বৃহস্পতিবার ১৬ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

আপনি যদি একজন সৎ ও যর্থাথ রাজনীতিবীদকে জানতে চান…

আপডেটঃ ১২:৩৪ অপরাহ্ণ | মে ০৭, ২০১৭

এম.এস.আই জুয়েল পাঠান: আপনি যদি একজন সৎ ও যর্থাথ রাজনীতিবীদকে জানতে চান, যিনি একাধারে ছিলেন সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাহলে আপনাকে যেতে হবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের হায়দারাবাদ গ্রামে। তিনি আমাদের খুব জনপ্রিয় শিক্ষক আহ্সান উল্লাহ মাষ্টার ছাড়া আর কেউ নন। নিলোর্ভ, নিঃস্বার্থ, পরোপকারি আদর্শিক মানুষটি এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব নিয়েই বেঁচে আছেন মানুষের মাঝে। এক কথায় তিনি ছিলেন অনুকরনীয়, আদর্শিক রাজনীতি বীদদের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার নাম এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে লেখা থাকবে স্বর্নাক্ষরে। মৃত্যুতেও অমলিন তিনি, চির জাগরুক তার আদর্শ।
    স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিক নেতা ও শিক্ষক আহসান উল্লাহ মাষ্টারের ৭ মে ২০১৭ইং ১৩ তম মহান প্রয়ান দিবস। প্রান পুরুষের মহান প্রায়ান দিবসে জানাই প্রানঢালা ভালবাসা আর হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী। ভাওয়ালবীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার গাজীপুর-২ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুই বার নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় ও আন্তজার্তিক পর্যায়ের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। ৭মে ২০০৪ তৎকালীন সরকারী দল বিএনপি মৈত্রীবদ্ধ হয়ে একদল সন্ত্রাসীকে পৃষ্ঠ পোষকতা ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নোয়াগাঁও এম.এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলের মাঠে। আমাদের ভাওয়াল বীর আহ্সান উল্লাহ মাষ্টার নিহত হন। ২০০৫ সালের ১৬ই এপ্রিল দ্রুত ট্রাইবুন্যাল আহসান উল্লাহ মাষ্টারের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করার ঘোষনা দেন। মোট ২২ জন ঘাতক যার মধ্যে বিএনপির ছত্র ছায়ায় থাকা নুরুল ইসলাম সরকার, যিনি তাঁকে হত্যার হুকুমের প্রধান আসামী। ইতিমধ্যে ৬জন কারাবাসেআছেন বাকী ১৬ জন অপরাধী সাব্যস্ত করে দেশের বিভিন্ন কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে পারিয়ে বেরাচ্ছে যেমন ভারত। গত কয়েক বছর আগে একজন ঘাতক জেলে কার্ডিয়াক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

    এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫০ সালে ৯ই নভেম্বর স্যার আহসান উল্লাহ মাষ্টার হায়দ্রাবাদ গ্রামে টিনসেটের কুঁড়ের ঘরে জন্ম গ্রহন করেন। তার মত সহজ সরল আর সাধারণ জীবন যাপন করা একজন শিক্ষক বিশ্বের দরবারে বিরল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তাধারার মানুষ শহিদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার শতভাগ তৃনমূল নেতা ছিলেন। তার সততা ও আদর্শের জন্য তিনি নেতৃত্বের শীর্ষে পৌছেছিলেন। তিনি আব্দুল কাদের পাঠান ও বেগম রুশমাতুন নেছার সন্তান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দুই পুত্র ও এক  কন্যার জনক। এই জননেতা ১৯৬৫ সালে টঙ্গী হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করে ভর্তি হন তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজে। পরবর্তীতে যেটি সোহরাওয়ার্দী কলেজ নামে পরিচিত হন। এখানেই নিজেকে রাজনীতির সঙ্গে ওৎপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ফেলেন। ছয়দফা নিয়ে রাজপথ যখন উত্তপ্ত ঠিক তখন রাজপথের একজন লড়াকু সৈনিক ছিলেন আহসান উল্লাহ। আর এখান থেকেই তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন সক্রিয় রাজনীতিক। যুক্তহন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। কাজ করতে থাকেন একজন নিবেদিত প্রান রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে। এরপর ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১ সালের ৪ মার্চ টঙ্গী ও ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এই নেতা। পরবর্তীতে ভারতের তান্দুয়া থেকে শেখ মনিরের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধে প্রশিক্ষন নেন। তিনি মনে প্রানে বিশ্বাস করতেন মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই সমাজ থেকে চিরতরে দূর হয়ে যাবে অন্যায়, অবিচার অনাচার। শিক্ষার কারনে বদলে যাবে মানুষের ভাগ্য। ১৯৬৯ সাল থেকে গাজীপুরের টঙ্গীর রেলষ্টেশনের সঙ্গে এম.এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে জীবনের ২৫টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের অনুরোধেই পূবাইল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ১৯৮৩ ও ১৯৮৯ সালে পরপর দুই দফায় নির্বাচন করে বিজয়ী হন। এছাড়া টঙ্গী থানা শিক্ষক সমিতির সাবেক আহবায়ক, টঙ্গী নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির আহবায়াক ও বাংলাদেশ উপজেলা চেয়ারম্যান সমিতির আহবায়ক ছিলেন। ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদে নির্বাচন করেন আহসান উল্লাহ মাষ্টার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। কাজ করার বড় পরিসর পেয়ে আহসান উল্লাহ মাষ্টার মানুষের সেবায় নিজেকে আতœনিয়োগ করেন আরো বেশি করে। একজন ভালো মনের মানুষ আদর্শবান একজন সত্যিকার নেতা, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে তাদের একজন কাছের মানুষ, শ্রমিকের বন্ধু হিসেবে আহসান উল্লাহ মাষ্টারের সুনাম ছড়িয়ে পরে গোটা গাজীপুর সহ বাংলাদেশে। আর শ্রমিক নেতা হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন সারাদেশের শ্রমিকদের অকৃতিম বন্ধু। শ্রমিকদের ভালবাসতেই তিনি জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পলন করেন।

    এই রাজনীতি বীদ ১৯৯৬ সালে প্রথম বারের মতো গাজীপুর- ২ (গাজীপুর সদর, টঙ্গী) নিবাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে সারাদেশে যখন আওয়ামী লীগের মহা বিপর্যায় তখনও আহসান উল্লাহ মাষ্টার বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। জাতীয় সংসদের একজন সম্মানিত সদস্য হয়েও তিনি ছিলেন একেবারেই নিরহংকারী, নির্লোভ, নি:স্বার্থ একজন নেতা, সংসদে দাড়িয়ে কথা বলেছেন নিজের এলাকার মানুষের স্বার্থে।
    এই নির্মম হত্যাকান্ডে আহসান উল্লাহ মাষ্টারের ছোট ভাই মতিউর রহমান মতি বাদী হয়ে টঙ্গী থানায় ১৭ জনকে আসামী করে ৮মে মামলা দায়ের করেন। হত্যাকান্ডের পর যে মামলা দায়ের করা হয় তাতে যাদের আসামি করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকার। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আহসান উল্লাকে সরিয়ে দিয়ে গাজীপুরের রাজনীতিতে প্রকৃত রাজত্ব কয়েম করবেন। তার সঙ্গে আসামি করা হয় নুরুল ইসলাম দিপু, শহীদুল ইসলাম শিপু, ওয়াহিদুল ইসলাম টিপু,  কানা হাফিজ, আনোয়ার হোসেন আনু, ফয়সাল, সোহাগ, বুলু মিয়া, আল-আমিন, বড় রতন, রনি, সোহেল, সৈয়দ আহম্মেদ, মাহবুব, মনির দুলাল, জাহাঙ্গীর, ছোট রতন, খোকন, কালাম, মশিউর রহমান মশু, বড় জাহাঙ্গীর, আমির আমিরের ভাই জাহাঙ্গীর গংকে। এই মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যাল-১, ঢাকার বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন যে রায় দিয়েছিলেন তাকে তিনি আসামি নুরুল ইসলাম সরকারকে দায়ী করে বলেছেন তিনি বিভিন্ন করনে আহসান উল্লাহ মাষ্টারের ওপর হিংসা পরায়ন হয়ে উঠেছিলেন, এই মামলায় আসামি নুরুল ইসলাম সরকার সহ আসামি নুরুল ইসলাম দিপু, মোহাম্মাদ আলী, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, সৈয়দ আহমেদ মঞ্জু, জাহাঙ্গীর ওরফে বড় জাহাঙ্গীর সহ আরো ১১ জনকে বৃত্যুদন্ড দেন। এছাড়া চা ল্যকর এই মামলার অপর আসামিদের যাবৎজীবন কারাদন্ড সহ বিভিন্ন মেয়াদে দন্ড দেন। ২০০৫ সালের ১৩ এপ্রিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার হত্যার রায় প্রধান করা হয়। হত্যা মামলায় প্রধাণ  আসামি নুরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে ডাবল ফাসি ও ৬ জনকে যাবৎজীবন কারাদন্ড দেয় আদালত।
    গরীব-দুখীদেরই একজন হয়ে সাধারন মানুষের সমাজেও তিনি অকৃত্রিমভাবে মেলামেশা করতে পারতেন। তাকে সবাই স্যার বলে সম্বোধন করতেন, বিপন্ন অভাবগ্রস্থ মানুষের জন্য তার সি ত ছিল সীমাহীন সহানুভূতি ও দরদ। আন্দোলনে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেই মামলার আইনি লড়াইয়ের জন্য আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ বহুবিধ কর্মযঙ্গের সঙ্গে সহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার সর্বদাই কর্মব্যস্ত থাকতেন। ঢাকা, টঙ্গী, গাজীপুর নারায়নগঞ্জ, চট্রগ্রাম, খুলনা সহ বিভিন্ন স্থানে নির্যাচিত ও ভোগন্তির শিকার শ্রমিকদের জন্য মামলা বিষয়ক আইনি লড়াইয়ের জন্য ছুটে যেতেন। অসাধারণ বন্ধু প্রীতি ও অনুগত জনের প্রতি গভীর সৌহার্দ্য ও অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল সহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টারের অন্যতম গুন। যাকে একবার তিনি বন্ধু বলে গ্রহন করতেন তার জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকার তিনি সর্বক্ষন প্রস্তুত ছিলেন যাদের তিনি অনুগত প্রিয়জন বলে মনে করতেন তাদের কল্যান সাধনের জন্য তার আগ্রহের অন্ত ছিলনা। অন্যদিকে জনসাধারণ হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে যারা নেতৃত্ব করতে চাইতেন, শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার সেই দলের ছিলেনা। তিনি ছিলেন জনসাধারণের একজন আপনার লোক, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং দরদী নেতা। আতিœক অনুভূতির সাহয্যে মেহনতি শ্রমজিবী মানুষের হাসি কান্না, সুখ-দুঃখ, চাওয়া পাওয়া ও আশা- আকাঙ্খার কথা তিনি নিখুৎভাবে অনুধাবন করতে পারতেন।
    তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আর্দশ বাস্তবায়নের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তা ধারার জীবন জোয়ার সৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে চেতনা আদর্শকে সুসংহত করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে তিনি ছিলেন একজন সৎ আদর্শবান রাজনীতিক দক্ষ কর্মী। তিনি ছিলেন একজন দেশ ভক্ত শ্রমিক এবং জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সোনার বাংলা বিনির্মাণ ছিল তার একমাত্র লক্ষ কিছু কিছু মানুষ আছে তাদের মৃত্যু নেই এরকমই মানুষ হচ্ছেন আহসান উল্লাহ মাষ্টার যিনি সবার হৃদয়কে করেছিলেন হ্যামিলনের বাঁশিরওয়ালার মত যার বাঁশির সুরে গাজীপুরের মানুষ ছুটেছিল তার সঙ্গে, যিনি উন্নয়নের বাহিরে আর কিছু ভাবতেন না। নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষকে ঘিরে ছিল যার সমস্ত চিন্তা ভাবনা অন্যায়ে বিরুদ্ধে যিনি ছিলেন সোচ্চার কন্ঠ, তার এমন অনাকাঙ্খিত ও অসময়ে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি গাজীপুর বাসী। তার অভাব আজও পূরণ হয়নি। তবে তিনি বেচে আছেন মানুষের হৃদয়ে বেচে থাকবে আজীবন যতদিন থাকবে পৃথিবী। তার কর্মই তাকে এমন বিশাল জায়গা করে দিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। অতএব কখনোই আহসান উল্লাহ মাষ্টারের মৃত্যু নেই তিনি আছেন। প্রতিটি প্রাণে, প্রতিটি স্পন্ধনে।
লেখক,সাংবাদিক ও কলামিষ্ট