শুক্রবার ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং ৮ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

আওয়ামী লীগে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়!

আপডেটঃ ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ | নভেম্বর ০৩, ২০১৬

রাজীব হাসান চ্যানেল সেভেন বিডিঃ বড় ধরনের রদবদল লক্ষ করা গেছে আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে। পুরনোদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এবার ভাগ বসিয়েছে ’৯০-এর দশকের তরুণেরা। তৃণমূল থেকেও তুলে আনা হয়েছে কয়েকজনকে। কার্যনির্বাহী ৮১ সদস্যের মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে ৭৪ জনের নাম। এর মধ্যে নতুন মুখ এসেছে ২৫ জন। তবে কমিটিতে বড় চমক এসেছে সাধারণ সম্পাদক পদে।

প্রথমবারের মতো চমক দেখিয়ে পরপর দুইবারের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জায়গায় স্থান করে নিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। আগের তুলনায় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে ৭ শতাংশের বেশি। বিতর্কিতদের মধ্যে দুয়েকজন পদ পেলেও পুরনো কমিটির অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি নতুন কমিটিতে ঠাঁই পাননি। তার পরেও ক্ষমতাসীন দলের গঠিত নতুন কমিটিতে এক প্রকার নবীণ-প্রবীণের উচ্ছ্বাস ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। 
দলটির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে এবার আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে দল ও সরকার আলাদা করার পরিকল্পনা রয়েছে হাইকমান্ডের। তারই অংশ হিসেবে দল গঠন করা হয়েছে ত্যাগী, পরিশ্রমী ও মাঠের নেতাদের নিয়ে। কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে সরকারে থাকা প্রভাবশালী মন্ত্রীদের।
আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি ভালোই হয়েছে, এখনো পর্যন্ত এটাই মনে করা হচ্ছে। তবে ‘বৃক্ষ তোমার নাম কি ফলে পরিচয়’। কিছু দিন গেলেই বোঝা যাবে। তিনি বলেন, নতুন কমিটিতে দল ও সরকার আলাদাভাবে পরিচালনা করার একটি অভিপ্রায় লক্ষ করা গেছে। তবে এই কমিটির লক্ষ হওয়া উচিত সামনে যাতে আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন না হয়।

সে জন্য নেতাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও দায়বদ্ধ হতে হবে। বিতর্কিতদের প্রসঙ্গে ড. মজুমদার বলেন, কিছু কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি আছে। তবে তাদের এড়িয়ে কমিটি গঠন করতে পারলে আরো ভালো হতো। নারীদের প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, আগের চেয়ে আওয়ামী লীগে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে, এটা একটি ইতিবাচক দিক। সামনে এটা অব্যাহত রাখতে পারলে দলের জন্য ভালো হবে। 
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ৮১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির মধ্যে ৭৪ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৩ অক্টোবর দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি পদে অষ্টমবারের মতো শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রথমবারের মতো ওবায়দুল কাদের নির্বাচিত হন। ওই দিনই সভাপতিমণ্ডলী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ২১ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় ২২ জন সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। গত শনিবার তৃতীয় দফায় ৩১ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। ২৫ নতুন মুখের মধ্যে কার্যনির্বাহী সদস্য পদেই আছেন ১৮ জন। তা ছাড়া সভাপতিমণ্ডলীতে দুইজন, সম্পাদকমণ্ডলীতে আছেন পাঁচজন। সভাপতিমণ্ডলী পদে পদোন্নতি পেয়েছেন চারজন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে একজন, সম্পাদকমণ্ডলীতে পদোন্নতি পেয়েছেন সাতজন। নতুন নেতৃত্বের মধ্যে অনেককেই তৃণমূল থেকেও তুলে আনা হয়েছে।

 
নতুন মুখের মধ্যে ঘটা করে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় সভাপতিমণ্ডলীর পদে স্থান পেয়েছেন পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য। এর আগে তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তিনি একেবারেই নতুন মুখ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কাছে পরাজয় বরণ করে অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান খান নিজের দফতরও অনেকটা হাতছাড়া করেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনেও কয়েকবার হাজিরা দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগের এই নেতাকে। নানা সমালোচনার মধ্যেও এবার মান্নান খান সভাপতিমণ্ডলীতে জায়গা করে নিয়েছেন। এই পদে রমেশ চন্দ্র সেনও একবারে নতুন মুখ।

বিগত কমিটির নির্বাহী সদস্য আব্দুর রহমান পদোন্নতি পেয়ে এবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। এর আগে তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। চমক দেখিয়েছেন ’৯০-এর দশকের ছাত্রনেতা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। তিনি সরাসরি দলের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন। এর আগে তিনি ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকেও তৃণমূল থেকে তুলে এনে সরাসরি সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। এ কে এম এনামুল হক শামীম সদস্য থেকে পদোন্নতি পেয়ে নতুন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক ’৯০-এর দশকের দিকে তুখোড় ছাত্র নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জাকসুর ভিপি থেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হন। এর পরের কমিটিতে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ড. আবদুর রাজ্জাক কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন। ড. আবদুর রাজ্জাক এমপির বোন শামসুন নাহার চাঁপা সরাসরি শিা ও মানবসম্পদ সম্পাদকের পদ পেয়েছেন। স্বাচিপ নেতা ডা: রোকেয়া সুলতানাও সরাসরি স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদ পেয়ে চমক দেখিয়েছেন। বিদায়ী কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য আমিনুল ইসলাম আমিন এবার পেয়েছেন উপপ্রচার সম্পাদকের পদ। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খান, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক টিপু মুনশি, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এবং সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল পদোন্নতি পেয়েছেন। 
নতুন কার্যনির্বাহী সংসদে ২৮ সদস্যের মধ্যে ১৮টিতেই এসেছে নতুন মুখ। তাদের বেশির ভাগই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। এরা হলেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। এর আগে তিনি অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, রাজশাহীর নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপঙ্কর তালুকদার, সিলেট মহানগর সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদরুদ্দীন আহমেদ কামরান, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট কাজী নজিবুল্লাহ হিরু, আমিরুল ইসলাম মিলন, মৌলভীবাজারের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বিদায়ী কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক গোলাম রব্বানী চিনু, অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবির কাওসার, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু, মারুফা আখতার পপি ও ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, পারভীন জামান কল্পনা, মেরিনা জাহান, ড. শাম্মী আহম্মেদ এবং নেত্রকোনার উপাধ্য রেমন্ড আরেং। 
বাদ পড়লেন যারা : সম্পাদকমণ্ডলীর বিভিন্ন পদ থেকে প্রভাবশালী তিন মন্ত্রী বাদ পড়েছেন। তারা হলেন অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক পদ থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং। বিদায়ী কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে ছিলেন এমন পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। তারা হলেন ধর্মমন্ত্রী অধ্য মতিউর রহমান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।

এ ছাড়া ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়াও এই পদ থেকে বাদ পড়েছেন। সদস্য পদ থেকে আরো বাদ পড়েছেন নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সুভাষ চন্দ্র বোস, বরগুনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপি, মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ এমপি, অ্যাডভোকেট মমতাজউদ্দিন মেহেদী এবং এ কে এম রহমতউল্লাহ এমপি।

অবশ্য এ কে এম রহমতউল্লাহ আগেই ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন। এ নিয়ে আটজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ছিটকে পড়লেন। উপদেষ্টা পরিষদ কার্যনির্বাহী সংসদের অন্তর্ভুক্ত না হলেও নতুন কমিটির ঘোষিত ৩৮ সদস্যের মধ্যে এই পদ থেকে ছিটকে পড়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব:) কে এম সফিউল্লাহ বীরউত্তম। নতুন কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে। নতুন কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ কমিটিতে সভাপতিসহ বিভিন্ন পদে নারী রয়েছেন ১৫ জন। এর মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীতে চারজন, সম্পাদকমণ্ডলীতে পাঁচজন এবং সদস্য পদে ছয়জন। নতুন কমিটির সাতটি পদ এখনো ফাঁকা রয়েছে। এর মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর তিনটিসহ সম্পাদকমণ্ডলীতে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক এবং উপদফতর সম্পাদক এ চারটি পদ।