| |

Ad

বদরগঞ্জ উপজেলার কৃষি প্রযুক্তির মডেল গ্রাম [ গ্রামের নাম ধনতোলা ]

আপডেটঃ ৪:১৫ অপরাহ্ণ | মে ৩০, ২০১৮

ময়দুল ইসলাম বদরগঞ্জ (রংপুর)প্রতিনিধিঃধনতোলা; রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এ গ্রামের অধিকাংশরাই হতদরিদ্র দিনমজুর শ্রেণির। দু চারজন স্বচ্ছল পরিবার থাকলেও তাদের আয়ের পথ একমাত্র কৃষি। তারা ধন-সম্পদে সমৃদ্ধশালী না হলেও চাষাবাদ নিয়ে সেখানকার নারী-পুরুষরা নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। কৃষি কাজে নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বদলে দিয়েছে ধনতোলার গোটা চিত্র। গ্রামের ৫০ জন কিষান-কিষানীর হাতে সময় উপোযোগি কৃষি প্রযুক্তির নতুন ছোঁয়া লেগেছে। ফসলের রোগবালাই পোকামাকড় দমন করতে সহজ পথ খুঁজে পেয়েছে গ্রামের মানুষ। কৃষকরা কীটনাশক ছাড়াই শিখেছেন চাষাবাদ করতে। কৃষি কাজের ব্যবহারের জন্য কিষান-কিষানীরা ল্যাপটপ, কম্পিউটার ব্যবহার করে তথ্য আদান প্রদান করেন। ব্যবহার জানেন আধুনিক পদ্ধতিতে ধান কাটামাড়াই করতে। এমনকি তাদের কাছে এখন কৃষি শ্রমিক ছাড়াই ধান রোপন ও শস্য বপন করেন নতুন প্রযুক্তির যন্ত্র দিয়ে। প্রতি মাসে প্রায় দুই টন কেঁচো বা ভার্মিস্ট সার উৎপাদন করে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। এতে নারী পুরুষদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। তাই রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের ওই ধনতোলা গ্রাম এখন কৃষি প্রযুক্তির মডেল। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, সমন্বিতভাবে ফসল উৎপাদনসহ নানা কাজে ধনতোলা আইসিএম ক্লাবের সদস্যরা চাষিদের পাশে দাঁড়িয়ে নানা দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। ধান রোপন, কাটা মাড়াই প্যাকেটজাত করাসহ তারা স্বল্পমুল্যে ভাড়া দিচ্ছেন আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। অবহেলিত কৃষকদের জড়ো করে গড়ে তুলেছেন (ইন্টিগ্রেটেড ক্রপ ম্যানেজমেন্ট) আইসিএম ক্লাব। রংপুরের বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, তারাগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলার অন্তত ১০ হাজার কৃষক এখন তাদের অনুসরণ করছে। বিভিন্ন স্থান থেকে চাষিরা দেখতে আসছে তাদের কার্যক্রম। ইতিমধ্যে সাফল্যতার জন্য তারা সরকারি সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন প্রায় ২০ লাখ টাকার আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি। সম্প্রতি ঢাকার খামারবাড়ির কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক ড. মো. নুরুল ইসলাম ও রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীব তাদের সাফল্য দেখে অভিভূত হন। প্রয়োজনীয় কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার দেখে প্রশংসা করেন তারা।

সম্প্রতি তাদের এই ভালো কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ সরকারিভাবে ধনতোলা আইসিএম ক্লাবকে দেওয়া হয়েছে ধান কাটা মাড়াই ও প্যাকেটজাত করার জন্য মিনি ‘কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার’ যন্ত্র। শুধু ধান বা গম মাড়াইয়ের জন্য পেয়েছেন ‘পাওয়ার থেসার’। শুকনো জমিতে দানা জাতীয় শস্য বপন করতে তাদের আছে ‘সিডার’, ধান ও গম কর্তন করার যন্ত্র রিপার ও ধান রোপনের রাইচ ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্র। এছাড়াও ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, জেনারেটর, প্রিন্টার, স্ক্যানার, ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, মডেম, লেমেনেটিং মেশিন, স্পাইরাল মেশিন, সাউন্ড সিসটেমসহ আসবাবপত্র সরকারি অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে পরিচিতি সাধারণ কৃষকরা। কৃষক-কৃষানীরা কৃষি কাজে সময় ও অর্থ সাশ্রয় করতে পারছেন। তারা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে উন্নত মানের বীজ সংরক্ষণ, সুষম মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার ও মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণসহ কৃষি নিয়ে তথ্য আদান প্রদানের পরামর্শ নেন ইন্টারনেটের  মাধ্যমে। কৃষিতে ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তি গ্রামের মানুষকে উজ্জীবিত করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, অবহেলিত কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিতে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন উচ্চ শিক্ষিত দুই যুবক মো. অহেদুল হক ও মো. আব্দুল হান্নান। তারা চাষীদের ভাগ্যের এ পরিবর্তনের জন্য দিন রাত পরিশ্রম করছেন। এতে তারা সহায়তা নিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র’ (এআইসিসি) ও কৃষি তথ্য সেবার’ কর্মকর্তাদের। এআইসিসি’র কর্মীরা মাঠে গিয়ে হাতে কলমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

যেভাবে গড়ে ওঠে ধনতোলা আইসিএম ক্লাব, বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের ধনতোলা আইসিএম ক্লাব। সেখানে কিষান-কিষানীদের জন্য আছে উচ্চ ফলনশীল জাতের চাষাবাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ওই গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে অহিদুল হক (৩৮) ও নুরুল ইসলামের ছেলে আব্দুল হান্নান (৩৬)। তারা ২০০৯ সালে গ্রামের ২৫ জন কৃষক ও ২৫ জন মহিলাকে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সঞ্চয় সমিতি। সপ্তাহে প্রত্যেকের কাছ থেকে সঞ্চয় তোলেন ৫ টাকা করে। ওই সমিতির পথ ধরে ধিরে ধিরে ওপরে ওঠার সিঁড়ি খুঁজে পান তারা। কৃষি নিয়ে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন সমিতির সদস্যরা। তাদের সাহসী উদ্যোগ দেখে সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। গড়ে তোলেন ‘সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা’-আইসিএম ক্লাব। এখন তারা মাঠে বসে ফসলের রোগবালাইসহ নানা সমস্যার সমাধান পান। প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য চাষিদের যে কোন তথ্য সেবা দিচ্ছে ওই সংগঠনের সদস্যরা।

দুই যুবকের গল্প: মো. অহেদুল হক। অর্থনীতিতে এমএ পাশ করে বেকার। হাতে কাজ নেই। কিন্তু থেমে থাকেনি সে। ২০০৯ সালের গ্রামের সাধারন মানুষকে নিয়ে গড়ে তোলেন ধনতোলা সঞ্চয় সমিতি। নিজেদের মধ্যে শুরু করেন সুদমুক্ত ঋণ বিতরণ কার্যক্রম। তাকে সহায়তা করে ওই সংগঠনের সাধারন সম্পাদক আব্দুল হান্নান। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখায়। শ্রম মেধা ও সততার কথা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। দুই যুবকের প্রচেষ্টা দেখে এগিয়ে আসে তৎকালীন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সালাউদ্দিন আহমেদ। তার পরামর্শে ওই সমিতির নাম পরিবর্তন করে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘ধনতোলা আইসিএম’ ক্লাব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৫০ জন নারী পুরুষকে রংপুরে নিয়ে কৃষিতে তথ্য সেবা দেওয়ার ওপর প্রশিক্ষণ দেন। এর পরের গল্পটা স্বপ্নের মত। একেক করে সমিতির সাধারন সদস্যরা কম্পিউটার ও ল্যাপটপ ব্যবহার করতে শিখেছেন।

আইসিএম ক্লাবের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আফরোজা বেগম (৩২) বলেন, স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে এক সময় অভাব দৈণ্যদশায় ছিলাম। সংসার চালানো ছিল কষ্টকর। এখন সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। এআইসিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি ল্যাপটপ ব্যবহার করতে শিখেছি। ফসলের রোগ বালাই পোকা দমনসহ যে কোন সমস্যা হলে তার সমাধান করতে প্রয়োজনে সরকারি কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে ফোন দিয়ে পরামর্শ নেই।

অহেদুল হক বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য অবহেলিত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষি তথ্য সেবা দেওয়া। গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের জড়ো করে নতুন প্রযুক্তির ওপর তথ্যটিত্র প্রদর্শন করি। প্রজেক্টরের মাধ্যমে কৃষকদের উন্নত ফসল চাষাবাদের ওপর প্রশিক্ষণ দেই। ফসল নষ্ট হলে কিভাবে তার সমাধান করা যায় তারও ধারণা দেওয়া হয়। এখন আমাদের ক্লাবের নগদ অর্থ, জমি, কৃষি যন্ত্রপাতিসহ মোট ৪০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবার রহমান বলেন, ধনতোলা আইসিএম ক্লাব এখন এলাকার কৃষকদের কাছে অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত। বদরগঞ্জ উপজেলায় একমাত্র এ সংগঠন থেকে কৃষকদের সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা কৃষি তথ্য সেবা না পাওয়া। সেই ঘাটতি পুরণে তৃণমুলের কৃষকদের বিনামুল্যে দেওয়া হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির সেবা।

ধনতোলা আইসিএম ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে এসে রাজধানীর খামারবাড়ী কৃষি তথ্য সেবা (এআইএস) পরিচালক ড. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকরা এখনও সনাতন পদ্ধতি ব্যবহারে অভ্যস্থ। সেই জায়গায় ধনতোলা আইসিএম ক্লাব কৃষি বিভাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নতুন কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে তারা বদলে ফেলেছে স্থানীয় চাষিদের ভাগ্য। তাদের দেখে সংগঠন ভিত্তিক কৃষির বিস্তার বাড়ছে দিন দিন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে কৃষি শ্রমিকের সংকট রয়েছে। এখন তার সমাধান হয়েছে। যেখানে এক শতক জমির ধান কাটতে ১০০ টাকা লাগে, সেখানে সামান্য খরচে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি।’