| |

Ad

ব্যাংককের কিছু স্মৃতি :“মন ঘনিয়ে আসে” অসমাপ্ত কথা-

আপডেটঃ ৩:৫২ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ১১, ২০১৭

শেখ আব্দুস সালাম : আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখলাম আকাশ অন্ধকার। দুদিন ধরে আবহাওয়া অফিস বার্তা দিচ্ছে অক্টোবরে দুটো বড়ো ধরনের ঝড় দেশের ওপর আঘাত হানতে পারে। আকাশের এমন অবস্থা দেখে মনও অন্ধকারে ঘনিয়ে আসছে। এরই মধ্যে নানা কথা মনে পড়ে গেলো ।

১। পূজোর ছুটিতে ব্যাংককে গিয়েছিলাম। মাত্র ক’দিন হলো দেশে ফিরেছি। চিকিৎসা ও বেড়ানো দুটোই উদ্দেশ্য ছিলো। ব্যাংককের চিকিৎসায় স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি হচ্ছে। এর বেশি আর কী-ই বা লেখার আছে? তারপরও কিছু ঘটনা, কিছু স্মৃতি মনে উঁকি দিয়ে ব্যাংককের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। আগের দিন ডাক্তার কিছু পরিক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিলেন। পরের দিন খালি পেটে ব্লাড টেস্টের জন্য Bumrngrad International Hospital এ গেলাম। পরিক্ষাগারে রক্ত দেয়া হলো। পরের দিন বিকাল ৩.২০ মিনিটে টেস্টের রিপোর্টসহ ডাক্তারের সাথে পূন:সাক্ষাৎকারের সময় ধার্য করা ছিলো। ঐ দিনের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাতে সময় ছিলো। তিনজনে হোটেল কক্ষে পরামর্শ করলাম শহরের কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসা যাক। আমি  প্রস্তাব করলাম ব্যাংকক ন্যাশনাল মিউজিয়ামে যাওয়ার। ওরা রাজি হলো। হোটেল কক্ষ থেকে নীচে নামলাম। Ambassador হোটেলের সামনে রাস্তায় অনেক গাড়ি পার্কিং করা আছে। গাড়ির ক্যাপ্টেনরা (ড্রাইভার) ২/৩ জন এগিয়ে এলো। মিউজিয়ামের কথা জিজ্ঞেস করায় তারা জায়াটা চেনে না বললো। আমি কষ্ট পেলাম, আশ্চর্যান্বিত হলাম। ক্যাপ্টেনরা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করেও মিউজিয়ামের ঠিকানা চিনতে পারলো না। এমন সময় একজন ক্যাপ্টেন জেমস গ্যালারিতে যাওয়ার অনুরোধ করলো। দুটো মার্কেট সহ জেমস গ্যালারি ঘুরিয়ে আনতে মাত্র পঞ্চাশ বাথ (থাই মুদ্রা) চাইলো। এতো সস্তায় যাতায়াত হবে ভেবে জেমস গ্যালারিতে যাবার জন্য তিনজনে গাড়িতে চড়ে বসলাম। ব্যাংকক শহরের রাস্তাঘাট ছিমছাম, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। অনেক রাস্তা, অনেক ফ্লাইওভার থাকার পরও রাস্তায় প্রচুর ট্র্যাফিক জ্যাম। ঘন্টার পর ঘন্টা ঢাকা শহরের ট্র্যাফিক জ্যাম চোখে ভেসে উঠলো। পৃথিবীর সব বড় শহরেই জ্যাম থাকে। এটা তারই চিত্র। ঢাকার রাস্তায় ফ্লাইওভার কম। এখানে তো চওড়া রাস্তা, ফ্লাইওভারের অভাব নেই। তাহলে ব্যাংককে এতো জ্যামের কারণ সে দেশের কর্তৃপক্ষই বলতে পারবেন। এসব ভাবনার মধ্যেই গাড়ি সামনে চলতেছিলো।

চল্লিশ মিনিট পর একটি ফ্লাইওভারের ওপর গাড়ী চলতে থাকা অবস্থায় বিশাল সুরম্য অট্রালিকার মাঝখানে ফ্লাইওভারের নীচে একটি বস্তি দেখে বিস্মিত হলাম । এতো ভালো শহর, রাস্তা-ঘাট, ফ্লাইওভার, দালান-কোঠা তারই মাঝে জরাজীর্ণ টিনের ছোট ছোট ঘর  না দেখলে অবিশ্বাস্য মনে হবে। চিন্তায় ধাক্কা খেলাম। এটা কীসের লক্ষণ? সাম্য না বৈষম্যের? ব্যাংকক তো এখন বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের বেড়ানোর সহজলভ্য স্থান। অর্থনৈতিকভাবেও দেশটি আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত । তারমধ্যে এতো বৈষম্য কেনো? ড্রাইভারকে এলাকার নাম জিজ্ঞেস করাতে সে বললো এটা মেকং এলাকা । আমি ভাবলাম এ বৈষম্যর শেষ কোথায়? তখনই রোহিঙ্গাদের কথা মনে পড়ে গেলো। মনে পড়ে গেলো উত্তরা মডেল টাউনের পব পাশ ঘেষে রেললাইনের দু’দাড়ে ঘেঞ্জি অবস্থার বস্তিবাসীর কথা। কোনো বিদেশি কোনো দিন হয়তো ট্রেনে চড়ে বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণ যে দিকেই যাবেন তার চোখে পড়বে আধুনিক শহরে বস্তিবাসীর ঘরদুয়ার। ব্যাংকক ঘুরতে এসে আমার মনে যে খটকা লেগেছে তার মনেও এমনই হতে পারে। ব্যাংককের এ অবস্থা আমার কাছে যেমন দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে ঐ বিদেশির মনের অবস্থা তখন কী হবে কে জানে? সোনার বাংলা সম্পর্কে কী ধারণা করবে কে তার খবর নেবে?

২। দেখতে দেখতে ঘণ্টা দুয়েক পরে জেমস গ্যালারীতে চলে এলাম। ভেতরে  ঢুকতেই ওয়েলকাম ড্রিংকস। অরেঞ্জ ড্রিংকস হাতে নিয়ে পুরো গ্যালারী ঘুরে দেখে আমার মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা। এতো স্বর্ণ এতো সুন্দর ভাবে সাজানো যা দেখলে চোখে ধা-ধা লেগে যায়। মনে হলো আরব্য উপন্যাসের চিচিং ফাকের কক্ষে ঢুকেছি। গ্যালারি দেখার পর বাইরে বসার চমৎকার ব্যবস্থা। বাগান, ফুল তার ওপর চা-কফিরও ব্যবস্থা আছে। খোলা স্পেস। আমি চা নিলাম। জায়গাটা সুন্দর হওয়াতে হিম ছবি তুলছিলো। আমার কাধের একসাইটে ট্যুরিস্ট ব্যাগ ঝোলানো। ওটা সহ হিম একটি ছবি তুলে নিলো। আমি রসিকতা করে বললাম আমার কাধে ব্যাগ সহ ছবি নিয়েছো। আমি  কি বাসের কন্ডাক্টর ? দাড়িয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগটা চেয়ারে রেখে ছবি ওঠালাম। তারপর ভুল  করে ব্যাগ ওখানেই রেখে এলাম । গাড়ীতে অর্ধেক পথ আসার পর হঠাৎ ব্যাগের কথা মনে হলো। ব্যাগ নেই । ড্রাইভারকে গাড়ী ঘুরিয়ে আবার জেমস গ্যালারিতে যেতে বললাম। ড্রাইভার ইংরেজী বোঝে। বাংলা বোঝে না। ড্রাইভারকে ইংরেজিতে বললাম জেমস গ্যালারীর লোকদের সাথে কথা বলতে। সে কথা বললো থাই ভাষায়। এমনতি টেনশন আবার ভাষা না বোঝার কারণে টেনশনের মাত্রা আরও বেড়ে গেলো। আমরা তিন জন বাংলায় বিশ্লেষণ শুরু করলাম। যদি ড্রাইভার বাংলাদেশের ড্রাইভারদের মতো ক্যাশেনিযুক্ত লোককে বলে থাকে ব্যাগটা পেয়েছো এটা স্বীকার না করে চলো ব্যাগের মুদ্রা ভাগাভাগি করে নিই। ফিরার পথে গাড়ি কত দূর কতো সামনে চলে গিয়েছিল তা টেরই পাইনি। এখন ব্যাগ রেখে আসার স্থানে যাবার পথ ফুরোচ্ছে না। দু:সময়ের পথ ফুরোয় না। পথে যেতে যেতে নানা কথা মনে এসে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। মনে পড়ে গেলো মালয়েশিয়ার ফাষ্ট ফুড খাবার টেবিলে জনবহুল স্থানে মোবাইল রেখে এসে চল্লিশ মিনিট পরে যথাস্থানে মোবাইল পাওয়ার ঘটনা। সিংগাপুরে McDonal খাবার রেস্তোরায় ব্যাগ ফেলে চলে যাবার সময়ে দুই ইউরোপীয়ের ইংরেজি চিৎকার। মনের  ভুলে আমার ব্যাগ খাবার টেবিলে ফেলে চলে আসতেছিলাম। দুই ইংরেজ ভদ্রলোক আমাকে পেছন থেকে ডাকাডাকি শুরু করলো। আমি ভেবেছিলাম ওটা হয়তো তাদের ব্যক্তিগত বাকবিতন্ডা । কিন্তু আমার একেবারে  কাছে এসে কাকুতি মিনতি করে  যখন আমাকে বললো sir, your bag, please take this.” তখন আমার হুশ হলো। ভুল করে ব্যাগ ফেলে এসেছি আমি আর তার জন্য তারা তাদের  নিজেদেরকে অপরাধীর মতো আমার কাছে উপস্থাপন করে ব্যাগ ফিরিয়ে দিয়ে আত্মতৃপ্তি পেলো। আমার আগেই আমাকে Thank you বলে বিদায় নিলো। আমি আজও সে কথাগুলো ভুলিনি। ভুলতে পারবোনা সারা জীবনেও। ঐ দুটো ঘটনাই আমাকে পীড়া দেয়। ওরা যেটা পারে আমরা তা পারি না কেনো?

এতো চিন্তা-দুশ্চিন্তার পরও পথ শেষ হচ্ছে  না। মনিরা বলতে শুরু করলো ব্যাগ না রাখার জন্য কতো নিষেধ করেছি শুনোনি। আরো বললো তুমি মনভুলা, উদাস। ব্যাগটা আমার কাছে দিলে কী হতো ? হিমও তাই বললো। আমি নীরব। উৎকণ্ঠায়  উদ্বিগ্ন । তার ওপর ওসব কথা মনে নানা কথা জাগিয়ে দিলো। বিদেশ যাবার আগে প্রতিবারই ওরা আমার টাকা পয়সা, কাগজপত্র, পাসপোর্ট, এয়ারটিকেট ওদের কাছে বিশেষ করে আমার স্ত্রীর কাছে দিতে বলে। আমি শুধু পাসপোর্ট আর এয়ারটিকেট দিই। অন্যসবই নিজের কাছে রাখি । বিশেষ করে অর্থসমেত ব্যাগ দেয়াটা আমার  কাছে অধিকার ত্যাগের মতো মনে হয়। নিজের অর্থ ব্যাগে পুরে নিজের কাছে রাখলে স্বাধীন স্বাধীন মনে হয়। ব্যক্তিগত অধিকার-স্বাধীনতা কে-ই বা হারাতে চায়? যতোবার ব্যাগ বা অন্য কিছু দেশে বা বিদেশে মনের ভুলে ফেলে এসেছি দেশের দু’একটি ঘটনা বাদ দিলে বিদেশের সবগুলোই ফেরৎ পেয়েছি। ছেলেবেলা হতে আমার এ রকম ভুল হওয়ার শুরু। অনেক দরকারী জিনিসই মনের ভুলে যেখানে সেখানে ফেলে আসতাম। পরে মনে হলে ছটফট করতাম। মা তখন নানা ভাবে শান্তনা দিতেন। গাড়িতে বসে মাকে খুব মনে পড়লো। মা বলতেন, “বাবা হক্কের মাল দরিয়ায় ও গছে না।” আমি মায়ের কথাটি প্রতিবারই বলেছি, কিছুটা সাহস, কিছুটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এবারও ওদেরকে তাই বললাম। মুখে  বললেও মনে মনে ভাবলাম আমি তো কোনো অলি-আব্দাল-পীর-ফকির না। ব্যাগ না পেলে আমার সাধুতা, সৎভাবে অর্থ উপার্জনের এতো দিন যে কথা স্ত্রী ও মেয়েকে শুনিয়েছি তার সবই ভেস্তে যাবে। প্রমাণ হবে আমার এতো দিনের ওসব শুনানো কথা সবই মিথ্যে। এটা ভেবে ভেঙ্গে পড়লাম। চেহারা আর অস্থিরতা দেখে মেয়েটা বুঝলো। ও বললো আব্বু টেনশন একেবারে বাদ দিন। আপনার ব্যাগ পাব ইনশাল্লাহ্। আমি কোনো কথা বললাম না। মেয়েটা আরো প্রবোধ দিয়ে বললো আপনি হার্টের পেশেন্ট। কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না। ব্যাগ পাওয়া যাবে। এমন সময় গাড়ি জেমস গ্যালারীর গেটে এসে থামলো। ড্রাইভার  সহ আমার মেয়েকে নিয়ে কাউন্টারে গেলাম। দেখে মনে হলো ওরা কাউন্টারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ড্রাইভার ওদের পরিচিত। ড্রাইভারের সাথে আমাদেরকে দেখে ব্যাগটা দিয়ে হাসি মুখে আমার আগেই Thank you বললো। ড্রাইভার বার বার বলতেছিলো sir, please cheek your ব্যাগ। আমি প্রয়োজন বোধ করলাম না। হিমালয় বিজয়ের আনন্দ নিয়ে আমি আনন্দের প্লাবনে ভাসতেছিলাম। ব্যাগে টাকার চেয়েও মূল্যবান ছিলো চিকিৎসা পত্র, মোবাইল সেট। হারিয়ে পাবার আনন্দ তখন আমার কাছে রাজ্যোদ্ধারের চেয়েও শতগুন বেশি। কারণ ঐ ব্যাগই আমার কাছে  রাজ্যের চেয়ে দামি। ব্যাগ ফিরে পেয়ে আবার অন্যা চিন্তা এসে গেল। বাংলাদেশে এমন ব্যাগ রেখে এলে কী হতো ? আমরা (ব্যতিক্রম ছাড়া) বিদেশিদের ব্যাগ ফেরত দেয়া তো দূরের কথা, প্রাণান্ত চেষ্টা করি কীভাবে ওদের ঠকানো যায়। আমাদের স্বভাব বদলাবে কবে…….. ?

---

লেখক : শেখ আব্দুস সালাম

প্রধান শিক্ষক

শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়

টঙ্গী, গাজীপুর।

মোবাইল নং ০১৮৫৬৪৭০০৫০

ইমেইল-sshs.tongi@yahoo.com