শুক্রবার ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

‘নজরুল হত্যার সাথে শামীম ওসমানই জড়িত

আপডেটঃ ৭:২৭ অপরাহ্ণ | মে ২৬, ২০১৪

 ডেস্ক,ঢাকা- নজরুল হত্যা মামলার গভীরে পৌঁছানোর জন্য শামীম ওসমানকে গ্রেফতারই একমাত্র পথ বলে মনে করেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ- আওয়ামী লীগ দলীয় এই সংসদ সদস্য নারায়ণগঞ্জ প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যার সমস্ত পরিকল্পনা আগে থেকেই জানতেন। তাদের ভাষ্য-শামীম ওসমানকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে।

গত ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে যে সাত ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয় তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন নজরুল। অপহৃতদের কেউই আর পরে জীবিত ফেরত আসেননি।

নজরুলের ভাই আব্দুস সালাম বলেন, “কে এই হত্যাকাণ্ডের মূল চক্রান্তকারী তা মানুষ এখন জানে বলেই আমি বিশ্বাস করি। যেহেতু ফোনে কথোপকথনের রেকর্ডটি সামনে আসার পর বোঝা যাচ্ছে সম্ভবত তিনিই নূর হোসেনকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন, তাই মামলার মীমাংসায় প্রয়োজনে শামীম ওসমানকে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। শামীমের গ্রেফতার ও শাস্তি চেয়ে খুব শিগগিরই তারা একটি আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।”

গত ২৯ এপ্রিলের কথোপকথনের ওই ফাঁস হওয়া রেকর্ডটি থেকে জানা যায়, নজরুলের পরম শত্রু এবং মামলার মূল অভিযুক্ত আসামি নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের কাছে সাহায্য চেয়েছেন এবং তাকে সাহায্য করার আশ্বাস দিয়ে শামীম বলেন, “এটা কোনো সমস্যাই না।” কথোপকথনের বিষয়টি স্বীকার করলেও শামীমের দাবি- কথোপকথনটি আংশিক প্রকাশ করা হয়েছে।

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে নিহতদের পরিবারের এক সদস্য জানান, এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কারণ সম্ভবত নজরুলকে পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যই নূর হোসেনের মতো অপরাধীকে তৈরি করেছিলেন শামীম ওসমান। নূর হোসেনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন তিনি।

প্রাণনাশের আশংকায় বারবার শামীমের কাছে সাহায্য চাইলেও তিনি নজরুলের জন্য কিছুই করেননি বলেই তাকে হত্যা করতে পেরেছেন নূর- এমনটাই বললেন নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। তারা বলেন, “শামীমের মত ছাড়া নজরুলের গায়ে আছড় লাগানোর সাধ্যও কারো ছিল না।”

শামীম নিজেও দাবি করেন, তার অজ্ঞাতসারে তারই এলাকায় কিছুই ঘটে না। ফোন কথোপকথনটি ফাঁস হওয়ার পর এই প্রসঙ্গে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শামীম বলেন, “আমার এলাকায় যদি একটা নেড়ি কুকুরও ঢোকে তাও আমি আপনাদের বলে দিতে পারব।”

গত ফেব্রুয়ারিতে নূর হোসেন প্রকাশ্যে নজরুলকে হত্যা করার হুমকি দেয়ার পরেও শামীম ওসমানের পরামর্শেই নজরুল ঢাকায় বসবাস করছিলেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে শামীমের বক্তব্য অনুযায়ী- অপহরণের ঘটনা ঘটার আগের রাতে তিনিই নজরুলকে বলেছিলেন: “আদালতে গিয়ে জামিন নাও।”

নজরুল এই ‘উপদেশ’ গ্রহণ করেছিলেন। তাকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল ২৭ এপ্রিল দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে, যখন তিনি জেলা আদালত চত্বর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন।

গত ১৮ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘এরকম একজন অনুগত অনুসারী’র জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হওয়ায় আফসোস করেন শামীম ওসমান। তিনি নজরুলকে বলেছিলেন: “এই ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো না। আমি তোমাকে বাঁচাতে পারবো না।” নিহত নজরুলের আত্মীয়স্বজন এবং রাজনৈতিক সহযোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী- বেশ কিছু কারণে প্রভাবশালী আওয়ামী নেতা নারায়ণগঞ্জের অপরাধের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে কুখ্যাত শামীম ওসমানের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন নজরুল।

গত বছরের শেষের দিকে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুলকে তার ওয়ার্ডের আওতাধীন একটি সড়ক প্রশস্তকরণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। বিজয় দিবসে আইভীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমাবেশেও অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। শামীম ওসমান তার ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী আইভীর সঙ্গে নজরুলের এই ঘনিষ্ঠতা পছন্দ করেননি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী শামীমকে এক লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছিলেন আইভী। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইকবাল হোসেনকে পরাজিত করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন নজরুল ইসলামও। এই ইকবালও চাঞ্চল্যকর সাত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত আসামি।

স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি ক্যাডার হলেও ইকবালের পেছনে ছায়া ছিল শামীমেরই। অবশ্য শামীম একথা অস্বীকার করেছেন। স্কুলছাত্র তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আজমেরি ওসমানকে গ্রেফতারের দাবিতে জনসাধারণের আয়োজিত একটি সমাবেশেও অংশগ্রহণ করেছিলেন নজরুল। এই আজমেরি ওসমান সম্পর্কে শামীম ওসমানের ভাতিজা হন।

এদিকে, সামরিক স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের শাসনামল থেকেই পারস্পরিক শত্রুতার সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো নজরুল ও নূর হোসেনের মধ্যে দিনকে দিন তিক্ততা বাড়ছিল সড়ক সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্রের কাজ পাওয়াকে কেন্দ্র করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ্ববর্তী মিজমিজ এলাকার মধ্যে একটি সংযোগ সড়ক প্রশস্ত করার জন্য রাস্তার দু’ধারে অবস্থিত দোকানগুলোর একাংশ সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন নজরুল। কিন্তু দোকানগুলো ছিল নূর হোসেনের এক নিকটাত্মীয়ের, ফলে দোকান ভাঙার কঠোর বিরোধিতা করেন নূর। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই গত ২ ফেব্রুয়ারি নজরুলকে হত্যার হুমকি দেন নূর। আর এই সমস্ত কিছু জানতেন শামীম।

নজরুলের স্ত্রী সেলনা ইসলাম বিউটি বলেন, “প্রাণনাশের এই হুমকি সম্পর্কে শামীম ওসমানকে জানিয়েছিলেন নজরুল।” স্বামী নজরুলের মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামীর লাশের পাশে কান্নারত সেলিনা বলেছিলেন, “মৃত্যু তোমাকেও ছাড়বে না শামীম ওসমান! সেটা কি একবারও মনে হয় না?”

নূর হোসেন যে র‍্যাবের কয়েকজন সদস্য এবং কিছু পেশাদার খুনি ভাড়া করে নজরুলকে হত্যা করার চেষ্টা করছিল- এ সম্পর্কেও শামীমকে জানিয়েছিলেন নজরুল।

অপহরণের ঘটনার পর সাংবাদিকদের শামীম বলেছিলেন, “নূর হোসেন এমন কোনো কাজ করতে পারেন বলে আমি বিশ্বাস করি না।”

সংসদ সদস্য শামীম ওসমান যে ব্যক্তির ওপর এত আস্থা রেখে একথা বলেছিলেন, সেই ব্যক্তি ১৫টি ফৌজদারি মামলা এবং চারটি দুর্নীতির মামলায় অপরাধী হিসেবে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। ২০০১ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ছয় বছর পর নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পলাতক নূর হোসেন ২০০৮ সালের শেষ অবধি প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবস্থান করেছিলেন।

বর্তমান ক্ষমতাসীন দল শামীম ওসমানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর শামীম নিজেও দেশে ছেড়ে পালিয়ে ভারতে চলে যান এবং সেখান থেকে কানাডা চলে যান। এরপর ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ফিরে এলেও তার পরের বছরেই ১/১১’র ঘটনায় ক্ষমতার রদবদলের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সামরিক সরকার ক্ষমতাগ্রহণ করলে আবারো তিনি দেশত্যাগ করেন। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে শামীম ও নূর দুজনেই দেশে ফিরে আসেন।

আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, “শামীম যে শুধু ২২০৯ সালে নূর হোসেনের নিরাপদে দেশে ফেরাই নিশ্চিত করেছিলেন তাই নয়, বরং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হতেও নূরকে সাহায্য করেছিলেন। এর মাধ্যমে স্থানীয়রা পরিষ্কার বুঝে গিয়েছিলেন যে, শামীমেরই লোক ছিলেন নূর হোসেন।”

নারায়ণগঞ্জ শহরে এখনো নূর হোসেনের ছবি সম্বলিত সে সময়ের নির্বাচনী পোস্টার দেখতে পাওয়া যায় যেখানে শামীমের শক্তি আরো বৃদ্ধির জন্য ভোট চেয়ে জনগণকে অনুরোধ করেছিলেন নূর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় যুবলীগ নেতা বলেন, “ভাই (শামীম) দিন দিন নূর হোসেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিলেন।”

নারায়ণগঞ্জের একজন মানবাধিকার কর্মী বলেন, “সাত খুনের রহস্য উদ্ধার করতে হলে আপনি ধাঁধাঁর ভাঙা অংশগুলো জোড়া লাগান, তাহলেই পুরো দৃশ্যটি আপনার সামনে স্পষ্ট ফুটে উঠবে।” সূত্র: ডেইলি স্টার।