মঙ্গলবার ১৮ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Ad

আগুন দেখতে সুন্দরবনে

আপডেটঃ ১২:৩৬ অপরাহ্ণ | মে ২৮, ২০১৪

গেরহাট থেকে : নৌযানে করে দেখা, আর বনের মধ্যে পায়ে হেঁটে দেখা এক না। বেশ পার্থক্য। নৌযানে করে দেখা যায় বাইরের সৌন্দর্য আর বনে প্রবেশ করলে দেখা যাবে ভেতরের অন্যরকম সৌন্দর্য।

প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের নাম সুন্দরবন। প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী। এ জন্য বনের নাম সুন্দরবন। এমনও কথিত আছে যে, সমুদ্রের কাছে বিধায় ‘সমুন্দর’ শব্দ থেকে প্রথমে ‘সমুন্দরবন’ এবং পরে ‘সুন্দরবন’ নামের উৎপত্তি।

অপূর্ব প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে এ বনের নাম সুন্দরবন বললে হয়তো অযৌক্তিক হবে না। একটি বনের যে সব সৌন্দর্য থাকা দরকার তা পরিপূর্ণ থাকায় তাকে সুন্দরবন বলা যায়। সুন্দরবনের সৌন্দর্য বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে।

বলা যায়, ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায় সুন্দরবন। সকালে এক রকম; দুপুরে, বিকালে, সন্ধ্যায় ও রাতে আরেক রকম রূপ ধারণ করে। শুধু দিন হিসেবে নয়, মাস ভেদেও তার রূপ বদলায়। সব রূপই দর্শণার্থীদের নজর কাড়ে।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। কিছুদিন আগে যখন সুন্দরবনে গিয়েছিলাম তখন এক সহকর্মীর স্ত্রী তার কাছে ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, ‘সুন্দরবনে কি মটর সাইকেলে গিয়েছো?’ কথাটা নিয়ে সহকর্মী আমার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করেছিলেন। কিন্তু এবার মটর সাইকেলে সুন্দরবনে যাবার পর আর হাসি ঠাট্টার বিষয়টি আসলো না। বাস্তবেই মটর সাইকেলে সুন্দরবন যাওয়া যায়। তবে বর্ষাকাল বাদে।

মোড়েলগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাই রেঞ্জের গুলিশাখালি টহল ফাঁড়িতে মটর সাইকেল রাখা হল। সেখানে মংলার বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হল। তখন সকাল সাড়ে ৬ টা, ২২ মে ২০১৪। সবাই আগুন দেখতে যাব। বনের ভেতরে আগুন লেগেছে। আমরা সাংবাদিকরা এসেছি সেই আগুনের সংবাদ সংগ্রহ করতে।

আগুন দেখতে এবার বনের ভেতরে যাবার পালা। মনের ভিতর এক অজানা ভয়। অভয় দিল এক শিশু। বলল, ‘বাইশেরছিলা যাবেন? আমার সঙ্গে আসেন।’

তাকে অনুসরণ করে প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটা হল। কিন্তু তা উল্টো পথে। এবার তার কথায় কান না দিয়ে বন কর্মকর্তাদের ফোন করে ঠিকানা জানলাম।

জিউধারা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ একটি বাকল খোলা গাছের কথা বললেন। ওই গাছই ওই এলাকায় প্রবেশের চিহ্ন। সেখান থেকে সরু পথ বেয়ে আরো ভেতরে ঢুকতে হবে। খুঁজতে খুঁজতে পিছনে এসে বাকল খোলা গাছ পেয়ে সেই সরু পথে ঢুকলাম। বেশ কিছুদূর গিয়ে পেলাম বিশাল ফাঁকা মাঠ। মাঠে ফুটেছে কাথাজুড়ি শাকের ফুল। মাঠের পশ্চিম পাশ দিয়ে শিশুসহ বেশ কয়েকজন কলস নিয়ে বনের দিকে ‘কু-উ-ক’ (সংকেত) দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সবাই হৈ চৈ করে উঠলাম, ওদের সঙ্গে গন্তব্যে যেতে পারবো। কিন্তু ওরা আমাদেরকে সঙ্গে না নেয়ার জন্য দৌড়ে বনের মধ্যে ঢুকে গেল। পিছু পিছু আমাদের এক সাংবাদিকও দৌড় দিলেন। কিছু দূর গিয়ে তাদেরকে না পেয়ে থেমে গেলেন।

তিনি যেখনে থামলেন, সেখানে অনেকগুলো সরু পথ। আমরা কোন দিকে যাব। ভয়ও লাগল, দুঃচিন্তাও হল। মানুষের পায়ের ছাপ দেখে একটি সরু পথ বেয়ে এগোতে শুরু করলাম। উঁচু নিচু পথ। ঘন গাছপালা, গহীন বন। ১০ হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না। গা শিউরে উঠে। বাঘের পেটে যাবার ভয়টা বেশি। সাপের কামড়ের ভয় তো আছেই।

পায়ে কিসের যেন খোঁচা লাগল। চামড়া উঠে গেল। বেশ কিছুদূর হাঁটার পর অস্বাভাবিক গরম লাগল। তারপরও ছোট ছোট পাখি, নানা ধরনের অচেনা গাছ, লতাপাতা, ফুল দেখতে দেখতে এগোতে লাগলাম। যত এগোচ্ছিলাম ভয় ততই বাড়ছিল।

বহুদূর; কতদূর বলতে পারবো না, যাবার পর পোড়া গন্ধ পেলাম। আরো কিছুদূর এগোনোর পর ফায়ার সার্ভিসের মেশিনের শব্দ পেয়ে এগিয়ে গেলাম।

অনেক লোক। তারা বলা গাছ কেটে ফায়ার সার্ভিসের পাইপ নেয়ার পথ তৈরি করছেন। আগুন দেখা যায় না। ঘন বনে ধোঁয়াও চোখে পড়তে চায় না। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সাহায্য নিয়ে আগুন দেখতে পেলাম। বিভিন্ন জায়গায় অল্প অল্প জ্বলছে। যেখানে জ্বলছে সেখানে পানি দেয়া হচ্ছে। এক জায়গায় নেভানো হচ্ছে আরেক জায়গায় জ্বলে উঠছে। এই প্রথম দেখলাম আগুনে পুড়ছে সুন্দরবন। যেমন পোড়ে মন…। মাটি গড়িয়ে এগিয়ে যায় আগুন। সেই আগুন সহজে দেখা যায় না। গাছের উপরে দেখা যায় শুধু ধোঁয়া।

মোড়েলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আরিফুল হক বলেন, ‘মাটি গড়িয়ে আগুন এগিয়ে যাওয়ায় নেভাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।’

আরিফুল হক জানান, বনজীবীরা ২১ মে সকালে আগুন জ্বলতে দেখে বন বিভাগে খবর দেয়। ওই দিন সন্ধ্যায় বন বিভাগের কর্মকর্তারা ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে নিয়ে সেখানে গেলেও কিছুই করতে না পেরে ফিরে আসেন। কারণ, রাতে বনের গহীনে দুর্গম এলাকায় থাকা অসম্ভব। পরদিন সকালে তারা আবার যান।

ছবি তোলা হলো, পরিস্থিতি দেখা হলো। আধাঘণ্টা পর সেখান থেকে ফিরতি পথ ধরলাম। এত ঘন বন যে, পথ হারিয়ে ফেললাম। এক বনজীবীর সহযোগিতা নিতে হলো। ক্লান্তিতে পা আর এগোতে চায় না।

এক সময় ফিরে এলাম বনবিভাগের বুলিশাখালী টহল ফাঁড়িতে। এরপর সংবাদ পাঠানোর পালা।

২১ মে সুন্দরবনে চাঁদপাই রেঞ্জের বুলিশাখালীর বাইশেরছিলা এলাকায় গহীন বনে আগুন লাগে। সেই আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয় ২৩ মে সন্ধ্যায়। এরই মধ্যে পুড়ে যায় বনের কয়েক একর এলাকা।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে পরে জেনেছি, আগুন নেভাতে গিয়ে মোড়েলগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আরিফুল হক এবং বন বিভাগের কয়েকজন কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

লেখক: বাগেরহাটের স্থানীয় সাংবাদিক।