| |

Ad

নড়বড়ে এবতেদায়ী নড়বড়ে চাকরী ভাগ্যের চাকায় ঝুঁলছে হালুয়াঘাটে দেড়শতাধিক এবতেদায়ী শিক্ষকের জীবন

আপডেটঃ ১:০০ পূর্বাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

ওমর ফারুক সুমন, হালুয়াঘাটঃসরেজমিন প্রতিবেদন:কথায় আছে যেমন গুর তেমন মিষ্টি। বেতন নেই, ভাতা নেই। সৃষ্টি লগ্ন থেকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা নিয়ে শুরু করেছিলো প্রতিষ্ঠান। হয়তো ভাগ্যের চাকা একদিন ঘুরবে। দুই চার বছর বিনা বেতনে পাঠদান করে এক পর্যায়ে যখন দেখা গেলো গুরও নেই, মিষ্টিও নেই। যার কারনে বুকভরা হতাশা নিয়ে চাকরি ছেড়ে কেউ চলে যান গার্মেন্টে আবার কেউ চলে যান ক্ষেতে খামারে। ঠিক একই অবস্থার কারনে হালুয়াঘাটেও মোট ৩৮ টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার দেড় শতাধিক শিক্ষকের ভাগ্যের চাকায় ঝুঁলে আছে তাদের জীবন।
দীর্ঘ ত্রিশ চল্লিশ বছর পরে যখন এবতেদায়ী শিক্ষকেরা জাতীয়করনের দাবী নিয়ে আন্দোলন মুখী ভূমিকা নিতে শুরু করেছে ঠিক তখনি নড়াচড়া দিয়ে জেগে উঠেছে পুরনো সেই প্রতিষ্ঠান গুলো। হালুয়াঘাটের প্রত্যন্ত অ ল থেকে ঘুরে এসে দেখা যায় প্রতিষ্ঠান গুলোর অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা। ঘর থাকলে নেই পরিমানমতো জায়গা। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় নেই বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া। একদম হযবরল অবস্থা। পুরনো সেই আমলে শুরু হওয়া অনেক এবতেদায়ী মাদ্রাসাতেই চলছে কওমী কার্যক্রম। নাম সর্বস্ব সাইন বোর্ড রয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠানে। চকের কান্দা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, বীর গুছিনা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, পাবিয়াজুড়ি সতন্ত্র এবতেদায়ী, গজারিয়া পাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, উত্তর রাম নগর কণ্যাপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, মোকামিয়া, নোয়া গাঁও কৈলাটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, ফকির পাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, দরাবন্নী স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, পূর্ব কালিয়ানী কান্দা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, কয়রাহাটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, মাদানী নগর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, বাউসা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, পূর্ব নড়াইল স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, বেতকুড়ি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, নগরিয়া পাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, বাঘমার স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, গাবরা খালী স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, ছোটদাস পাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, মনিকূড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, জিগাতলা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, চর গোরকপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, পূর্ব ঘিলাভুই স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, প্রশ্চিম কালিয়ানীকান্দা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, সংড়া বাজার স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, বিষমপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, উত্তর রামনগর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, ইসলামপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, রুস্তমপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, দক্ষিন ঘোষবেড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, বরাক স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, উত্তর মাছাইল স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, ইসলামপুর ও ঘিলাভূই স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, চড়পাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার অবস্থা এতটাই বেহাল যার সাথে জড়িত দেড় শতাধিক শিক্ষক রয়েছে। প্রতিষ্ঠানে জায়গা আর কাগজপত্র সঠিক না থাকলেও কাগজেপত্রে এই সকল শিক্ষকের রয়েছে তাদের নাম। সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াই নিয়োগ নেই অনেকেরই। প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিল। অনেক বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী শূণ্য।
বীরগুছিনা স্বতন্ত্র এবতেদায়ীতে শিক্ষক রয়েছে চারজন যেমন, বিল্লাল হোসেন, আব্দুল আলিম, মাওঃ মাফুজ ও সেলিম। এদের কারো চাকরিই সঠিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। শুরুতে এবতেদায়ী হিসেবে চালু থাকলেও বর্তমানে চলছে কওমী হিসেবে। প্রতিষ্ঠানে নেই জমির বৈধ কাগজপত্র। মামলায় জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি। পরিচালনা কমিটির সদস্য আকিকুল ইসলাম বলেন, এই প্রতিষ্ঠান শুরুতে কওমী ছিলো, পরে এবতেদায়ী হয়। পরে আবার ১০ বৎসর যাবৎ কওমী হিসেবেই চলছে। মোস্তাফিজুর রহমান লিটন বলেন, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোন জায়গা নেই। যেই জমি আছে তা জাল দলিলে করেছে। প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত বিল্লাল হোসেন বলেন, এ বছর ৭ জন শিক্ষার্থী প্রথমিক সমাপনীতে অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের জমির দলিলপত্র সঠিক। বাস্তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সমাপনীতে অংশগ্রহণকৃত শিক্ষার্থী অবৈধ প্রকৃয়ায় অংশ নেয়। এমনিভাবে অপর আরেক প্রতিষ্ঠান কয়রাহাটি মসজিদ সংলগ্ন স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় মাত্র ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। শিক্ষার্থী নেই। কার্যক্রম বন্ধ। এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন, ১২ বৎসর চলার পর বেতন না পাওয়ায় অবশেষে বন্ধ করে দিয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানে কছিম উদ্দিন, কুতুব উদ্দিন, তাছলিমা ও আরমান আলী প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষক দাবী করলেও তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ। চকেরকান্দা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় দাবীকৃত শিক্ষক ফয়জুল ইসলাম, মোজাম্মেল হক, হাছিনা খাতুন ও নুর হোসেন এরা শিক্ষক দাবী করলেও এই প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষার্থী নেই। ধরাবন্নী স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর শিক্ষক সালমা, স্বপ্না, মোবারক ও ফারজানা শিক্ষক দাবী করলেও প্রতিষ্ঠানের জায়গা ও ঘর কিছুই নেই। এর পরেও সভাপতি খলিলুর রহমান দাবী করেন সমাপনীতে তিনজন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পাবিয়াজুড়ি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক আবু সুফিয়ান, আলমগীর, আব্দুল বাতেন ও ছাইফুল ইসলাম সভাপতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে অদ্যাবধি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তা দাবী করলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সঠিক নয়। রুস্তমপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক এনায়েত উল্লাহ, লাবানুন জিনান, রিপা পারভীন ও সাদিকুর রহমান নাম মাত্র কাগজে কলমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী শূণ্য। জিগাতলা স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক সামাদুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম, আবু সাইদ ও শরিফুল ইসলাম এদের কার্যক্রম স্থবির। শিক্ষার্থী নেই। ইসলামপুর ঘিলাভূই স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক রকিবুল, শফিকুল, লুৎফুন্নাহার ও মফিজুল ইসলাম নড়বড়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নাম মাত্র প্রতিষ্ঠানে জড়িয়ে আছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ। ঘিলাভুই স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক খাদিজা, সুমী আক্তার, মোস্তাক ও আমির হোসেন নাম মাত্র তালিকায় রয়েছেন। দক্ষিন ঘোষবেড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক সামাদুল, আঃ সামাদ, ফিরোজ আহমেদ ও আয়েশা খাতুন এরা নতুন করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার জন্যে। শিক্ষার্থী নেই। এছাড়া চালু রয়েছে চারটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী যেমন সুমনিয়াপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, ঝাউ গড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, পাবিয়াজুড়ি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী ও সাতগাছিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও কোন প্রতিষ্ঠানেই স্বীকৃতি নেই। নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ। সাতগাছিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার সভাপতি ওসমান গনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৩ সাল থেকে সমাপনী পরীক্ষায় ছাত্র অংশ গ্রহন করে আসছে। ২০১৭ সালেও ৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তার দাবী প্রতিষ্ঠানটির বেতন না থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সঠিক ভাবে আছে। তিনি বিদ্যালয়টির এমপিও’র দাবী জানান। এছাড়া কৈলাটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর শিক্ষক আলাউদ্দিন সরকার, সজুত খান পাঠান, চরপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর আবুল বাশার, নুরুল আমিন, আবুল কালাম আজাদ, হুমায়ূন কবির খান, কণ্যাপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর আজাহার আলী, আলতাব হোসেন, আব্দুল জব্বার ও দৌলত, গজারিয়াপাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর হায়দার, আলকাছ, মোস্তফা ও জালাল, মোকামিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর ফিরোজ আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, আনিছুর রহমান ও শহিদুল ইসলাম, চরগোরকপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর ফারুক আহমেদ, রুস্তম আলী, বিল্লাল ও রৌশনারা পারভীন এদের চাকরি ও নিয়োগ সবই নরবড়ে। শিক্ষার্থী নেই। জমি থাকলে ঘর নেই। শিক্ষার্থী নেই। ঝাউগড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ীর শিক্ষক ইয়াদ আলী, হারুন, রাজিয়া, লিপা ও ফাতেমা। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। শিক্ষক ইয়াদ আলী জানান, বেতন না থাকায় অনেক কষ্টে প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছেন। এমপিও’র দাবী জানান। এ প্রতিষ্ঠান গুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে হালুয়াঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হারুন উর রশিদ বলেন, যেহেতু সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ কোন বিল বেতন নেই সুতরাং শিক্ষকরা বিনাবেতনে আর কতদিন চাকরি করবে। তাছাড়া এদের সুনির্দিষ্ট কোন নিয়োগ নীতিমালা না থাকায় শিক্ষকরা অস্বচ্ছ অবস্থাতে তাদের নিয়োগ নিতে পারে। তার দাবী একটা সঠিক নীতিমালা চালু হলে এ সমস্ত শিক্ষকদের মাঝখান থেকে বৈধ ও অবৈধ চিহ্নিত করা যাবে। তিনি প্রাথমিক জরিপে পূর্বের তালিকা অনুযায়ী ৩৮ টি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের তালিকা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে প্রেরণ করেছেন তবে সবগুলো চালু নেই বলে জানান।