রবিবার ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ ইং ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

আপডেটঃ ৩:০২ অপরাহ্ণ | আগস্ট ২৫, ২০১৬

চ্যানেল সেভেন বিডি: দুই দফা বর্ষণে যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার ভবদহ এলাকার দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে আরও অন্তত আড়াই শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ নেই ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

পানিবন্দি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জোড়াতালি দিয়ে চলছে শিক্ষাকার্যক্রম। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি হওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে পাঠাতে নিরুৎসাহিত করছেন অভিভাবকরা। এজন্য ক্লাসে ছেলে-মেয়েদের উপস্থিতি হার কমে গেছে। তবুও সমাপনী ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখা হয়েছে।

শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার অন্তত সাড়ে চার শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। এরমধ্যে কেশবপুর উপজেলার ২২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ১১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এই ১৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৫ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। মণিরামপুরে দেড় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অভয়নগর উপজেলার প্রায় ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে অন্তত ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পানিবন্দি হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা আসছে না। অনেকে আবার পানির সঙ্গে পরিবার নিয়ে জীবন যুদ্ধে নেমেছে।

পানিবন্দি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা জেলা শিক্ষা অফিস থেকে জেলা প্রশাসক, শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।

অভয়নগর উপজেলার সিংগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এসএম ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, তার গ্রামে বুইকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। টানা বর্ষণের ফলে মাঠে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ছেলে-মেয়েরা ক্লাসে আসতে পারছে না। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কেশবপুর উপজেলার হাবাসপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কার্তিক চন্দ্র সাহা বলেন, ‘স্কুল মাঠে হাঁটুজল। পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে স্কুল। তারপরও পঞ্চম শ্রেণির সমাপনীর প্রস্তুতির ক্লাস নেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু শিক্ষার্থীরা না আসায় তা বন্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নেই।’

তিনি বলেন, ‘চাকরির জন্য পানি ভেঙে তাদেরকে কষ্ট করে প্রতিদিন নিদিষ্ট সময়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। কিন্তু তাও অনেক শিক্ষক ঠিকমত আসতে পারছে না।’

কেশবপুরের মূলগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাপস রায় বলেন, ‘তার স্কুল মাঠে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধ পরিবারের ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত স্কুলে আসছে না। এলাকার জলাবদ্ধ ৫-৭টি পরিবার স্কুল ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। এতে স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে পানি সরে গেলে আবার ঠিকমত ক্লাস চালু হবে। সামনে যেহেতু সমাপনী পরীক্ষা রয়েছে সেহেতু তাদের সিলেবাস শেষ করতে হবে।’
Jessore

কথা হয় রাস্তার উপর আশ্রয় নেওয়া মূলগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজিব হাসানের সাথে। সে জানায়, তাদের বাড়িতে পানি ঢুকে সব তলিয়ে গেছে। যে কারণে তারা রাস্তায় ঘর বানিয়ে বসবাস করছে। পানিতে বই খাতাসহ ভিজে গেছে। যে কারণে পড়তে পারছে না। স্কুলও পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি চলে গেলে সে আবার স্কুলে যাবে বলে জানায়।

কেশবপুর ও মণিরামপুর সীমান্তে কালীচরণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুদীপ্ত বিশ্বাস জানান, ভবদহের পানির কারণে তার স্কুল এখন পানিবন্দি। কোমলমতি শিশুরা স্কুলে আসতে পারছে না। যে কারণে স্কুলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভবদহের এ দুঃখ সারা জীবনের। এখানকার ছেলে-মেয়েরা একরকম লড়াই করে বছরের পর বছর বেঁচে আছে।’

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর গোস্বামীর কাছে ভবদহ এলাকায় দ্রুত পানি অপসারণের জন্য কি কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ভদ্রা, হরিহর, শ্রী, টেকা আপার ভদ্রা ও বুড়ি ভদ্রার পানি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নদীতে পলি পড়ে জমাট বেঁধে গেছে। পলি অপসারণ করা হলে দ্রুত পানি নেমে যাবে। পলি অপসারণের জন্য ভাসমান ড্রেজার মেশিন বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই ড্রেজিং এর কাজ শুরু হবে। তখন দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’

মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আকরাম হোসেন খান বলেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে পানি উঠেছে সেখানে ক্লাস হচ্ছে না। ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা সাময়িক ক্লাস বন্ধ করে দিয়েছে। পানি নেমে গেলেই সেখানে ক্লাস শুরু হবে।’

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাপস কুমার অধিকারী বলেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ নেই। তাই পাঠদান হচ্ছে না। তবে দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে। জলাবদ্ধতার কারণে এখনও কোন প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে অধিদপ্তরে তালিকা পাঠিয়েছি। বরাদ্দ পেলেই যথা সময়ে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

যশোরের জেলা শিক্ষা অফিসার আমিনুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বসে স্থানীয়ভাবে বন্ধ রাখছে। ওই সব বিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’

যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘বন্যায় শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে আমি বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস নেব। আমি যত দিন আছি তত দিন শিক্ষার্থীদের কোন ক্ষতি হতে দেব না।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি এ জেলায় যোগদানের পর বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি। ক্লাস নিয়েছি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। প্রয়োজনে আগামী তিন মাস যখনই সময় পাবো তখনই স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে সময় কাটাবো। আমি কোন শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার ক্ষতি হতে দেব না। আমরা চেষ্টা করছি খুুব দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের।