বৃহস্পতিবার ২৮শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

ছাতকে আভিজাত্যের প্রতিক হিসেবে মাঠির দালানে বসবাস

আপডেটঃ ১২:৪৯ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ০১, ২০১৬

 

চান মিয়া, ছাতক (সুনামগঞ্জ): সুনামগঞ্জের ছাতক শহরের অতি নিকটবর্তী এলাকায় মাঠির দালানে বসবাস করছে প্রায় দু’ হাজারেরও বেশী পরিবার। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগেও যেন ওদের জীবন যাত্রায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। ওরা যুগ যুগ থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছে নিজেদের হাতে গড়া মাঠির দালানের ঝোঁপড়ি ঘরে।

মাঠির দালানে বসবাসকে নিজেদের আভিজাত্য মনে করছেন এলাকাবাসী। উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নও ছাতক পৌরসভার ছোট-বড় টিলা-পাহাড়ে বেষ্টিত জনপদ ঘুরে অভাবি মানুষের বসবাসের এচিত্র দেখা গেছে। সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরীকালে নোয়ারাই ইউপির জোড়াপানি, কুপিয়া, কৈয়াদল, মহিষমারা, রাজগাঁও, জয়নগর, কুরিয়া, বাঁশটিলা, শাহ আরেফিননগর, মারোয়াটিলা, বড়গললা, রংপুর, গোদাবাড়ি, মানিকপুর, কচুদাইড়, ছাতক পৌরসভার নোয়ারাই ও নোয়ারাই-ইসলামপুর গ্রামের লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাসের জন্যে ছোট্ট ঝোঁপড়ি মতো করে নিজ হাতে তৈরী করেন মাঠির দালান। এসব দালানে নিজেদের সাধ্যমতো টিন ও ছনের (খড়ের) চাল তৈরী করে তারা যূগ যূগ থেকে বসবাস করে আসছেন। নিজেদের হাতে তৈরী এসব মাঠির দালানে বসবাসে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও আত্মতুষ্টির কথা জানিয়ে তারা বলেন, রড-সিমেন্টের তৈরী দালানের চেয়ে তাদের নিজ হাতে মাঠি দিয়ে তৈরী দালানের স্থায়ীত্ব অনেক বেশী। দালান ঘরের চেয়ে উন্নত কারুকাজ দিয়ে তৈরী করা হয় এগুলো। আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের মতো আভিজাত্যের প্রতিক হিসেবে এগুলোতে ব্যবহার করা হয় দর্শনীয় কারুহাজসহ দরজা-জানালা। সাধারণ একটি মাঠির তৈরী দালানের স্থায়ীত্ব হচ্ছে একশ’ থেকে দেড়শ’ বছর। এগুলোর সবই ভূমিকম্প সহনীয়। কোন সময়েই মাঠির দালানের দেয়াল ভেঙ্গে অথবা মাঠির দালান চাঁপায় কোন মানুষের প্রানহানি ঘটেনি বলে তারা দাবি করেন। মাঠির দালান তৈরী করতে ৩থেকে ৪মাস সময় ব্যয় হলেও এটির তৈরী খাতে কোন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়না। টিলার চিকনি মাঠি দিয়ে নিজেদের বসবাসের জন্যে তৈরী করা হয় এসব মাঠির দালান। যা-তাদের সংস্কৃতিতে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে সর্বমহলে যূগ যূগ থেকে সমাদৃত হয়ে আসছে বলে জানান। জানা যায়, মাঠির দালানে টিলা থেকে সংগৃহীত চিকনি মাঠি ও পানির সংমিশ্রনে এটি তৈরী করা হয়। ঘরের চাল দেয়া হয় ছন ও টিন দিয়ে। আগেকার দিনে এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরেই দেয়া হতো ছনের চাল। এখন অনেকে সাধ্যানুযায়ি চালে টিন ব্যবহার করছেন। এসব মাঠির দালানের দেয়ালের পুরোত্ব হচ্ছে এক ফুট থেকে দেড় ফুট পরিমানে। অনেক দালানের দেয়ালের ভেতরে বাঁশের খুটা ব্যবহার করা হয়। কাঠও বাঁশের তৈরী দরজা ব্যবহার করা হয় এগুলোতে। এসব দালানে প্রয়োজন মতো জানালা তৈরী করায় ঘরের সৌন্দর্য অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘরে বসবাস করলে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মনে হয়। মাঠির ঘরে বসবাস স্বাস্থের জন্যে খুবই উপকারি বলে তারা দাবি করেন। তৈরীর সময়ে মাঠির নীচ থেকে গাঁথুনী দিয়ে দেয়াল নির্মানের ফলে ছিঁচকে চোরও সিঁদেল চোরের উপদ্রব থেকে একেবারেই মুক্তি পাওয়া যায়। দেয়ালের পুরোত্ব এক ফুট থেকে দেড় ফুট থাকায় বন্দুকের গুলিও এসব দেয়াল ভেদ করতে পারবেনা। টিলার ভেতর থেকে সংগৃহিত চিকনি মাঠি একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে প্রথমে মাঠি ভেঙ্গে গুড়ো করা হয়। এরপর গুড়ো মাঠির সাথে কয়েকদফা পানির সংমিশ্রন দিয়ে এসব মাঠি থেকে আঁটালো জাতের কাঁদা তৈরী করে দেয়াল নির্মানের উপযোগি করে তোলা হয়। দালান তৈরী করতে একটি দেয়ালের একহাত পরিমানে উঁচু গাঁথুনী করার পর ইহা শুকানোর জন্যে আরো ২/৩দিন সময় অপেক্ষা করতে হয়। দেয়াল শুকানোর পর আবারও নির্মাণ কাজ শুরু করতে হয়। এভাবেই একটি দালান তৈরী করতে তাদের ৩থেকে ৪মাস সময় ব্যয় হয়। আর দালানটি বৃষ্টির প্রকোপ থেকে রক্ষা করা গেলে একশ’ থেকে দেড়শ’ স্থায়িত্ব পায়। জানাগেছে, এসব গ্রামের প্রায় লোকজন হতদরিদ্র ও দিন মজুর থাকায় ছোট ছোট মাঠির দালান তৈরী করে পরিবার নিয়ে যুগ যুগ থেকে বসবাস করে আসছেন। টিলা এলাকায় পুকুরের ব্যবস্থা না থাকায় মাত্র একশো’ ফুট গভীরতার মধ্যেই একটি টিউবওয়েল বসানোর ও ক্ষমতা নেই অনেকের। এসব এলাকায় ৬০থেকে ৭০ফুট গভীরেই টিউবওয়েলের সুস্বাদু পানি পাওয়া যায়। জোড়াপানি গ্রামের আব্দুল করিম, আব্দুুল বাতির, রফিক মিয়া, আশ্রব আলী, জামাল মিয়া, সোনামালা বিবিসহ অনেকে জানান, জোড়াপানি গ্রামের প্রতিটি পরিবার মাঠির তৈরী দালানে বসবাস করলেও এখন অনেকেই সাধ্যানুযায়ী রড-সিমেন্টের পাকা দালান তৈরী করেছে। তবে এসব গ্রামের সব পরিবার এখনও মাঠির দালানেই বসবাস করতে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।