আগের চেয়ে সংহত। ছোবল তারা অতীতে বসিয়েছে বঙ্গবন্ধুর ওপর, আবার হয়ত তারা বসাতে চেষ্টা করবে বঙ্গসন্তানের ওপর, বঙ্গতনয়ার ওপর; কিন্তু পিতার দীক্ষা তাদের পথ দেখায় বলে হীনচক্রের কারসাজি কিনারা পাবে না।
নতুন শতকে এসে ঘাতকচক্রের আইনী শাস্তি বিধান বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হতে পারে। তাদের কৃৎকর্মের বদলা পাইয়ে দিতে যে আইনযুদ্ধ তার ন্যায়ানুগ ফলাফল বঙ্গবন্ধুকে আরও সম্মানিত করেছে, তাঁর তথাকথিত ব্যর্থতা, তাঁর প্রতি গোষ্ঠীবিশেষের অশ্রদ্ধা এবং অবমাননার ভিত্তিকে আরও একবার ঐতিহাসিকভাবে অপ্রমাণ করেছে। যারা অপকর্মকে সহযোগিতা করেছিল তাদের রক্তদোষ, গূঢ়-অপরাধ দ-িত হয়েছে। আগস্টের স্মৃতির কাছে চাইতে হবে সেই শক্তি যা প্রতিশোধকে নস্যাৎ করে, সেই সাহস যা ঘাতকের মিত্রতাকে ছত্রভঙ্গ করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। কেউ কেউ অসুন্দরের আশঙ্কাকে নিন্দিত করতে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেয়ার কার্যকারণ দেখাতে অতিকল্পনার আশ্রয় খোঁজে, যা অবিশ্বাসের প্রহারে জর্জরিত। যে ফুল ফোটেনি তার প্রশংসা যেমন অবাস্তব, তেমনি যে কাঁটা আঘাত করেনি তার নিন্দা অযৌক্তিক। তিনি যা করেছিলেন তার প্রতি সুবিচার করতে পারলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাস ভিন্ন আঙ্গিকে লিখিত হতো। তিনি যা করেন তাঁর বিকল্প আর যা করতে পারতেন, যা করবেন বলে ধরে নেয়া হয়েছিল এবং তার ওপর আরোপ করে উর্বরভাবে যা কল্পনা করা হয়েছিল তার ভিত্তিতে অপঘাতের ব্যাখ্যা অযৌক্তিক। ঐসব চিন্তায় যে দেশপ্রেমিকতার প্রচেষ্টা আছে, তার ছিটেফোঁটাও তাদের ছিল না, যারা ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীস্বার্থে হত্যার অস্ত্রকে পশুত্বের দাসরূপে ব্যবহার করেছিল।

স্মৃতিজগতের বঙ্গবন্ধু এখন জাতির সঙ্গে আছেন, তিনি আমাকে বড় করে তুলছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে, হৃদয়ে স্পর্শ টেনে। বিরূপতার ধাক্কায় রাষ্ট্রযন্ত্র অস্থির, ব্যক্তিমন আর জাতিমন দুই-ই দোলায়মান। ইতোমধ্যে মৌলবাদের কেরামতি কতই না লোক হাসাল, নারী অধিকার নিয়ে নাকানিচুবানির কতই না খেল জমাল। শফি-মোল্লারা তেঁতুলতত্ত্বের মধ্যযুগীয় অখাদ্যের খাদেমদারি শুরু করে, তখন আধুনিকতার খোরাক যোগাতে পারে তরুণ প্রজন্ম। তাদেরই তো সমাজসচেতন হওয়ার কথা, যুগপ্রগতির হাতল শক্ত করে ধরতে না পারলে বঙ্গবন্ধুকে নিরাপদ রাখা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে যে প্রত্যয়ের কথা বলা হয়, তা দিয়েই তো আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনের অগ্নিপরীক্ষায় বসেছে। আগস্টের কলঙ্ক থেকে আমাদের কী কী নিতে হবে তারও একটা নমুনা দরকার। জাতি প্রতিষ্ঠার আগে তার স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা পায়, বাংলাদেশকে অনেকদূর নিতে চাইলে আমাদের আগে কিছু তাত্ত্বিক ত্রুটির নিরসন দরকার। জাতি নির্মাণ প্রশ্নে দরকার মোটা দাগের সংহতি। জাতির কিছু সর্বজনচিন্তিত সমস্যার সুরাহা থেকে, কিছু বিষফোঁড়ার অপসারণ থেকে তা আসবে। দেশের মানুষ যদি সূর্যের আলোর পাশাপাশি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারে তখন তারা বুঝতে পারবে কী ভয়ঙ্কর গোখরোর জন্য তারা এতদিন দুধকলা উপাচার দিয়ে এসেছে। যারা জানে, তাদের শক্তি আসে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার থেকে, তারা কখন আঁধার খেদানোর ব্যাপারে যত্নবান হবে না, কেননা তা তাদের কফিনে পেরেক সাঁটানোর কানাকড়িটাও যুগিয়ে দেবে না। সুতরাং যুদ্ধাপরাধের নিষ্পত্তি দেখিয়ে জনগণের মনে ধর্মধর্ষকের আসল চেহারা প্রমাণ করে দিতে পারলে তারা ভবিষ্যতে তাদের শত্রু-মিত্র চিনতে পারবে, জনগোষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর অংশের জন্য যেটা বিশেষ জরুরী। দেশকে যারা ভালবাসে বঙ্গবন্ধুকে তারা হত্যা করেনি, তারাই তাঁকে হত্যা করেছে যাদের ভালবেসে আশ্রয় দিয়েছিল এই দেশ, একাত্তরের পরে। তাদের তো দেশের মাটি থেকে সরিয়ে দেয়া যেত, যে দেশের বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্র করেছিল পতনের মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য। উদার মানবতার জবাবে তারা হত্যাকেই প্রতিদান ভেবে সর্বনাশ করেছিল। কোন জাতি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা আর স্থপতি যিনি হন, তাঁর সেই উদারতার অধিকার থাকে, ক্ষেত্রবিশেষে তিনি ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু যে জাতি পতাকায় তার সার্বভৌমত্ব খুঁজে পায়, তার আচরণে কোন লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া উচিত, হত্যার নাকি সৌজন্যের? এই প্রশ্ন মনে এলে আমার এবং জাতির সংবেদনশীল অংশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত, আমি তা প্রায়ই ভাবি, অশ্রুবিদ্ধ হই। নতুন করে ঘুরে আসা এই দিনের জন্য চোখের পানি যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন আহত অহমের জাগৃতি, যা প্রতিরোধ-প্রতিশোধ স্পৃহার জন্য জরুরী।

সমরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পার্থক্যের আদি নজির সন্ধানে ফিরে যেতে হয় সভ্যতার সূতিকাগার প্রাচীন গ্রীসের দুই নগররাষ্ট্র এথেন্স ও স্পার্টার ইতিহাসে। স্পার্টার গৌরব-ঐশ্বর্যের যে আবহ রচিত হয়েছিল তার অংশ জুড়ে সামরিক আস্ফালন তথা নিষ্ঠুরতার বহির্প্রকাশ। পেশীপ্রাবল্যে শক্তিমত্তার অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত তারা সৃষ্টি করেছিল; কিন্তু শক্তিকে স্থিতির গৌরবে অভিষিক্ত করতে চাইলে সুরুচি ও সংস্কৃতির যে পরিশীলন জরুরী স্পার্টার সেটা না থাকায় তারা সুশীল সভ্যতা পত্তন করতে পারেনি, যদিও যুদ্ধলব্ধ বিজয় তারা উপভোগ করেছে। অন্যদিকে এথেন্সের অহঙ্কার তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, তার সাংস্কৃতিক সুরুচি, তার শ্রেয়োবাদী নীতিবোধ ও সর্বোপরি সভ্যতাসন্ধানী প্রবৃত্তি। এথেন্স স্পার্টা দ্বন্দ্বযুদ্ধে সামরিক জংলিতন্ত্রের বিজয় ঘটে; কিন্তু স্পার্টার উচ্ছৃঙ্খলতায় সভ্যতার যে অবমাননা তা উত্তর-প্রজন্মেও সমর্থন পায়নি। বরং সমরতন্ত্রের সারশূন্যতার চিত্রই ফুটে উঠেছে; অস্ত্রশক্তি কীভাবে আক্ষরিক বিজয় অর্জন সত্ত্বেও মনুষ্যত্বের মহিমাকে খর্ব করে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে স্পার্টা অনাগত কালের কাছেও সাক্ষী হয়ে থাকবে। গ্রিসের উৎসভূমি থেকে সমরতন্ত্র যেদিকেই বিস্তৃত হয়েছে সে তার মৌলিক চরিত্রটি অক্ষত রেখেছে। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশ পর্বের দিকে দৃষ্টি দিলে সমরতন্ত্রের প্রাচীন চেহারাটিই পাওয়া যাবে। আইয়ুবী সমরতন্ত্র, ইয়াহিয়া সমর শাসন, জিয়া-এরশাদ সামরিক স্বৈরবাদ পর্যবেক্ষণে উপলব্ধি সহজ হবে প্রত্যেকটি পর্যায়ে অস্ত্রের সাহায্যে নিরস্ত্রের পীড়ন সাধিত হয়েছে; বিশৃঙ্খলার আঘাতে শৃঙ্খলার বিন্যাস বিপর্যস্ত করে জনআকাক্সক্ষার সম্ভ্রম নষ্ট করা হয়েছে।

গ্রিসের প্রাচীন ব্যবস্থায় সমরতন্ত্রের ধ্বংসাত্মকতাকে যে মাত্রায় প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোয় সমরতন্ত্রের অপ্রত্যাশিত ভূমিকাকে তার চেয়ে অধিক মাত্রায় আক্রমণের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত। এটা এ জন্য যে সেখানে সামরিক বাহিনীর কৃতকার্যতা গণতান্ত্রিক শাসন-প্রণালীর সিদ্ধি-সৌকর্যে নিবেদিত থাকার অঙ্গীকারকে আইনী অপরিহার্যতায় ধার্য করা হয়েছে। অস্ত্রের ভূমিকা উদ্দেশ্য-নিরপেক্ষ, নীতি-নিরপেক্ষ ও পরিস্থিতি-নিরপেক্ষ; অস্ত্রকে ধারণ করে যে হাত এবং হাতকে নিয়ন্ত্রণ করে যে মনীষা তার সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকে সমরাস্ত্রের সাধ্যতার প্রসঙ্গটি। বেসামরিক বৃত্ত থেকে সামরিক জগদ্বলয় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৃহদাংশে বিচ্ছিন্ন বলে যে নীতিনিষ্ঠায় গণতন্ত্র পথ চলে সমরতন্ত্রে তাকে সন্তোষজনক মাত্রায় আত্মস্থ করতে পারে না। ফলে সেনা-ছাউনিতে পঠিত শপথবাক্য গণতন্ত্রেও তাঁবুর নিচে এসে প্রলোভন-প্রশ্রয়ের কুয়াশায় পথ হারায়। কিন্তু এ যুক্তিতে সামরিক দুষ্কর্মকে বৈধতাদানের কোন ইশারা এখানে নেই; কারণ সেনাসমষ্টির সংহতিক্রিয়া শ্লথ হলে বাহিনী ভেঙ্গে নানা সময়ে ফ্র্যাকশনের উদ্ভব ঘটে, যার চালিকাশক্তি অশুভ বহির্বলয় থেকেও সঞ্চালিত হওয়া অসম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে সেনাশক্তির স্খলিত অংশমাত্র সক্রিয় ছিল নাকি তার সঙ্গে যুক্ত ছিল অখণ্ড সেনাবাহিনী ও বহির্শক্তির বিভিন্ন উৎস সে বিতর্কের নিষ্পত্তি জরুরী। তবে তার আগে মুক্তিযুদ্ধের খোদ ময়দান ঘুরে আসা যাক। জনক হত্যার ট্র্যাজেডি মঞ্চায়নের রিহার্সেল যখন শুরু তখন জনকের জন্ম ঘটেনি, তখন তিনি জাতি-স্থাপনার মালমসলা জড়ো করেছেন মাত্র। মার্কিন মুলুক থেকে বাড়ানো হাতের সঙ্কেত উপেক্ষা করার শক্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর, সে শক্তি সনাতনী শক্তি নয় যার প্রমাণ নিহিত পরাশক্তির ফিরিয়ে নেয়া হাতে। হাত ফিরিয়ে নেয়া সহজ; কূটমতলবের ক্লেদ ধুয়ে ফেলা সহজ নয়। নাটের গুরুর সপ্তম নৌবহরও তো এগিয়ে আসার কথা আমরা শুনেছি। আহত শক্তি হয়ত লুকিয়ে ছিল পঁচাত্তরের অপেক্ষায়। সে সময়ের দ্বি-প্রকোষ্ঠ পৃথিবীর অপর প্রকোষ্ঠের সদস্য চীনও যে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আহত বোধ করেছিল সে গল্পইবা অজানা কার? আদর্শ শ্রেণীর নিয়ন্তা হিসেবে এমন কেউ একজন অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাঁর সেই ক্ষমতা থাকে যার সহায়তায় তিনি ওই আদর্শমানকে কোন একটি ভৌগোলিক পরিসীমায় প্রতিষ্ঠিতের চেষ্টা চালান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনি এক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালী জাতিসত্তার ক্রমগঠিত আদর্শিকতাকে বাংলাদেশ ভূখ-ে প্রতিষ্ঠিত করেন। আদর্শ প্রতিষ্ঠার সেই সংগ্রামে গণমানুষের অধিকার প্রশ্নটি সম্পৃক্ত থাকায় সমআদর্শিক জনগোষ্ঠী তাতে একাত্মতা ঘোষণা করে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে অবশ্য অন্য আদর্শগোষ্ঠীর বিরোধী প্রচেষ্টাকেও একই সংবেদনায় গ্রহণের প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। জবাবে বলা যায়, আদর্শের অভিমান তখনই অগ্রাধিকার পেতে পারে যখন তার সঙ্গে নীতি ও বাস্তবতার অনুমোদন থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আদর্শিক মানদ-ে বাঙালী জনতার আকাক্সক্ষা রূপায়ণে নিবেদিত হয়েছিলেন তা ছিল একই সঙ্গে ন্যায্যতা এবং বাস্তবতার আদর্শ। বিরোধী শক্তিগুলো তাত্ত্বিকভাবে তাদের আদর্শচিন্তার অনুকূল যুক্তি তুলতে পারে; কিন্তু ব্যবহারিক সূত্রে তাদের আদর্শচিন্তায় মানবহিতৈষার বৃহৎ আকুতি না থাকায় এবং স্বীকৃত সাধারণ নীতিসূত্রে তাদের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা অনুমোদন পেতে পারে না। ধর্মকুহকের চশমায় তারা যা দেখেছে তাতে মানবতার আবেদন এমন বেদনাদায়কভাবে ক্ষুণ হয়েছে যে তাকে কায়েমি স্বার্থান্ধ শ্রেণীর আত্মপ্রবঞ্চনাই বলা চলে। মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ নয় মাসে পাকিস্তানী শত্রুপক্ষ ও এ দেশীয় তাঁবেদার শ্রেণী মানবতার সাধারণ সূত্রের উল্টো অবস্থানে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে কলঙ্কিত করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে পরাজয় স্বীকারে বাধ্য হলেও পরাজিত অপশক্তি তাদের ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নেড়েই চলছিল; শুধু তাদের ভূমিকার ধরনকৌশল পাল্টে গিয়েছিল। নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তারা অসহযোগী ভূমিকা পালনই শুধু করেনি, চক্রান্তের কৌশলে তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধুকে তারা একটি বিরোধী আদর্শ হিসেবে দেখত বলে তিনি ছিলেন তাদের ষড়যন্ত্রের সাক্ষাত প্রতিপক্ষ।
পনের আগস্ট হত্যাকা-কে নানা শ্রেণীকরণে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে এবং এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হত্যাকা- সম্পর্কে বিভ্রান্তি-আত্মপ্রবঞ্চনার গড্ডলিকা বয়েই চলে। এ বিষয়ে লোকশ্রুতিনির্ভর, কিংবদন্তি-আশ্রিত যে ধারণাবাদ চালু আছে। বলা হয়, আগস্ট-ট্র্যাজেডি ব্যক্তি-আক্রোশ, সম্পর্কবিচ্যুতি ও স্বার্থ-সমীকরণের উপজাত হিসেবে সংঘটিত। এ মতের সমর্থক হিসেবে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের কারও কারও এবং তাঁর আনুকূল্যপ্রাপ্ত, অনুগৃহীত গোষ্ঠীর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ঘটনাসূত্রকে হাজির করা হয়ে থাকে। কিন্তু যে হত্যাকা- জাতির ইতিহাসের গতিপথকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে, একটি অনৈতিক অভ্যুদয়কে উস্কে দেয় এবং একটি চিহ্নিত অপ-চিন্তার সরণি খুলে দেয় তা ঠুনকো ব্যক্তিসম্পর্কের বিপর্যয়জনিত পরিস্থিতিমাত্র হতে পারে না। ঘটনা-পরবর্তী দৃশ্যপট এবং এ যাবতকালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পর্যবেক্ষণে উল্লিখিত মতচিন্তাটি এতটাই ভ্রান্ত যে এ নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অবকাশ নেই। দ্বিতীয় ধারণাবাদের মূলকথা বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- একটি নিছক রাজনৈতিক ঘটনা এবং এর সেনাসম্পৃক্তি কার্যত উপরিতলের দৃশ্য ছাড়া কিছু নয়। সেনাশক্তি একটা সুবিধাকর অবলম্বন হিসেবেই শুধু নিয়োজিত হয়। কিন্তু মূল ঘটনাক্রমের সঙ্গে সামরিক-বেসামরিক উভয় প্রকার সম্পৃক্তি, বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত দলিল, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক ধারাভাষ্য এবং বাস্তব ঘটনাগুচ্ছের ধারাপাত বিশ্লেষণে মতবাদটির সারবত্তা এমনিতেই নিঃশেষিত হয়ে পড়ে এবং তার বিপক্ষযুক্তির আদৌ প্রয়োজন পড়ে না। তৃতীয় মতবাদটির সারবত্তা এই যে সামরিক বাহিনীর একটি নীতিভ্রষ্ট, আদর্শচ্যুত ও বিপথগামী অংশ রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে সামরিক শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে হত্যাকা-ে লিপ্ত হয়। এর সঙ্গে অবশ্য রাজনৈতিক বলয়ের আস্কারা, সম্পৃক্তি ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লিখিত হয়ে থাকে। এ মত এতই অসার যে এর বিপক্ষে যুক্তিপ্রদর্শন অর্থহীন। পনেরো আগস্ট ১৯৭৫-এর পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার ধারকশ্রেণী হিসেবে আমরা বরাবরই বলে এসেছি সেনাবাহিনীর স্খলিত ভগ্নাংশ এমনকি হাতেগোনা কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিকই হত্যাকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কালপ্রবাহের স্বাভাবিক রীতির ভেতর দিয়ে এবং তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর পরবর্তীকালের চারিত্র্য পর্যবেক্ষণে উপলব্ধ হয় ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর সব পর্যায়ের ঘটিতব্য সম্পর্কে সাধারণ অবগতি ছিল।
তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কোন অংশের প্রধান হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দেননি এ কথা সত্য, কিন্তু তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। বিভিন্ন কাগজপত্র-দলিল-দস্তাবেজ, আসামিদের সাক্ষ্য বিবরণ, কথাবার্তা-কাজকর্ম, সাক্ষাতকার-বিবৃতি, বিক্ষিপ্ত গবেষণাকর্ম, পত্রপত্রিকা, গ্রন্থপুস্তক প্রভৃতি নানা সূত্র পাঠে উপলব্ধি করা যায় সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে কারও কারও ‘ট্যাসিট সাপোর্ট’ ছিল, কেউ কেউ সামগ্রিক বিষয়কে ক্রীড়া-কৌতুকের উৎস হিসেবে উপভোগ করেছেন এবং সেনাচরিত্রের জংলি প্রবণতাপ্রসূত স্বপ্ন পর্যন্তও হয়ত দেখে থাকবেন। বাংলাদেশের পরবর্তী সেনা উপদ্রবের ইতিহাস থেকে তা অনুমান করা অমূলক হবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- সংঘটিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রখণ্ডের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠায় সরকার কাঠামো এবং বেসামরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সামরিকীকরণের ছায়াপাত ঘটেছিল। সমরযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ-কাঠামোর বাইরে নগণ্য সংখ্যক বিদ্রোহী সেনাসদস্যের পক্ষে যদি এত বড় শক্তির প্রদর্শন সম্ভবপর হয় তাহলে সেনাশক্তির পারঙ্গমতা, আত্মমর্যাদা ও কর্তৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া যুক্তিসঙ্গত। সেনাবাহিনীর স্বদেশপ্রেমের কিংবদন্তি সম্পর্কে আমরা অবগত। আমাদের যে অংশ আগস্টের নৃশংসতাকে সামরিক সংঘটনা হিসেবে স্বীকারের প্রশ্নে ভীত এ জন্য যে তারা এটাকে গ্রহণ করলে রাজনৈতিক ব্যর্থতার চিত্রটি উন্মোচিত হতে পারে, তারা প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধুর দেশপরিচালন ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এটা আংশিক সত্য যে, সেনাবাহিনীর ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ তার নিজস্ব স্খলন দ্বারা প্রভাবিত ও প্রলুব্ধ হয়। এ বিষয়টিকে পোক্ত করতেই সেনাচারিত্র্যের একটি সংক্ষিপ্তসার ইতিহাসের স্মরণ নিয়েছি লেখার শুরুতেই। সামরিক স্খলন বিনা মেঘে বজ্রপাতের কোনো ঘটনা নয় বরং তা প্রায়শই ঘটে থাকে। এ দিকটায় মনোনিবেশ করলে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের অরাজক ভূমিকার যে উদ্দেশ্যবাদী গালগল্প হাজির করা হয় তার যৌক্তিক সমর্থনযোগ্যতা খারিজ হয়ে যায় এবং অনায়াসে প্রশাসন-রাজনীতির খোদ চিত্রটি উদ্ধার করা যায়। প্রশাসন-ব্যর্থতার অংশবিশেষের প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে। এটা এ জন্য যে রাজনৈতিক বিচার-প্রক্রিয়ার প্রশ্নে আমাদের আছে একটি গ্রহণশীল সংবেদনা ও অনুভূতির সত্যগ্রাহ্য অনুপাত। স্বীকৃত বাস্তবতার যে অংশে আমাদের অবস্থান সেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধোত্তর যথেচ্ছাচারের উদ্গাতাশ্রেণীর কাঁধে অভিযোগের অনেকাংশই ঝুলিয়ে দেয়া যায়। বিরোধী শিবিরে যাদের অবস্থান হিংসাত্মক ও ধ্বংসমুখী হয়ে পড়েছিল তারা আবার ভৌখণ্ডিক ও বহির্ভৌখণ্ডিক অজস্র প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য পাঁয়তারার সুতাকলে বন্দী ছিল। পরাজিত শ্রেণী এমন ঘনবদ্ধ বুনুনির নীলনকশা কেটেছিল যে বঙ্গবন্ধুর শুভবাদী দূরবীক্ষণকে বিকল করতে সদানিবিষ্ট ছিল। নিজ বলয়ের ছদ্মশত্রু, ঘরের শত্রু মোস্তাক ও তার কুলাঙ্গার শ্রেণী মীরজাফরী করেছে। সেনাবাহিনীর তৎকালীন দ্বিতীয় কর্তৃত্ব জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তিন বাহিনীর তিলকধারী তিন প্রধানের কাছে ঘটিতব্য নৃশংসতার আভাস থাকতেও তারা তাদের সেনাশপথের সম্মান রক্ষা করেনি। সামরিক বিবেকের বিরুদ্ধ ভূমিকা তারা পালন করেছে নিরাসক্তি ও নিষ্ক্রিয়তার বহিরাবরণে। প্রক্রিয়ার প্রতি মৌনতা প্রদর্শন মূলত প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণেরই নামান্তর। অনাগতকালের সন্ধানক্রিয়া ও গবেষণাকর্মে সেনাশক্তির আদর্শপতন ও তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এমন বলিষ্ঠ বাস্তবতা উগলে দেবে যা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারবর্গের পরিণতি আসলে তাদের ভূমিকার প্রতিদান নয়, বরং তা আদর্শবিচ্যুত স্বার্থান্ধশ্রেণীর কারসাজিরই অভিঘাত।
পঁচাত্তরের নাশকতায় অংশ নিয়েছিল সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত কিছু কর্মকর্তা, চাকরিতে বহাল কতিপয়ের কমান্ড ও সাধারণ সিপাহী। সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট, আর্মড কোর, বেঙ্গল ল্যান্সার, আর্টিলারি প্রভৃতি এতে ব্যবহৃত হয়েছে। ট্র্যাজেডি-ক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে এসে তারা সংবিধান-অতিরিক্ত কর্তৃত্ব প্রয়োগে সেনাবলয়ের নিচেই মূলত পুরো ভূখ-কে করায়ত্ত করে এবং সামরিক ফরমানের ফন্দি-ফিকিরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে সমগ্র বাংলাদেশ। কোন দেশে সামরিক আইন জারির রকম হতে পারে : এক. তা সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়াজাত; দুই. বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা-নৈরাজ্যের বিপন্নতাপ্রসূত। পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সেনাপ্রাধান্য পর্যবেক্ষণে দেখা যাবে সেখানে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বা গৃহযুদ্ধসংশ্লিষ্ট কোন বিপর্যয়ের মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনা ঘটেনি। তাদেরই কিংবা তাদের কথিত একাংশের কৃতকর্মের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় তাদের অবতরণ ঘটে। এ থেকে সামরিক প্রভাব-প্রাধান্যের নেপথ্য সত্য হিসেবে সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষ ও স্খলনকেই দায়ী করা যায়।

দ্বিতীয় বিপ্লবের রূপরেখা ধরে এগিয়ে গেলে যুদ্ধ ভূমিকার পাশাপাশি সংস্কার-ভূমিকার ক্ষেত্রেও যে বঙ্গবন্ধু অনন্য হতেন সে বিষয়টিকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি কুচক্রীমহল। এ প্রচেষ্টা নিরর্থক করে দেয়ার হীন চক্রান্তে তারা বঙ্গবন্ধু তথা তাঁর প্রোজ্বল আদর্শকে হত্যা করে। পরাজিত অপশক্তি যুদ্ধের ময়দান থেকে পা গুটিয়ে নিলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তারা প্রতিবন্ধক ভূমিকা প্রত্যাহার করেনি। কায়েমি শোষণের প্রাচীন ঐতিহ্য ধারা অব্যাহত রাখতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প ছিল না। সাধারণ ক্ষমার পরে আলশামস্, রাজাকার, আলবদরের অনেক সদস্যই কারাগারে বিচ