শুক্রবার ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

সুন্দরবনে বারবার আগুন লাগার নেপথ্যে!

আপডেটঃ ৭:২২ অপরাহ্ণ | মে ২৬, ২০১৪

আলী আকবর টুটুল, বাগেরহাট : পূর্ব সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে গত এক যুগে ১৭টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু তারপর বনবিভাগের আর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। সর্বশেষ ২১মে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বাইশেরছিলা এলাকায় গহিন বনে আগুন লাগে। তিন দিনের আগুনে পুড়ে গেছে প্রায় ১০ একর বনভূমি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একের পর এক আগুন লাগছে এই বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের মরাভোলা ও ভোলা নদীর পার্শ্ববর্তী বনের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়। কারণ, এই এলাকা মিঠা পানির কৈ, শিং ও মাগুর মাছের ভাণ্ডার হিসাবে খ্যাত। অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে এসব কথা। তাতে বলা হয়, মাছ ধরা এবং বহন সহজ করতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে যাতায়াতের পথ তৈরি করেন একশ্রেণির জেলে।

তদন্ত রিপোর্টে জেলে ও বনজীবীদের দায়ী করা হলেও তাদের চিহ্নিত করা বা জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নজির নেই। তবে বনজীবী ও সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে আরো কিছু তথ্য। তারা জানান, সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনায় জেলে ও বনজীবীরা অনেকক্ষেত্রে দায়ী। অনেক সময় কাঠ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্য প্রাণী পাচারকারীদের চলাচলের সুবিধার্থে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে পরিকল্পিতভাবে সুন্দরবনে আগুন লাগানো হয়।

তবে বন কর্মকর্তাদের অনেকেরই ধারণা, সুন্দরবনের মাটির নিচে থাকা গ্যাস কখনো কখনো অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটায়।

আগুন লাগার ঘটনা ঘটলেও তা মোকাবেলায় বন বিভাগের নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক জলযান।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের ২২ মার্চ সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে কটকা অভয়ারণ্যে প্রথম অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পুড়ে যায় প্রায় এক একর বনভূমি। এরপর ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ  চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী ক্যাম্পের মাদ্রাসারছিলা এলাকার তিন একর বন পুড়ে যায়। একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর আড়ুয়াবেড় এলাকায় আগুনে পুড়ে যায় প্রায় নয় একর ছনের বন। ২০০৫ সালের ৮ এপ্রিল ধানসাগর স্টেশনের অধীন কদলতেজী এলাকায় পুড়ে যায় আড়াই একর বন। এর পাঁচদিন পর একই রেঞ্জের তুলাতলা এলাকায় পুড়ে যায় সাড়ে ৪ একর বন। এর পরের বছর ১৯ মার্চ শরণখোলা রেঞ্জের তেরাবেকা এলাকায় পুড়ে যায় প্রায় এক একর বনভূমি। ২০০৬ সালের ১১ এপ্রিল চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া টহল ফাঁড়ি এলাকায় পুড়ে যায় প্রায় ৫০ শতক বন। এর একদিন পর কলমতেজির টহল ফাঁড়ির খুটাবাড়িয়া এলাকার দেড় একর, ১ মে নাংলীর পচাকুড়ালিয়া এলাকার ৫০ শতক, এর ৩ দিন পর ধানসাগর স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে আড়াই একর বনভূমি পুড়ে যায়।

২০০৭ সালে সুন্দরবনে তিনটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ১৫ জানুয়ারি শরণখোলার ডুমুরিয়া ক্যাম্প এলাকায় ৫ একর, ১৯ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী এলাকার ২ একর ও ২৮ মার্চ একই এলাকায় ৮ একর বন পুড়ে যায়। ২০১০ সালের ২০ মার্চ ধানসাগর স্টেশনের গুলিশাখালী এলাকায় প্রায় ৫ একর বন পুড়ে যায়। এর পরের বছর ২০১১ সালের মার্চ মাসে দুই দফা অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ১ মার্চ নাংলী এলাকার ২ একর ও ৮ মার্চ একই এলাকার ২৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টে টানা তিন দিনের অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সাড়ে ৩ একর বন পুড়ে যায়। সর্বশেষ গত বুধবার থেকে টানা তিন দিনের অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় প্রায় ১০ একর বনভূমি।

এসব অগ্নিকাণ্ডে কোটি কোটি টাকার সুন্দরী, বাইন, আমুর, গেওয়া ও বলাসহ বনজ সম্পদের ক্ষতি হয়।

এসব অগ্নিকাণ্ড নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের অভিযোগ। কেউ বা বনজীবীদের দায়ী করছে। আবার কেউ কেউ বনরক্ষীদের। কখনো আবার মৌয়ালদের দায়ী করা হয়। তবে যে কারণেই সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটুক না কেন তার সুষ্ঠু তদন্ত, অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি তোলেন প্রাকৃতির দুর্যোগের সময় মানব ঢাল হিসেবে রক্ষা পাওয়া সুন্দরবন উপকূলের মানুষ।

এ বিষয়ে সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা এ বনের ওপর নির্ভরশীল। তবে কখনোই তাদের জীবন-জীবিকার ওপর তারা আঘাত করেন না। সুন্দরবনের অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডে কোনো না কোনোভাবে বন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়ী। ২০০২ সাল থেকে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রমাণ হয়, এর সঙ্গে তারাই (বন কর্মকর্তা-কর্মচারী) জড়িত।’

তিনি এই ম্যানগ্রোভ বন ও বন্য প্রাণীকে আগুনের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে সুন্দরবনে অগ্নিনির্বাপক জলযানসহ লজিস্টিক সাপোর্টের দাবি জানান। পুনরায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য আগে থেকেই বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কমিটি গঠনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) আমীর হোসাইন চৌধুরী অগ্নিকাণ্ডে বন বিভাগের লোকজনের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার সময় এই প্রথম অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর আগে যেসব অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে সেগুলোর বিষয়ে কী ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা নেই। অগ্নিনির্বাপক জলযান না থাকায় এখন পানির পাম্প চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করা হয়েছে।’