রবিবার ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

ঢাবিতে অপহরণের আরেক নাম ছাত্রলীগ!

আপডেটঃ ১০:১৯ অপরাহ্ণ | মে ২৮, ২০১৪

স্ক,ঢাকা-সারাদেশে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নানাভাবে সমালোচনার শিকার হলেও এর তোয়াক্কা না করেই ছাত্র সংগঠনটি নানা অপকর্ম করেই চলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও এসব অপকর্মে পিছিয়ে নেই। দেশজুড়ে ছাত্রলীগের মধ্যে অপকর্মের তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে। অপকর্মের কারণে সব সময় তারা আলোচনায় রয়েছে। ঢাবিতে এখন অপহরণের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে ছাত্রলীগ।

কিছুদিন আগে ব্যবসায়ী অপহরণের দায়ে ছাত্রলীগের চার নেতাকে সংগঠন থেকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এরা সবাই ছাত্রলীগের পদপ্রাপ্ত নেতা। এর পরেও তাদের হুশ ফিরছে না। মাত্র কয়েকদিনের এই ঘটনা ভুলে আবার তারা অপহরণের মত ঘৃণ্য অপকর্ম করতে সংকোচ করেনি। এবার অপহরণ করেছে বহিরাগত এক যুবককে। বহিরাগত ওই যুবককে অপহরণ করে তার মোটরবাইক গুম ও চাঁদা দাবি করেছে তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে হাতেনাতে আটক এবং অপহৃত ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিগত কয়েক মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্তৃক অপহরণের যে চিত্র দেখতে পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, এই কয়মাসে কমপক্ষে ১০ জনকে অপহরণ করে চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়া যায় ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও অরো অনেক না জানা ঘটনাতো রয়েছেই। এসব ঘটনার কোনটির বিচার হয়েছে, কোনটি বা ছাত্রলীগ নেতা কর্তৃক বিচার বাধাগ্রস্থ হয়েছে, আবার কোনটির বা কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে অপহরণের সকল ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে বিচার করেছে বলে দাবি করেছে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে যে কয়টি অপহরণের অভিযোগ এসেছে সবগুলোর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে। যারা অভিযোগ করেছে সবগুলোরই বিচার হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ১৮ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে বহিরাগত দু’জনকে হলের ৩১৯ নম্বর রুমে আটকে রেখে মুক্তিপণের দাবিতে দিন ভর নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ নেতা সোহেল। কোনো উপায় না পেয়ে ওই দিন সন্ধ্যার দিকে রাসেল নামের ছেলেটি হলের তিন তলা থেকে লাফিয়ে মাটিতে পড়ে। পরে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল কর্মচারীরা রাসেলকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং তার তথ্য মতে পরে জাকিরকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগে গত জুলাই মাসে ছাত্রলীগের একই নেতা রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড থেকে এক রাজমিস্ত্রীকে ধরে এনে নবনির্মিত বিজয়’৭১ হলে বেঁধে রাখে। পরে অপহৃতকে জিম্মি করে তার পিতার কাছ থেকে ২ কিস্তিতে বিকাশ একাউন্ট থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করে সে। ৩ সেপ্টেম্বর মৎস্য ভবন এলাকা থেকে আরিফ নামের এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ধরে এনে ডাচ বাংলা বুথের মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকা এবং তাঁর মোবাইল হাতিয়ে নেয় শহিদুল্লাহ হলের ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান, সোমিত শাহরিয়ার ও তাদের অনুসারীরা। পরে মোটরসাইকেল আরোহী অপহরণ মামলা করলে ছাত্রলীগের দুই কর্মীকে গ্রেফতার করে শাহবাগ থানা পুলিশ।

৪ সেপ্টেম্বর রাতে নোয়াখালী জেলার ১০ বছরের এক শিশুকে আটকে রেখে তার পিতা মাতার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানলেও দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্রলীগের স্যার এফ রহমান হলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হাফিজ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস রিফাতকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাত দেড়টার দিকে তাঁরা দু’জন নীলক্ষেতের একটি বিকাশ এজেন্টের দোকান থেকে দুই লাখ টাকা তুলতে যান। এঁদের ধরার পর হলের ৩১৭ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় অপহৃত এক ব্যক্তিকে।

১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দা সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরেফিন সিদ্দিক সুজনের একান্ত ঘনিষ্ঠ কর্মী ও হলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক লিয়ন বহিরাগত এক ছাত্রকে অপহরণ করে। পরে তাকে হলের ২১৯ নম্বর রুমে আটকে রাখে। তিন দিন আটকে ওই ছাত্রকে মারধর করে লিয়ন ও ছাত্রলীগের কর্মীরা। এ ঘটনা জানাজানি হলে ছাত্রলীগের নেতারা প্রেমঘটিত নাটক সাজিয়ে বিষয়টি চাঁপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

এ ব্যাপারে আবাসিক শিক্ষক আমিনুল ইসলামকে প্রধান করে দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে এসব ঘটনা দেখলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ পর্যন্ত এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। নিউমার্কেটের প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারে চুরির টাকা উদ্ধারে কমিশনের আশায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে এক যুবককে তুলে নিয়ে আসেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুল আলম।

সূত্র জানায়, ওই শপিং সেন্টারের এক দোকানদারের ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়। চুরির টাকা উদ্ধার করলে ভালো কমিশন পাওয়া যাবে এই ভেবে টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব নেন মাহাবুবুল ও তাঁর সঙ্গীরা। রাত ভর নির্যাতনের পর সকালে আহত অবস্থায় ওই যুবককে নিউমার্কেট থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা।

গত ৬ মে রাত ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র এ বি মাইনুল ইসলামকে চানখাঁরপুল থেকে অপহরণ করে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির প্রচার সম্পাদক সোহেল রানা। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত ওই নেতার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

গত ৮ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চ থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ছাত্রলীগের নেতারা। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতাসহ মোট সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-ক্রীড়া সম্পাদকও ছিল। পরে ছাত্রলীগের ওই নেতাসহ চারজনকে স্থায়ী বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এর পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়।

সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার বহিরাগত এক যুবককে আটকে রেখে মারধর এবং চাঁদা দাবির দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই নেতাকে হাতেনাতে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ। আটকের পর তাদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যাালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ৬৮ নম্বর রুমে তাকে আটকে রাখা হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. এম আমজাদ আলী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই এই দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অপহরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, যারা এসব কর্মকাণ্ড করে তারা ছাত্রলীগের কেউ না। ছাত্রলীগের কোনো নেতা এসব অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে না। যদি কেউ জড়িত থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা বলেন, অপরাধী যেই হোক তার শাস্তি হোক এটা আমরাও চাই। ছাত্রলীগের কোনো নেতা যদি এর সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আমাদের এ বিষয়ে কিছু বলার নেই। সূত্র: শীর্ষ নিউজ