| |

Ad

সর্বশেষঃ

পাহাড়ে আধিপত্যের লড়াই, ৬ মাসে ঝরল ২২ প্রাণ

আপডেটঃ ৭:১১ অপরাহ্ণ | মে ২৮, ২০১৮

ডেস্ক রিপোর্ট :পার্বত্য রাঙ্গামাটির সবুজ উপত্যকা আজ মৃত্যুপুরী। নব্বই দশকের পর পাহাড়ে এতটা রক্ত আর কখনো ঝরেনি। চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে নিহত হন পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতির দুই শীর্ষ নেতা। যার একজন বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতির প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা। এর মাত্র ২৪ দিনের ব্যবধানে আবারও ঝরল চার প্রাণ।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হিসেবে গত ছয় মাসে আঞ্চলিক রাজনীতির দ্বন্দ্ব ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে অন্তত ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত ৭ জন। স্থানীয়দের দাবি, এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। তবে এসব ঘটনায় আবারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের করল্যাছড়িতে আজ সোমবার (২৮ মে) সকালে তিন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (প্রসিত) কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পরপরই ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (প্রসিত) সংগঠক মাইকেল চাকমা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য জেএসএসকে (সংস্কার) দায়ী করে বলেছেন, আমাদের তিন কর্মীকে আজ (সোমবার) ভোরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। জেএসএসকে (সংস্কার) এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

তবে জেএসএসর (সংস্কার) কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা ঘটনা অস্বীকার করে বলেছেন, এটা তাদের মধ্যকার ঝামেলার কারণে হতে পারে। এ ঘটনার সঙ্গে জেএসএস (সংস্কার) সংযুক্ত নয়।

এর আগে গত ২৩ মে প্রতিপক্ষের গুলিতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সাবেক কর্মী উজ্জ্বল কান্তি চাকমা ওরফে মার্শাল (৫৫) নিহত হন।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর পাহাড়ের বুকে শুরু হয় আরও এক কালো অধ্যায়ের। ওই দিন নানিয়ারচর সতেরমাইল এলাকায় চিরঞ্জীব দোজরপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে বের গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্য অনাধি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫)। হত্যার জন্য ইউপিডিএফ তাদেরই এক সময়ের সামরিক কমান্ডার তপন জ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করা হয়।

একই দিন রাঙ্গামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে (৪৪) গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করা হয়। একই সময়ে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে (৩২) কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কর্মীরা।

তার একদিন পর ৭ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি শহরে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রী ঝর্ণা খীসার বাসায় হামলা করে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। ওই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙায় ইউপিডিএফ কর্মী ও সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে আসছে।

৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফ-এর অন্যতম নেতা মিঠুন চাকমাকে। ইউপিডিএফ ওই হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করেছে। একই দিনেই রাঙ্গামাটি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশাল তঞ্চঙ্গারের ওপর গুলি চালানো হলেও প্রাণে বেঁচে যান। যুবলীগ ওই হামলার জন্য জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করে।

Rangamati-(2)

ঘটনার প্রতিবাদে রাঙ্গামাটিতে সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশের ডাক দেয় জেলা আওয়ামী লীগ। ৩০ জানুয়ারি সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেওয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সুভাষ চাকমা নামের এক ইউপিডিএফ কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি শহরের হরিনাথপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফ কর্মী দিলীপ কুমার চাকমাকে। তিনি ইউপিডিএফের হরিনাথ পাড়ার সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন।

সপ্তাহ দুই নিরব থাকার পর ১১ মার্চ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে নিজ বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফ কর্মী নতুন মনি চাকমাকে। তিনি ইউপিডিএফের প্রসীত বিকাশ খীসা পক্ষের কর্মী ছিলেন। একদিন পর ১৮ মার্চ রাঙ্গামাটির কুতুছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে।

ইউপিডিএফ এ ঘটনার জন্য সংগঠন থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে। তবে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল।

এ ঘটনার রেশ ধরে ১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত হয় ৩ জন। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কর্মী জনি তঞ্চঙ্গ্যাকে (৪০) গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) দুই কর্মী সাধন চাকমা (৩০) ও কালোময় চাকমাকে (২৯) গুলি করে হত্যা করা হয়।

তিনদিন পর ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় সূর্য বিকাশ চাকমা নামে একজন নিহত হয়। তিনিও ইউপিডিএফ-এর দুই অংশের বিরোধের কারণে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়। ওই ঘটনার এ সপ্তাহের মাথায় ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা (৪০) নামের এক ইউপিডিএফ নেতা নিহত হন।

এর মাঝে ৩২ দিন পর ১৯ এপ্রিল মুক্তি দেওয়া হয় ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে।

হামলায় রক্তাক্ত জনপদে রূপ নেওয়া পাহাড়ে সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাটি ঘটে গত ৩ মে। নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ে সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এ সময় তার সাথে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রূপম চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়।

ওই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৪ মে দুপুরে শক্তিমান চাকমার অন্তেস্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, টনক চাকমা এবং গাড়ী চালক সজীব। এ সময় আহত হন আরও ৮ জন।

তার ২৪ দিনের ব্যবধানে আবারও পাহাড়ে ঝরল চার প্রাণ। আজ সোমবার (২৮ মে) সকালে ইউপিডিএফ (প্রসিত) কর্মী সুশীল চাকমা (৪৫), স্মৃতি চাকমা (৫০) এবং অটল চাকমাকে (৪০) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির  বলেন, কে বা কারা সজেকের ঘটনার জন্য দায়ী তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে এ ঘটনাকে পাহাড়ে চলে আসা সংঘাতের অংশই মনে হচ্ছে। পুলিশ ও সেনাবাহীনি ঘটনাস্থলে গিয়েছে। এছাড়া এ মাসের শুরু থেকে চলে আসা আইন-শৃংখলা বাহিনীর অভিযান এখনো চলমান আছে।