শুক্রবার ৫ই মার্চ, ২০২১ ইং ২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

‘মহাকালে বিশ্বমানব গাইবে যে তাঁর গান’

আপডেটঃ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ | আগস্ট ১৬, ২০১৪

আবদুল মান্নান
সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এটি এখন অনেকটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর বীজ বপিত হয়েছিল। বাঙালি বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখল হতে মুক্ত করতে দীর্ঘ ৯ মাস একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, ঠিক আবার সেই বাঙালিদেরই একটি অংশ ছিল, যারা কখনো চায়নি তাদের সাধের পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ নামের আর একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হোক। এই দলে যেমন ছিল জামায়াত-মুসলিম লীগের ভাবধারার একটি বড় জনগোষ্ঠী; ঠিক একই ভাবে ছিলেন আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা আরেক দল পঞ্চম বাহিনী। আওয়ামী লীগ কখনো একটি বিপ্লবী দল ছিল না। এটিকে বড় জোর বলা যায় পাতি বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি মধ্য বামপন্থী দল আর এই দলে যাঁরাই শুরু থেকে নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগের চরিত্রও তাই ছিল। তবে এটি সত্য, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা মুসলিম লীগের বিপরীতে দলটিকে সব সময় একটি গণমানুষের দল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। জন্ম থেকেই মুসলিম লীগের সঙ্গে সাধারণ জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। দলের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণে আওয়ামী লীগকে অনেক চড়াই-উতরাই পার করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। একাধিকবার দলটি ভাঙনের মুখে পড়েছে, নেতৃত্বশূন্য হয়েছে। কয়েকবার রাজনৈতিক দল হিসেবে এটি নিষিদ্ধও হয়েছে। এই দলের অন্যতম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বিচারের নামে দুবার ফাঁসির মঞ্চের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি এই উপমহাদেশে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জুলাই মাসে আওয়ামী লীগেরই একজন প্রতিষ্ঠাতা নেতা, প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের আইন ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক কলকাতাস্থ মার্কিন কন্সাল জেনারেলের কাছে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য জহিরুল কাইউমের মাধ্যমে গোপনে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে যদি মুক্ত করে দেওয়া হয় তাহলে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি টানবেন। এটি ছিল বাঙালির মুক্তির জন্য যুদ্ধের পিঠে ছুরিকাঘাত করার শামিল। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্স তাঁর ২০০২ সালে প্রকাশিত সাড়াজাগানো তথ্যবহুল গ্রন্থ ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’-এ উল্লেখ করেন, কিসিঞ্জার আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে শুরু থেকেই বিভক্তি আনার চেষ্টা করেন। হিচেন্স তাঁর এই গ্রন্থে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে যড়যন্ত্র, হত্যা ও ক্যুর মাধ্যমে কিভাবে বিভিন্ন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল, তার একাধিক চমকপ্রদ দালিলিক বর্ণনা দিয়েছেন। হিচেন্স তাঁর গ্রন্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন অবমুক্তকৃত গোপন দলিলের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট নিক্সন, হেনরি কিসিঞ্জার ও আন্ডার সেক্রেটারি অব দ্য স্টেট জন আরউইনের মধ্যে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় আরউইন রিপোর্ট করেন, কলকাতায় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের কয়েকজন নেতা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারে কলকাতাস্থ আমাদের কন্সাল জেনারেলের মাধ্যমে কথা বলতে চেয়েছেন’ (হুবহু অনুবাদ নয়)। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন এ ব্যাপারে জানতে পারেন এবং হিচেন্স লিখেছেন, ‘এই সংবাদ জানাজানি হয়ে পড়লে মোশতাককে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে গৃহবন্দি করা হয়।’

997030_264492133740652_7107824218836157261_n

‘মহাকালে বিশ্বমানব গাইবে যে তাঁর গান’

ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। সেই কন্সাল জেনারেল জর্জ আরউইনকে ভারত সরকার সে দেশে অবাঞ্ছিত (Persona Non Grata) করে ভারত থেকে বহিষ্কার করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে পরে আসছি।

একটি দেশে ষড়যন্ত্র, হত্যা, ক্যু অথবা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় একটি নির্বাচিত বৈধ সরকারকে উচ্ছেদ করতে হলে তার জন্য সাধারণত একটি ক্ষেত্র বা পটভূমি প্রস্তুত করতে হয়। বাংলাদেশ বা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এসব কাজে সাধারণত গুজব, অসত্য, অর্ধসত্য আর অতিরঞ্জিত তথ্য খুব কৌশলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এই কাজে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হতে পারে। একটি হচ্ছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক সংগঠন আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে গণমাধ্যম। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তাঁর সামনে দেশকে আবার এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড় করানো ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক কোটি ছিন্নমূল শরণার্থী দেশে ফিরছেন। দেশের ভেতর আছে আরো কয়েক লাখ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া উদ্বাস্তু। সব খাদ্যগুদাম খালি। ব্যাংকে নেই একটিও টাকা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের আগে সব ব্যাংকের ভোল্ট খুলে সব টাকাপয়সা হয় লুট করেছে অথবা কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়েছে। দেশের দুই প্রধান সমুদ্রবন্দর- চট্টগ্রাম ও মংলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী হাজার হাজার ভাসমান মাইন ফেলে সম্পূর্ণ অকেজো করে ফেলেছে। দেশের প্রধান দুটি রেল সেতু, হার্ডিঞ্জ আর ভৈরব সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, সঙ্গে বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় চার হাজার ছোট-বড় ব্রিজ-কালভার্ট। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর অকেজো। হাজার হাজার যুদ্ধ-ফেরত মুক্তিযোদ্ধার হাতে অস্ত্র। দেশের প্রশাসন চালানোর মতো কোনো অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আমলা নেই। রাস্তায় খালি পায়ে পুলিশ। সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মতো কোনো বাহিনী তখনো তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে যাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন এ দেশের পুলিশ আর সীমান্ত রক্ষীবাহিনী ইপিআর। সঙ্গে ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীতে বাঙালি সদস্যসংখ্যা ছিল খুবই কম এবং তাঁদের অনেকেই আবার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বাঙালির প্রধান খাদ্য চাল। কিন্তু সেই চালের রোপণ থেকে শুরু করে ধান গোলায় তুলতে সময় লাগবে কমপক্ষে তিন থেকে চার মাস। কিন্তু চাষির ক্ষেত চাষ করতে যে পরিমাণের অর্থ প্রয়োজন, তা-ও তার নেই। সেই সময় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া তিনটি রাজনৈতিক দল ক্রিয়াশীল ছিল- ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও কমিউনিস্ট পার্টি। আর আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি হিসেবে ছিল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ঙ্িস্ট-লেনিনিস্ট), ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে)। এই পার্টিগুলোতে আশ্রয় নিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকার-আল বদর। তাদের অনেকে আবার ভাসানী ন্যাপেও আশ্রয় পেল। জন্ম নিল সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি। তারা বাংলাদেশে গলাকাটা রাজনীতির প্রবর্তন করল। তারা আজ এই পাটের গুদামে আগুন লাগায় তো কাল অমুক ব্যাংক লুট করে। এই সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দুটি গোপন বেতারকেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে ভারত থেকে প্রকাশিত হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডে ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল খবর প্রকাশিত হলো। একটির নাম ‘বিদ্রোহী বাংলা রেডিও’ অন্যটি ‘স্বাধীন মুসলিম বাংলা রেডিও’। এসবের মধ্যে আবার একদল ফেরেববাজ রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগার বনে গেল। তাদের বলা হতো ষোড়শ বাহিনী। কারণ তাদের জন্ম ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল।

একদিকে দেশের দুটি প্রধান বন্দর অচল। তার ওপর দেশে ধান উৎপাদনে সময় লাগছে। যশোর অঞ্চলে ধানের ক্ষেতে পোকার আক্রমণে কয়েক শ একর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হলো। সারা দেশে দেখা দিল উপর্যুপরি বন্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পিএল-৪৮০-এর অধীনে খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দিল। অজুহাত হিসেবে তারা বলল, বাংলাদেশ তাদের শত্রু দেশ কিউবায় পাটের ব্যাগ বিক্রি করেছে। খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র এক চরম অমানবিক আচরণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে। ১৯৭৪ সালে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ১৯৭২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানীর পৃষ্ঠপোষকতায় আর সৈয়দ ইরফানুল বারীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো সাপ্তাহিক ‘হককথা’। যে মওলানা ভাসানীকে বঙ্গবন্ধু নিজের বাবার মতো শ্রদ্ধা করতেন, সেই মওলানা ভাসানী হয়ে গেলেন সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রধান সমালোচক এবং এই সমালোচনার অধিকাংশই ছিল অসত্য ও অর্ধসত্যের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত। অথচ মওলানা ভাসানী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সারা বিশ্বে দেখা দিল আরেক ভয়াবহ সংকট। আরব দেশগুলো তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তেলের মূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দেখা দেয় মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা। চালের মূল্য ৪০ টাকা মণ থেকে বেড়ে কোনো কোনো স্থানে ৮০ টাকা পর্যন্ত হয়ে যায়। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হলো ‘জয় বাংলার আরেক নাম ৮০ টাকা চালের দাম’ অথবা ‘জয় বাংলার আরেক নাম হরে কৃষ্ণ হরে রাম’। এর আগে মওলানা ভাসানীর ‘হককথা’ প্রচার করে, বাংলাদেশের সব সীমান্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এবং সে কারণে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার টন চাল ভারতে চোরাচালানের মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটি কেউ অস্বীকার করবে না যে শুধু চাল নয়, অনেক কিছুই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চোরাচালান অথবা গুদামজাত করেছে; তবে তা হাজার হাজার টন চাল ছিল না। কারণ ওই সময় বাংলাদেশ থেকে এই পরিমাণের চাল চোরাচালান করার মতো অবস্থা ছিল না। ১৯৭২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিলের নামে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার চেষ্টা করলেন। ১৯৭২ সালে মেজর জলিল, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে গঠিত হলো বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ। প্রথমে দলটির নাম ছিল এনএসপি। নামটি হিটলারের নাৎসি পার্টির সদৃশ হলে তা পাল্টে রাখা হয় জেএসডি। বেছে নিল চটকদার স্লোগান ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’। এই তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আসল প্রবক্তা ছিলেন তাত্ত্বিক নেতা, বাংলাদেশের রাজনীতির রহস্যপুরুষ সিরাজুল আলম খান, যিনি এখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র পরিত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন আর যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস পান ত্বরিত গতিতে দেশে ফেরেন। জাসদ আবার গণবাহিনী নামের একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যা ও বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত। এই এক জাসদই দেশের হাজার হাজার মেধাবী তরুণ আর যুবককে রাতারাতি পরিণত করে ভয়াবহ সন্ত্রাসী বাহিনীতে। প্রতিষ্ঠিত হয় দলের দৈনিক পত্রিকা ‘গণকণ্ঠ’, যার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ। ‘হককথা’ আর ‘গণকণ্ঠ’ ছড়াতে থাকে নানা ধরনের গুজব। যার মধ্যে ছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনী ভারতীয় সৈন্য দ্বারা গঠিত, শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতির গল্প আর মেজর ডালিমের স্ত্রী শেখ কামাল কর্তৃক অপহরণ। আসলে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করেছিলেন জাতীয় রক্ষীবাহিনী। কারণ তাদের বেশির ভাগেরই নিয়মিত বাহিনীতে যাওয়ার যোগ্যতা ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর রক্ষীবাহিনীকে কোনো স্ক্রিনিং ছাড়াই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জেনারেল জিয়া আত্তীকরণ করেন। শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে যে গল্পটি চালু করা হয় তা ছিল নিছক কল্পনাপ্রসূত। শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আজকের বিএনপি নেতা একসময়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি এ বিষয়ে একাধিকবার বলেছেন, সেই রাতে তাঁরা কয়েক বন্ধু মিলে একটি মাইক্রোবাসে দ্রুত গতিতে যাচ্ছিলেন মতিঝিলের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে। পুলিশ গাড়িটি থামাতে বললে তাঁরা দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং পুলিশ গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে শেখ কামাল আহত হন। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তাফার ছেলে, যিনি শেখ কামালের বন্ধু ছিলেন, তিনি মেজর ডালিমের স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করেন। এতে স্বাভাবিকভাবে মেজর ডালিম ক্ষুব্ধ হন এবং তিনি বঙ্গবন্ধুকে এর বিচার দেন। উল্লেখ্য, ডালিমের পরিবার বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন আর ডালিমের স্ত্রী শেখ রেহানার বান্ধবী ছিলেন। বহু দিন বেগম মুজিব ডালিম আর তাঁর স্ত্রীকে নিজে রান্না করে খাইয়েছেন। বঙ্গবন্ধু গাজী গোলাম মোস্তাফাকে ডেকে এ বিষয়ে কথা বলেন এবং তাঁর ছেলেকে শাসন করতে নির্দেশ দেন। এখানে শেখ কামালের কোনো ভূমিকাই ছিল না। কিন্তু এতে ডালিম শান্ত না হয়ে গাজী গোলাম মোস্তাফার বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাড়ি তছনছ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের শাসিয়ে আসেন। ডালিমের আচরণ সেনা সদর গুরুত্ব সহকারে নেয় এবং তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এসব ঘটনাকে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ আর ‘হককথা’ অতিরঞ্জিত করে বাজারে প্রচার করে। ঢাকা হয়ে ওঠে একটি গুজবের শহর।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রথার শাসনব্যবস্থা প্রচলন করেন, যে ব্যবস্থার অধীনে একাধিক রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে দেশে একটি রাজনৈতিক দল থাকবে এবং সেই দলে সবাই সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাকশাল করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য দলের নেতা-নেত্রীদের দেশ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করা, অনেকটা জাতীয় সরকারের একটি বিকল্প ব্যবস্থা। ইদানীং অনেকেই বাকশালের তুমুল সমালোচনা করেন; কিন্তু বাকশাল ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। এই ব্যবস্থা যথার্থ ছিল কি না তা যাচাই করার কোনো সুযোগ কখনো হয়নি। আর এসব বিষয়কে সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচার করা ভালো। প্রকাশ্যে যখন এসব কর্মকাণ্ড চলছিল, তখন পর্দার আড়ালে আরেক নাটকের মহড়া দেওয়া হচ্ছিল। ১৯৭৩ সালে কিসিঞ্জার মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব নিযুক্ত হন। এর আগে তিনি নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। পররাষ্ট্রসচিব হয়েই তিনি যেসব মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদের প্রত্যেককে এক ধাপ নিচে পদাবনতি করে দেন। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে বঙ্গবন্ধু যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত অসৌজন্যমূলকভাবে কিসিঞ্জার সে বৈঠক বর্জন করেন। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে কিসিঞ্জার সস্ত্রীক আট ঘণ্টার সফরে বাংলাদেশে আসেন। সফর শেষে তিনি তিন মিনিটের একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সাংবাদিকরা তাঁর কাছে তিন বছর আগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের জাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজ’ কেন বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়েছিলেন তা জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। হিচেন্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর কয়েক সপ্তাহ পর ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাছাই করা কয়েকজন মাঝারি পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন কর্নেল ফারুক আর লে. কর্নেল রশিদ। রশিদ ছিলেন মোশতাকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর লে. কর্নেল রশিদ লন্ডনের গ্রানাডা টেলিভিশনে প্রখ্যাত সাংবাদিক এন্থনি ম্যাসকেরানহাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, তিনি মার্চ মাসের ২৮ তারিখ জেনারেল জিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন এবং জিয়া তাঁকে বলেন, তাঁরা এগিয়ে যেতে পারেন, তবে সিনিয়র অফিসারদের এ কাজে সরাসরি জড়িত না করলে ভালো হয়। রশিদ মোশতাকের সঙ্গেও এ প্রসঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকারে কর্নেল ফারুক রহমানও একই রকম বক্তব্য দেন।

১৯৭৫ সালে ডেভিড ইউজিন বোস্টার ছিলেন ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত। হিচেন্স লিখেছেন, বোস্টার পরিকল্পিত অভ্যুত্থানের ব্যাপারে অবশ্যই জানতেন এবং তিনি তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তারা যে ফারুক-রশিদ গংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। বোস্টার আরো জানতেন তাঁর দপ্তরে কর্মরত সিআইএর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এ প্রসঙ্গে ফিলিপ চেরিকে আরেক মার্কিন সাংবাদিক লরেঞ্জ লিফসুলৎজ ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রশ্ন করলে তিনি প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, একটি দেশের দূতাবাসের সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি সম্পর্ক রাখতেই পারেন।

বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উৎখাত ও হত্যা করার জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি, মওলানা ভাসানীর ন্যাপ, জাসদ, হককথা, দৈনিক গণকণ্ঠ আর তাঁর আস্থাভাজন কিছু আমলা, যেমন মাহবুব উল আলম চাষী আর আবদুল মোমেন খান (তিনি বঙ্গবন্ধুর খাদ্যসচিব ছিলেন, বিএনপি নেতা ড. মইন খানের বাবা)। জিয়া ১৯৭৫ সালে আবদুল মোমেন খানকে তাঁর উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই দিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী মোশতাককে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। মওলানার অন্যতম সাগরেদ কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো পাকিস্তানের ভুট্টোর পিপলস পার্টির আদলে ১৯৭৩ সালে গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের দল ইউনাইটেড পিপলস পার্টি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর দিন তারা জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন এবং সেখানে কাজী জাফর বঙ্গবন্ধু হত্যাকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন (বাংলাদেশ অবজার্ভার, ৫ নভেম্বর)। তৈরি করা ক্ষেত্র ব্যবহার করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করেছিল এক দল সেনাসদস্য; আর তাদের নানাভাবে সহায়তা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; ঠিক যেমনভাবে চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিল পাকিস্তানের ভাবধারার রাজনীতি, যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জেনারেল জিয়া, যাঁকে বঙ্গবন্ধু পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। তাঁর জন্য সেনাবাহিনীতে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন উপসেনাপ্রধানের পদ। তাঁর ভাঙা ঘর জোড়া লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় দোষ ছিল, তিনি শত্রু-মিত্রের মধ্যে তফাত করতে পারতেন না বা করতে চাইতেন না। যে দোষটি সম্ভবত তাঁর কন্যার মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ যখন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনের সিঁড়িতে পরে আছে, তখন তাঁর দলের ২৫ জনকে নিয়ে মোশতাক তাঁর মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ-ও ঠিক, তাঁদের কেউ কেউ বন্দুকের নলের ভয়ে এই শপথ নিয়েছিলেন। তবে বেশির ভাগই স্বেচ্ছায় শপথ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দীর্ঘ ২১ বছর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। এই দীর্ঘ ২১ বছরে বাংলাদেশ শত বছর পিছিয়ে গেছে। এটি সত্য, জিয়া বা ভাসানী কেউ এখন বেঁচে নেই; কিন্তু তাঁদের উত্তরসূরিরা তো এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে এবং তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো শক্তিশালী আর সংগঠিত। সুধীসমাজের নামে তাদের মিত্র হয়েছে অনেক। হয়তো তারা সবার অগোচরে তাদের ১৫ আগস্টের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছে, আর বঙ্গবন্ধুকন্যা চেষ্টা করছেন তাঁর বাবার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে। তা-ও তিনি যে নির্বিঘ্নে করতে পারছেন, তা নয়। বাদ সাধছে অনেক সময় তাঁরই দলের কিছু অপরিণামদর্শী নেতা-কর্মী। ১৫ আগস্টের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

– কালের কণ্ঠ ।