বুধবার ২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

ভারতে পরিবর্তন: আ.লীগ বিএনপির লাভ-ক্ষতি

আপডেটঃ ১১:৩২ অপরাহ্ণ | মে ২৭, ২০১৪

ডেস্ক রিপোর্ট: ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশে সরকার বিরোধী সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ভারতের নির্বাচনের ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। বিএনপি মনে করে কংগ্রেসের পতনের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কংগ্রেস এতোদিন নগ্নভাবে যে হস্তক্ষেপ করেছে তা বন্ধ হবে। ভারতের নতুন সরকার তার দেশের সাধারণ জনগণের আস্থার ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কারণ, ভারত অন্য কোন দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খার বিরুদ্ধে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করুক সাধারণ জনগণ তা চায় না। অপরদিকে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার কংগ্রেসের চরম পতনের কারণে হতাশায় ভুগছে। সরকার এ হতাশা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের কাছে এখনো ইতিবাচক কোনো সাড়া নেই। ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আগ্রহের কথা জানানো হলেও ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী’র নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করতে কতটা আগ্রহ দেখাবে তা এখন দেখার বিষয়। আওয়ামী লীগের নেতারা যদিও বিভিন্ন সভা-সেমিনারে জোর গলায়ই বলে আসছেন যে, ভারতে সরকারের পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো অবনতি হবে না।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে এ আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে যে, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ইচ্ছার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে শেখ হাসিনাকে আবারো ক্ষমতায় বসানোর জন্য সোনিয়া গান্ধীর নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, ভারতের নতুন সরকার শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে সে ধরনের প্রচেষ্টা চালাবে না। আর এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। তা হচ্ছে বিজেপি বাংলাদেশের বিশেষ কোনো দলের প্রতি এতো বেশি নির্ভর করে না, যেভাবে কংগ্রেস আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করেছিল। তাছাড়া কংগ্রেস ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশ নীতি উভয় ক্ষেত্রেই যে পুরোপুরি ভুল পথে হাঁটছিলো এটা সে দেশের মানুষই নেগেটিভ ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে। কাজেই বিজেপি কংগ্রেসের সেই ভুল পথে হাঁটবে না। আর আওয়ামী লীগের উদ্বেগের মূল কারণ এখানেই। ভারতের ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা একটি দল বাংলাদেশের ভোটারবিহীন নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা দখল করে থাকা সরকারের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করবে তা নিয়েই বেশি আশঙ্কায় রয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। নির্বাচনের ফলাফলের পর নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যে পত্র পাঠানো হয়েছে তা নিয়েও ইতোমধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অবশ্য মোদী সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিশেষ কোনো সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা যে নেই তা আর কেউ জানুক বা না জানুক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিকই তা বুঝতে পারছেন। কারণ, ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময় ও নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করার পর পর এ কয়েকদিনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিজেপি’র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের যে চেষ্টা করা হয়েছে তাতে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলেও আওয়ামী লীগের সূত্রে জানা গেছে। গত ১৬ মে নির্বাচনের ফলাফলের পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য স্পষ্ট করেই বলেছেন, আওয়ামী লীগ কংগ্রেসের সঙ্গেই কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আওয়ামী লীগের এ প্রবীণ নেতার বক্তব্য থেকেই একটি প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, আওয়ামী লীগ যদি কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তাহলে বিজেপি কী আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে?

অপরদিকে বিএনপি-বিজেপি’র মধ্যে দীর্ঘ গভীর সম্পর্কের যে গুঞ্জন এতোদিন শোনা যেত তা গত কয়েকদিনের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকগণের আলোচনার মাধ্যমে ক্রমেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে বিজেপি’র বিজয় আওয়ামী লীগ সরকারকে চরম বেকায়দায়ই ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ।

উদ্বিগ্ন সরকার

গত ১৬ মে ভারতের লোকসভার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়। নিরঙ্কুশ জয় পায় বিজেপি। অবশ্য বিজেপি জয়লাভ করতে পারে এমন ধারণা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোও অনুমান করতে পারছিল আগাম। কিন্তু বিজেপি এতো বেশি আসন পাবে এমন ধারণা কারো হয়তো ছিল না। কংগ্রেসের এতো বেশি ভরাডুবি হবে তাও অনেকের ভাবনায় আসেনি। কংগ্রেসের এ চরম ভরাডুবির কারণে দলের কর্ণধার সোনিয়া গান্ধী ও সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীর সাংগঠনিক ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতাকে দায়ী করা হচ্ছে ভারতে। ইতোমধ্যে মা-ছেলের পদত্যাগের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছিলো, যদিও তা শেষ পর্যন্ত ঠেকে গেছে। কিন্তু ভারতের রাজনীতিতে যে গান্ধী পরিবারের প্রভাব এ মুহূর্তে মারাত্মকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে এটা আর ঘটা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এসবই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক ছিল তা ছিল ভারতের প্রভাবশালী একটি পরিবারের সঙ্গে। আর একটি পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক দিয়ে একটি দেশ পরিচালনা করা যায় না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে মূলত গান্ধী পরিবারের সুসম্পর্ক। এ কারণে ভারতে সোনিয়া পরিবার বা তাদের দল কংগ্রেস কোনো সমস্যায় পড়লে আওয়ামী লীগও এটি নিয়ে হতাশা অনুভব করে। বিশেষ করে গত ১৬ মে‘র পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োজিত কিছু কর্মকর্তা বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের পক্ষ থেকে বিজেপির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইতোমধ্যে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু কোনো তৎপরতাই খুব একটা কাজে আসছে না বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, কংগ্রেস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের নেতারা কংগ্রেসের সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। কংগ্রেসের বাইরে ভারতে অন্য কোনো দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভালো সম্পর্ক কখনোই ছিল না। তারপরও ক্ষমতায় পুনর্বার বসতে গত ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগ ভারতের যে সহযোগিতা নিয়েছিলো একই সঙ্গে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টায় বেশি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী ও এইচ টি ইমাম এখন অনেক ব্যস্ত। কখন কীভাবে ভারত সফর করবেন, ভারতকে কি কি সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিবেন তা নিয়ে অনেক ব্যস্ত সরকারের এ কয়েকজন নীতিনির্ধারক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে যে তৎপরতাই চালিয়ে যাক না কেন মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার মসনদে বসেই হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিবে না। কারণ ক্ষমতায় আসতে যে গণজোয়ার দেখেছেন মোদী অবশ্যই এসব বিবেচনায় রেখেই দেশ পরিচালনা করবেন। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের মতো বিজেপি’র সাথে যে সুসম্পর্ক থাকবে না এটা মোটামুটি সবাই বুঝতে পারছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনেকেই এ নিয়ে খুবই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। সম্ভাব্য বিজেপি সরকারের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গ্রিন সিগন্যাল প্রত্যাশা করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়ার সম্ভাবনা যে খুবই ক্ষীণ তা ইতোমধ্যে উপলব্ধি করতে পারছেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা। যদিও সরকারের ভেতরের অবস্থা বাইরের বক্তব্য শুনে বুঝা যাচ্ছে না। তবে ভারতে সরকার পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কতটা হতাশ তা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একান্তে আলাপচারিতায় বোঝা যাচ্ছে।

বিএনপি উজ্জীবিত

ভারতে বিজেপির নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন ও কংগ্রেসের পতনের পর আওয়ামী লীগ যেভাবে হতাশায় ভুগছে ঠিক তার উল্টোটা বিএনপির ক্ষেত্রে। অস্বাভাবিক উজ্জীবিত দেখা যাচ্ছে বিএনপিকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এখন যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন তার একটি বিশেষ অংশ জুড়ে থাকছে ভারত ইস্যু। বিএনপি মনে করে বাংলাদেশের উপর থেকে একটি বড় সমস্যা দূর হয়েছে। এখন বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে আঁচলে আশ্রয় দেওয়ার মতো বিশেষ কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ভারতে নেই। গত ১৮ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর নিরঙ্কুশ জয়ে আওয়ামী লীগ নার্ভাস হয়ে পড়েছে। সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আপনারা নার্ভাস হয়েছেন কেন? আসলেই কি ভয় পেয়েছেন?

ভারতের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘বর্তমান অবৈধ ক্ষমতাসীন শাসক দলের মন্ত্রী এমপিদের কথা শুনে মনে হয় তারা নার্ভাস হয়ে পড়েছে। কারণ, তারা জানে তাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ন্যায্য অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমরা তাদের কাছে বন্ধুসুলভ ব্যবহার প্রত্যাশা করি। ভারতে নতুন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তাদের কাছে আশা করবো ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

ভারতের নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির নেতা ও কর্মীদের মধ্যে যে উল্লাস বা প্রত্যাশার জন্ম নিয়েছে তা হচ্ছে, তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে (আওয়ামী লীগ) প্রতিবেশী দেশ ভারতের মনমোহন সরকার নির্লজ্জভাবে ক্ষমতায় বসাতে ও টিকিয়ে রাখতে যে ভূমিকা নিয়েছে নতুন সরকার সেভাবে ভূমিকা রাখবে না। বিএনপি মনে করে, ভারত সরকার বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে কোনো সহযোগিতা না করলেও কংগ্রেসের মতো আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা না করলেই হলো। ক্ষমতায় টিকে থাকতে আওয়ামী লীগকে কংগ্রেস যেভাবে সহযোগিতা দিয়েছিল বিজেপি একই ধরনের কাজ না করলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। শুধু বিএনপির নয়, বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকগণও মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কংগ্রেস যে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে তা একটি স্বাধীন দেশের জন্য খুবই হতাশার। প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এ ধরনের আচরণ কখনোই কামনা করেনি। কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনের ভাষা না বুঝে শুধু আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই বেশি মনোযোগী হয়েছিল। ফলে ভারতে কংগ্রেসের পরাজয়ের পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও এ পরাজয়কে বাংলাদেশের জন্য কাঙ্খিক্ষত মনে করছে। তবে বিএনপি বলছে, ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বের। নতজানু নীতি অবলম্বন করলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না।

একমুখী পররাষ্ট্রনীতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ভারতের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী হবে তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাষ করতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একমুখী পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করেছেন। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় সব ক্ষেত্রেই সাফল্য আনতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালো না কমালো তার প্রতি কোনো খেয়াল না রেখে সরকার ভারতের স্বার্থেই বেশি কাজ করেছে। ভারতে সোনিয়া গান্ধীর নির্দেশনায় পরিচালিত ড. মনমোহন সরকার যা বলেছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে ভারত ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আর কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু অবশিষ্ট থাকলো না। বিশেষ করে, গত ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচন করতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের নির্দেশনাই মেনে চলেছে। পশ্চিমাবিশ্বসহ পৃথিবীর অনেক দেশই শেখ হাসিনার সরকারকে বলে আসছিল যে, বাংলাদেশের শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে সব রাজনৈতিক দলের অংশ গ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর নির্দেশনায় পরিচালিত ভারত সরকার মনে করেছিলেন, সব দলের অংশ গ্রহণে এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তির পরিচালনায় নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ব্যাপক ভরাডুবি হবে। তাহলে কংগ্রেস তাদের নির্ভরযোগ্য একটি সরকার হারাবে। সোনিয়া গান্ধীর নির্দেশে ভারত সরকার তাদের দেওয়া আশ্বাস পালনও করেছে অক্ষরে অক্ষরে। শেখ হাসিনাকে প্রহসনের নির্বাচনে সব ধরনের সহায়তাই দিয়েছিল ভারত। এসব নিয়েও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের উপর ক্ষুব্ধ পশ্চিমারা। এ কারণে পশ্চিমারা ভারতের নির্বাচনের সময় বিজেপিকে অনেকটা বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা দিয়েছে বলেও খবর বেরিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর দুই কূলই হারিয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। একদিকে পশ্চিমারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের একতরফা নির্বাচনের কারণে ক্ষুব্ধ রয়েছে। অপরদিকে ভারতের যে সরকারের উপর শতভাগ আস্থা রেখে শেখ হাসিনা সব দল ও মতের বক্তব্যকে উপেক্ষা করে গত ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন দিলেন সেই সরকারও এখন আর থাকছে না ভারতের মসনদে। ফলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার মতো এখন আর কোনো বিদেশি বড় শক্তি তার পাশে নেই বলা যায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দিল্লি সফর সিডিউল বিলম্বিত

ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যাপক তৎপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু এখনো ইতিবাচক কোনো সাড়া নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি সফরের পরিকল্পনা করছেন বেশ কিছু দিন ধরেই। বিশেষ করে ১৬ মে বিজেপির সরকার গঠন নিশ্চিত হওয়ার পর তার এ প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়। কিন্তু, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাগণ গত কয়েক দিন ধরে যেসব চেষ্টা চালিয়েছেন তাতে আপাতত কোনো ভালো খবর নেই। সাধারণত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করতে চাইলে এক সপ্তার মধ্যে সিডিউল নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এবারই এর ব্যতিক্রম ঘটলো।

জানা গেছে, ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সার্ক এবং বিমসটেক শাখার মহাপরিচালক আব্দুল মোতালেব সরকারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি প্রায় এক সপ্তাহ কাজ করেও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি।

এদিকে, ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রেস অ্যান্ড ইনফরমেশন) সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দূতাবাসের রাজনৈতিক শাখা কাজ করছে। দিল্লী থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসার পরই সফর চূড়ান্ত হতে পারে। কত দিন সময় লাগতে পারে এমন প্রশ্নের কোনো জবাব কোনো সূত্র থেকেই পাওয়া যাচ্ছে না।

দূতাবাসের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এ সফর চূড়ান্ত করতে হাইকমিশন তাকিয়ে আছে দিল্লির নির্দেশনার অপেক্ষায়। ২৬ মে ভারতের নতুন মন্ত্রিপরিষদ শপথ নেওয়ার পর এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে কিছুটা আভাস দিয়েছে দূতাবাস সূত্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভারত সফরের জন্য যে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তার সঙ্গে ভারতের আগ্রহের কোনো মিল নেই। তাছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মোদীকে প্রথমে বাংলাদেশ সফরের জন্য যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এর কারণ যতোটা জানা গেছে, মোদীর অনাগ্রহ।

বিজেপি-বিএনপি সম্পর্ক

ভারতে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর পরই বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এসব আলোচনার মধ্যে উঠে আসে ভারতের প্রধান দুটি দল বিজেপি ও কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকরা এসব আলোচনায় কংগ্রেস-আওয়ামী লীগ ও বিজেপি-বিএনপি সুসম্পর্ক রয়েছে বলেই ইঙ্গিত করেছেন।

বিশেষ করে কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক যে খুবই ভালো তা বাংলাদেশের প্রায় সব সচেতন মানুষই জানেন। ভারতের কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক খুবই গভীর। কংগ্রেস প্রধান সোনিয়া গান্ধী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা একই পরিবারের সদস্যের মতো। আবার অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে বিজেপি’র সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো বলে ইতোমধ্যেই খবর বেরিয়েছে।

জানা গেছে, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর সঙ্গে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সম্পর্ক খুবই গভীর। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিজেপি’র বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গেও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সম্পর্ক অনেক গভীর। বিশেষ করে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ। প্রায় ১৫ বছর ধরে এ দু’জনের (মোদী-তারেক) মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তারেক রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও নরেন্দ্র মোদী ও তারেক রহমানের মধ্যে রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হতো দুই দেশের দুই দলের এ দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে। তাছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিজেপি’র লন্ডন অফিসের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। বিজেপি’র শীর্ষ নেতারাও বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের মাধ্যম ব্যবহার করেন। ফলে এ দু’টি দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

তারেক-মোদীর সম্পর্কের রেশ ধরেই গত বছরের শেষ দিকে বিজেপির এক বিশেষ বৈঠকে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমন্ত্রণ পেয়ে বিএনপি তাদের একজন প্রতিনিধি পাঠানোর চিন্তা করে। তারেক রহমান বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করেই ঢাকা থেকে কাউকে না পাঠিয়ে লন্ডন থেকে একজনকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বিএনপির মনোনীত ওই প্রতিনিধি ছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। যিনি যথারীতি লন্ডনস্থ ভারতীয় হাইকমিশনে ভিসার আবেদন করেন। সঙ্গে আমন্ত্রণ-পত্রও ছিল। ভারতীয় হাইকমিশন ভিসা ইস্যু করে পরে একটি বিশেষ ফোনের কারণে তা বাতিলও করে।

ঘটনাটি বিজেপির লন্ডন অফিসকে জানানো হয়। তারা বিস্মিত, সেই সঙ্গে ক্ষুব্ধও হন। তাদের এক নেতা তখন বলেন, দলের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে জানানো হবে বিষয়টি। সে মতে যথারীতি নরেন্দ্র মোদীর কানে যায় বিষয়টি। মোদী শুনে হতবাক ও বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং বলেন, এ কোন ভদ্রতা! এ কোন শিষ্টাচার? দাওয়াত করলাম আমরা। দায়িত্ব তো আমাদের। কোন যুক্তিতে ভিসা বাতিল করলো ভারতীয় হাইকমিশন। তারা তো আমাদের মতামত নিতে পারতো। মোদী বলেন, ওয়েট অ্যান্ড সি। এখনই এ নিয়ে কিছু বলার দরকার নেই। ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী‘র এ মন্তব্য খুব বেশি পুরোনো নয়। বিজেপি’র সভায় বিএনপিকে আমন্ত্রন ও বিএনপির প্রতিনিধিকে লন্ডনস্থ ভারতীয় দূতাবাস ভিসা দিয়ে তা বাতিল করায় যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন মোদী তাতেই অনেকটাই বোঝা যাচ্ছে, বিএনপির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক কতটা গভীর।

তাছাড়া বিএনপির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক যতটা ভালো তার চাইতে বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব তত বেশি। কারণ, বিজেপি আওয়ামী লীগকে কংগ্রেসের খুবই ঘনিষ্ঠ মনে করে। সে কারণে, ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পারে। অপরদিকে বাংলাদেশের মানুষও ভারতের বিদায়ী সরকারের উপর খুশি নয়। কারণ, কংগ্রেস নানা ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে খুশি করতে পারলেও বাংলাদেশের জনগণকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। এরকমই এক ভূমিকা নিয়ে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করে কংগ্রেস সরকার। ভারতের কংগ্রেস ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ ওই নির্বাচনকে সমর্থন তো নয়ই বরং নির্বাচন না করার অনুরোধও জানিয়েছিলো শেখ হাসিনাকে। কিন্তু, ভারতের কংগ্রেস সরকারের আশীর্বাদ থাকায় অন্য কোনো দেশের অনুরোধ মানেননি শেখ হাসিনা।

বিজেপি’র সঙ্গে আ.লীগের সম্পর্ক

আওয়ামী লীগ দাবি করে বলছে বিজেপি’র সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক ভালো। তারা বলছে, ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি হয়েছে। সেই সময় তো কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতায় ছিল না। তখন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ বছরের পানি চুক্তি হয়েছিল। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিজেপি‘র নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন আমরা (তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার)  ২৩টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম। এখন যে বাসে করে মানুষ কলকাতায় যায়, সেটাও বিজেপি ক্ষমতায় থাকার সময়ই হয়েছিল। তোফায়েল বলেন, চুক্তি হয় সরকারের সঙ্গে; দলের সঙ্গে নয়। ভারতকে বাংলাদেশের সৎ প্রতিবেশী বলেও উল্লেখ করেন তোফায়েল আহমেদ।

অবশ্য অন্যদিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা  পরিষদের অপর সদস্য প্রফেসর ড. আবদুল খালেক স্পষ্ট করেই বলেছেন আওয়ামী লীগ সব সময়ই কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সেকারণে কংগ্রেসের ক্ষমতা হারানোয় কিছুটা হলেও বিব্রত হয়েছে তার সরকার। তিনি বলেন, বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক কংগ্রেসের মতো গভীর না হলেও এতে বিএনপির উল্লসিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, বিজেপি একটি দেশপ্রেমিক দল সেকারণে তারা দেশের প্রতি আন্তরিক রয়েছে এমন দল বা গোষ্ঠীকেই কাছে টানবেন। তিনি বিএনপিকে ভারত বিরোধী দল বলে মনে করেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের দলীয় অবস্থান থেকে যাই বলুক না কেন বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আর কত দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে তা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছে দেশের সাধারণ মানুষ। এমন কী আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মধ্যে এমন প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে আর কত দিন পর আওয়ামী লীগ সরকারকে নির্বাচন দিতে হবে? বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারাও এ বিষয় নিয়েই বেশি আলোচনা করছে। ক্ষমতাসীন দলের এসব নেতা মনে করছেন, তাদের সরকারের মাথার উপর যে বটবৃক্ষ ছিল এখন তা নেই। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে খুব দ্রুতই আরেকটি নির্বাচন দেওয়া লাগতে পারে। এক্ষেত্রে খুব বেশি সময় লাগবে না বলেও আশঙ্কা করেন তারা।

বিজেপি কী সত্যিই বিএনপির পাশে থাকবে?

গত ১৭ মে শনিবার আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ সেলিম রাজধানীতে এক দলীয় সভায় বক্তব্য রাখেন। ওই সভায় তিনি বিএনপির বিভিন্ন নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করেন। শেখ সেলিম বলেন, ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপি এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন কালকে এসে মোদী তাদের ক্ষমতায় বসাবে। অপরদিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপি’র কথা শুনে মনে হয় ভারতে নরেন্দ্র মোদী নয় বিএনপি ও খালেদা জিয়া জয়লাভ করেছেন। দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক হয়, সরকারের সঙ্গে সরকারের নয়। আমাদের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক। সেখানে কোন দল ক্ষমতায় আসলো সেটি আমাদের জন্য কোনো চিন্তার বিষয় নয়।

আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির নেতাদের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা যাই করুন না কেন বিশ্লেষকরা বলছেন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নয়, সম্পর্ক হচ্ছে দেশের সঙ্গে দেশের। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কী সত্যিই তাই? বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কথা তোফায়েল আহমেদ মুখে স্বীকার না করলেও বাংলাদেশের সচেতন প্রায় সব মানুষেই জানেন যে, ভারতের কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল ভালো। বাংলাদেশের মানুষ এটাও জানেন ভারত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে এতো নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ করেছিল শুধুমাত্র কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার কারণেই। এটা সবারই জানা, শুধু কংগ্রেসই নয়, সোনিয়া গান্ধী ও শেখ হাসিনার মধ্যে একটি পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। মূলত এ কারণেই আগামী দিনে বিজেপি সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকার আন্তরিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে শেখ হাসিনার বিশেষ সম্পর্ক থাকার কারণেই আওয়ামী লীগকে এড়িয়ে চলতে পারে বিজেপি সরকার।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির যে চেষ্টা করা হচ্ছে খুব সহজে তা সম্ভব নাও হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগেরই এক সিনিয়র নেতা। তিনি বলেন, কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার যে সম্পর্ক রয়েছে হঠাৎ করেই একই ধরনের সম্পর্ক হয়ে ওঠবে না মোদী বা বিজেপির সঙ্গে।

আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ভারতে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন হবে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে গত ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচন নিয়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারে। কারণ, ভারতের নতুন সরকার চাইবে না যে, তারা আগের সরকারের বৈদেশিক সম্পর্ক শতভাগ বজায় রাখতে। ভারতের নতুন সরকারের কারণে বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। কংগ্রেস-আওয়ামী লীগ সম্পর্ক প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। সেই জায়গায় বিজেপির সঙ্গে তাদের এ দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার ফলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারায় একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারবে। ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। কারণ, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের কাছে এমনই একটি আচরণ প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অতীতে কোনো অনির্বাচিত সরকারের অনুগত্য করতে সম্মত হয়নি। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে এদেশের জনগণ যে গণতান্ত্রিক ধারা সৃষ্টি করেছে তা অক্ষুন্ন রাখতে সক্রিয় থাকবে সাধারণ মানুষ। নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় আসলো বা কোন দল ক্ষমতার বাইরে থাকলো তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হচ্ছে জনগণের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করবে।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের একজন সদস্য বলেছেন, গত ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করতে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রশাসনকে অনেকটা বাধ্যই করেছিল। প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা নির্বাচনী কাজে অংশ নেবে কী নেবেনা এ সংশয়ের মধ্যে ছিল। পরে গান্ধী পরিবারের নির্দেশেই ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রশাসনকে বিশেষ একটা হুমকি দেয়। ভারতের ওই হুমকির কারণেই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন করিয়ে নিতে পেরেছিলেন। যদিও এ নির্বাচনে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা আওয়ামী লীগের লোকেরাও এতে অংশ নেয়নি। এমনকি বাংলাদেশের ৩৭টি ভোট কেন্দ্রে একজন ভোটার উপস্থিত না হওয়ারও ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কাছে যেটা প্রত্যাশা করে সেটা হচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে যেন হস্তক্ষেপ না করে। বাংলাদেশের জনগণ চাচ্ছে, ভারত-বাংলাদেশ একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকুক। বিশেষ করে বাংলাদেশে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ভারত অতীতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের প্রশাসনকে যেসব হুমকি দিয়েছে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভারতের কাছে কোনো ধরনের হুমকি শুনতে চায় না। বাংলাদেশের জনগণের মনের ভাষা বুঝে ভারতের নতুন সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবেন বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত দর কষাকষি

গত ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ যে প্রহসনের নির্বাচন করেছে তার জন্য সব কৃতিত্ব শুধুমাত্র গান্ধী পরিবারের। ওই সময় বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় সব রাষ্ট্রদূতগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একতরফা নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। পশ্চিমারা চেয়েছেন বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার আলোকেই একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। বিদেশি কূটনৈতিকদের মধ্যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বেশি তৎপরতা চালিয়েছে। ভারত চেয়েছে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে আর যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার আলোকেই সব দলের অংশ গ্রহণে একটি নির্বাচন হবে। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই একতরফা নির্বাচনের পক্ষে ছিলো না। বাংলাদেশের এ নির্বাচনী ইস্যুতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট দর কষাকষি করলেও শেষ পর্যন্ত সোনিয়া গান্ধীর নির্দেশনায় পরিচালিত ভারত সরকারের সাথে পেরে ওঠেনি যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেকারণেই ভারতে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র বিজেপিকে বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে কংগ্রেস পরাজিত হলে ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করবে। বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র হারলেও ভারতের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি সফল হয়েছে বলেও মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকগণ।

সাধারণ মানুষ যা চায়

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি সাধারণ নির্বাচন প্রত্যাশা করে। একটি আগাম নির্বাচনের পক্ষে দেশের প্রায় সব মানুষ। এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা বা সরে যাওয়াকে পছন্দ করেন। যুবলীগের একজন তৃণমূল নেতা ভারতের নির্বাচনের ফলাফলের পর এ প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনে আলাপকালে তার নিজের অবস্থান জানান। তিনি বলেন, প্রভাবশালী কংগ্রেসের পতনের বিভিন্ন দিক থেকে শিক্ষা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার আলোকে এখনই একটি নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়া। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা যত বিলম্ব করবেন ততই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার দল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে হলে জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হবে। এদেশের জনগণ প্রায় দুই যুগ ধরে নির্বাচিত সরকারে অভ্যস্ত। সেকারণে এখন আর কেউ জোর করে ক্ষমতা দখলে রাখুক এটা চায় না। ভারতের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশের সব দলের অংশ গ্রহণে একটি আগাম নির্বাচনের ব্যবস্থা না করেন তাহলে পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে সবাই শঙ্কিত। আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা সব সময়ই একটি অজানা শঙ্কায় থাকেন বলেও মন্তব্য করেন যুবলীগের ওই তৃণমূল নেতা। তবে দেশের সাধারণ মানুষ, যে যেখানেই অবস্থান করছেন, একান্ত আলাপচারিতা বা চায়ের আড্ডায় এখন একটাই প্রশ্ন, শেখ হাসিনা আগাম নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে আর কত দিন সময় নেবেন?