বৃহস্পতিবার ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ ইং ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

ব্যাচেলররা যাবে কোথায়?

আপডেটঃ ১০:১২ পূর্বাহ্ণ | আগস্ট ১৩, ২০১৬

রাজীব হাসান তপু,চ্যানেল সেভেন বিডি,ঢাকাঃ আমরা ‘ব্যাচেলর’ বলি যারা এখনও বিয়ে করতে পারেনি কিংবা বিয়ের অপেক্ষায় আছে, সে ধরনের নারী ও পুরুষদের। ছাত্রজীবন শেষ করে যারা চাকরি কিংবা অন্য কোন কাজের অপেক্ষা করছে তাদেরও আমরা ব্যাচেলর বলছি। ব্যাচেলররা সমাজের বিরাট এক শক্তি। তারা কিন্তু নিবেদিতপ্রাণ।

উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে,কেন কথাটি বললাম?

কোন আত্মীয় কিংবা পাড়া প্রতিবেশির কিছু হলে কিংবা দুর্ঘটনা ঘটলে দেখা যায় এই ব্যাচেলররাই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের যেহেতু নিজস্ব সংসার নেই তাই তাদের চিন্তা এখনও আত্মকেন্দ্রিক হয়নি বলে তারা সমাজের জন্য অনেক কিছু করে এবং করতে প্রস্তুত। অনেক বেসরকারী সংস্থা, বিদেশি সংস্থা ব্যাচেলরদের বিবাহিতদের চেয়ে বেশি পছন্দ করে। কারণ তারা কাজে বেশি মনোযোগী থাকে। তাদের বাসায় যাওয়ার তাড়া থাকে না। এখন প্রশ্ন হলো, ব্যাচেলর ও ঢাকা সিটির মধ্যে সম্পর্কটা কি?

আমরা দেশের সবকিছুই কেন্দ্রীভূত করে ফেলেছি এবং করে যাচিছ অনেক উৎসাহের সাথে। সবকিছু ঢাকায়- ভাল চাকরি, ভাল চিকিৎসা, ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশের যাওয়ার খোঁজ-খবর, বড় বড় অফিস, ব্যবসা বাণিজ্য সব ঢাকায়। আপনি বিদেশ যাবেন তা বরিশালে, খুলনায় বা রাজশাহীতে বসে হবে না। ঢাকায় আসতে হবে। আমরা ঢাকায় সবকিছু কতটা কেন্দ্রীভূত করেছি তার প্রমাণ আমরা সব সময় প্রত্যক্ষ করছি। আর একটি বড় প্রমাণ দেখে আশ্চর্য হলাম। জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো ঢাকায়। প্রতিবছর ঢাকাতেই হয়। প্রতি বছর পালাক্রমে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠানটি হতে পারতো, কিন্তু না ঢাকাতেই হতে হবে। তার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছি, জেলা প্রশাসকগণ তাদের পরিবার রাখেন ঢাকায়।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকদের দাপট হয়তো আগের মতো নেই কিন্তু তাদের সুযোগ সুবিধা এবং অন্যান্য বিষয়াদির ক্ষেত্রে পরিবর্তন তেমন হয়নি। অর্থাৎ জেলা প্রশাসক এখনও বলতে গেলে ‘জেলার রাজা’। একজন জেলা প্রশাসকের সন্তান অবশ্যই জেলার সবচেয়ে ভাল প্রতিষ্ঠানে সুন্দরভাবে এবং সবার বিশেষ দৃষ্টি নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে, তারপরও তাদের সন্তানদের তারা ঢাকায় রেখে পড়ান। প্রধানমন্ত্রী অনেকবার নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে তারা জেলায় পরিবার নিয়ে থাকেন কিন্তু সঠিকভাব তা পালিত হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তার অবস্থা যদি এমন হয়, তা হলে সহজেই বলে দেওয়া যায় যে, যে কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ, ব্যাচেলর কেন ঢাকায় আসবে না?

কিন্তু কথা হলো, ঢাকায় এসে তারা থাকবেন কোথায়? এদের মধ্যে অনেকেরই আত্মীয়স্বজনের বাসা ঢাকায় আছে। তার অর্থ এই নয় যে, সেসব বাসায় তারা থাকবেন। মানুষ স্বাধীনচেতা। আর শিক্ষিত তরুণরা তো আরও স্বাধীনচেতা। তারা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় থাকতে চাইবে না; থাকে না ব্যতিক্রম ছাড়া। তাদের থাকার একমাত্র নির্ভরযোগ্য জায়গা হচ্ছে মেসবাড়ি। কয়েকজন ব্যাচেলর একত্রে মিলে একটি ফ্লাট ভাড়া নিয়ে তারা মেস করে থাকেন, পড়াশোনা করেন, প্রাইভেট পড়ান, চাকরি খোঁজেন, আবার অনেক নতুন চাকরিজীবি তাদের অনেকের পরিবার আছে, অনেকের নেই তারাও মেসেইে থাকেন। তারা বিবাহিত হলেও ব্যাচেলর। কিন্তু বাড়ির মালিকরা সহজে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিতে চান না। তারা মনে করেন ব্যাচেলররা আাশেপাশের মেয়েদের সাথে আড্ডা মারবে, কিংবা অন্য কোন ধরনের খারাপ বা অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হবে। ব্যাপারটি অমূলক। তাই অনেক ব্যাচেলর গ্রামের কোন আত্মীয়াকে বা আত্মীয়াদের নিয়ে এসে প্রথম কয়েকদিন রেখে বাড়িওয়ালাদের বুঝিয়ে থাকেন যে তারা ব্যাচেলর নয়। এভাবে ছলছাতুরী করে বাসা ভাড়া নিতে হয়।

আমরা অযথা এমন কিছু পরিস্থিতির সৃষ্টি করি যার কোন মানে হয় না। এর সাথে যোগ হয়েছে ঢাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি জঙ্গি ঘটনা। নাচনে বুড়ী ঢোলের বাড়ি পেয়ে তো আরও নাচতে শুরু করবে- এটিই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। এখন আর ব্যাচেলরদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাচ্ছেন না। যদিও ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, এমন কোন নির্দেশনা নেই যে, ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেয়া যাবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা? বাড়িওয়ালারা অযথা ঝামেলা বাড়াতে চান না। কিন্তু আমার প্রশ্ন, এত হাজার হাজার শিক্ষিত ব্যাচেলর যাবেন কোথায়? বিষয়টি বাড়িওয়ালা, পুলিশ বিভাগ, সরকার সবাইকে নমনীয়ভাবে দেখতে হবে।

পুলিশ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, বাড়িওয়ালাদের সব তথ্য রেখে বাড়ি ভাড়া দিতে হবে। তথ্য না নিয়ে যারা বাড়ি ভাড়া দিয়েছিলেন তাদের কাউকে সঙ্গত কারণে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাহলে বাড়িওয়ালাদেরই বা দোষ দেই কী করে? বাড়ি ভাড়া দিয়ে যদি অ্যারেস্ট হতে হয় তাহলে ভাড়া না দেয়াই ভাল। ভাড়াটিয়ারা কী করেন, না করেন তার তথ্য রাখতে হবে। এখানেও দু’একটি বিষয় আমাদের বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি না করে ঢাকায় নিজ খরচে বাড়ি বানানো বেশ কঠিন। এ ধরনের দুই-চারটি পেশার মানুষ হয়তো নিজেদের টাকায় বাড়ি করতে পারেন। বাকীদের ক্ষেত্রে কী হয়? বহু কষ্টে, বহু স্যাক্রিফাইসের বিনিময়ে তারা একটি বাড়ি বা একটি ফ্লাটের বায়না দেন। এটি তাদের সারাজীবনের স্বপ্ন। তারপর ধীরে ধীরে অর্থ শোধ করেন ভাড়ার টাকা দিয়ে, বেতনের টাকা দিয়ে। তারা একমাস বাড়ি ভাড়া দিতে না পারলে অনেক অর্থকষ্টে ভোগেন। তাই ভাড়াটিয়া মোটামুটি পেলেই তারা ভাড়া দিয়ে দেন। তারা একেবারে দেখেশুনে ভাড়া দেন না তা নয়। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছে করে বাড়িওয়ালার কাছে ভুল তথ্য পরিবেশন করে তা হলে তাদের কী করার আছে?

নিয়ম হলো বাড়িওয়ালাকে ভাড়াটিয়াদের তথ্য নিয়ে থানায় জমা দিতে হবে! ‘থানা’ এবং ‘পুলিশ’ এই দুটি শব্দ এদেশের মানুষের কাছে ভীতিকর বা তিক্ত অভিজ্ঞতার। কাজেই অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের তথ্য রাখা এবং থানায় গিয়ে জমা দেয়ার কাজটি হয়তো করেন নি (এখন থেকে অবশ্যই তা করতে হবে)। তাই বলে তথ্য না নিয়ে ভাড়া দিলেই যে, তিনি দোষী হয়ে যাবেন- এ বিষয়টি আরেকবার ভাবার দরকার আছে বলে মনে করি।

তবে এটিও সত্য, দেশ যে ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করছে, কয়েকজন জঙ্গির কারণে এবং এসব জঙ্গিরা ভাড়া বাড়িতেই ছিল। সেদিক থেকে সরকারের পদক্ষেপ ঠিক আছে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য। কিন্তু ব্যাচেলরদের যাতে বাসা ভাড়া দেওয়া হয় সেই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের খোলাসা করে বলতে হবে। তা না হলে বিরাট এক জনগোষ্ঠী মহা বিপদের মধ্যে পড়বে। এটি আমাদের এক ধররেন ট্রাডিশন যে, ব্যাচেলররা ঢাকায় থাকবে, কাজ খুঁজবে। কাজ না পেলে তার এবং দেশের উন্নতি হবে কী করে?

জঙ্গি হামালা এড়ানোর জন্য এবং জঙ্গিপনা নির্মূল করার জন্য সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সঠিক শিক্ষাদান হচ্ছে কি না বিষয়টি খেয়াল রাখা এবং সেদিকে গোয়েন্দা নজরদারী বাড়ানো। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, গোড়ায় দৃষ্টি দিতে হবে। তবেই দেশের মঙ্গল।

বাড়ীওয়ালাদের উদ্দেশ্যে ঃ

বাড়ীওয়ালারা যদি ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তবে তারা নিজেরাও নানান ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে ।

বাসায় কোন প্রকার ঝামেলা হলে তার জন্য বাড়ীওয়ালা ও দায় বদ্ধ থাকে তাই সচেতন থাকুন।