মঙ্গলবার ২৪শে জুন, ২০১৯ ইং ১১ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

মাদকাসক্ত যুব সমাজ অনিশ্চিত গন্তব্যে…

আপডেটঃ ১১:৩৯ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ০৫, ২০১৮

 মো. রফিকুল ইসলাম -: –যুগপরম্পরায় ন্যায় ও সত্যের জন্যে সংগ্রাম করে যে জীবন উৎসর্গ করে, নব জীবনের সংগীত রচনার ভার যাদের উপর নির্ভর করে তারা আমাদের গর্বের যুব সমাজ। যারা অসাধারণ সুন্দরের পূজারী, অসাধ্য সাধনের কারিগর তারা আমাদের তরুণ প্রজন্ম। যেখানে প্রতিকারহীন মানবতা বার বার অশ্রু ঝরিয়ে বোবা কান্নায় মুষড়ে পড়ে, সেখানে মন যাদের বিশ্বাসে ভরপুর, যাদের কাঁধে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন, যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না, পুরাতনকে ভেঙে চুরে নতুন কিছু করতে চায় সেই তরুণরা জীর্ণ জাতির বুকে আশার আলো জাগায়। পুরাতনকে পেছনে ফেলে তারা মেতে উঠে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। রাত কিংবা দিন, মরু বা সাগর কোনো কিছুই যাদের কাছে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠে না, ভরা যৌবন তাদেরকে নিয়ে যায় সমস্ত ভয়ঙ্করকে অতিক্রম করে এক সুন্দরের কাছে। দেশ কালকে তারা তুচ্ছ করে শুধু সৃষ্টির জয়গান গেয়ে যায়। এরাই দেশের প্রাণ। এ যুবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলে একটি দেশের চেহারা তারা রাতারাতি পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এ যুব সমাজ আজ সর্বনাশা মাদকের করাল গ্রাসে বিলীন হতে বসেছে।

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য উৎপাদিত না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সব ধরনের চোরাকারবার এবং মাদকদ্রব্য পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দেশে মাদক গ্রহণকারীদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা মতে, বর্তমানে এ সংখ্যা ১ কোটির উপরে। মাদকাসক্তদের মধ্যে আবার শিশু-কিশোর ও নারীর সংখ্যা বেশ উদ্বেগজনক। এর মধ্যে নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে ৪৩ শতাংশই ইয়াবাসেবী। মাদক পাচারের বদৌলতে প্রতিবছর বিদেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ২৬ জুন রোববার মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় দিনটিকে মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

ইয়াবাসহ ৩২ ধরনের মাদক ব্যবহার ঃ দেশে বর্তমানে সর্বগ্রাসী মরণ নেশা, যুব সমাজসহ অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ৩২ ধরনের মাদক সেবন চলছে। এ পর্যরন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামের যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো হচ্ছে হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেডিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন (বুপ্রেনরফিন), টেরাহাইড্রোবানাবিল, এক্সএলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল ও কিটোন। এ ছাড়া ইনোকটিন, সিডাক্সিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ট্যাবলেট, জামবাকসহ ব্যথানাশক ওষুধ কিংবা টিকটিকির লেজ পুড়িয়ে কেউ কেউ নেশা করে থাকে। এসব দ্রব্যের নেশাজনিত চাহিদা থাকায় বেশিরভাগই ভেজাল উৎপাদিত হচ্ছে দেশেই।
মাদকাসক্ত পুরুষ ও যুব সমাজ ঃ আন্তর্জাতিক সংস্থা ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনালের (এফএইচআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা ১ কোটিরও অনেক বেশি। তাদের সমীক্ষা মতে, মাদক গ্রহণকারীদের ১৫ শতাংশের বয়স ২০-এর নিচে, ৬৬ শতাংশ ২০-৩০ বছরের মধ্যে। দেখা গেছে এই ৬৬ শতাংশই হচ্ছে আমাদের গর্বের যুব সমাজ। ১৬ শতাংশ ৩০-৪০ বছর এবং ৪ শতাংশ ৪০ থেকে তদূর্ধ্ব বয়সের। এদের মধ্যে ৪১ শতাংশ ইয়াবা ও ৩৮ শতাংশ গাঁজা সেবন করেন। এছাড়া ৭ শতাংশ হেরোইন, ৫ শতাংশ ইনজেকশন ও বাকিরা অন্য মাদক সেবন করেন। এদের মধ্যে নিজ আগ্রহে ৪২ শতাংশ, বন্ধুদের প্ররোচনায় ৩৭ শতাংশ মাদক গ্রহণ শুরু করেন। অবশিষ্টরা পারিবারিক কলহসহ অন্য কারণে মাদকসক্ত হন। পুরুষ মাদকসেবীদের মধ্যে বিবাহের আগে যৌন সম্পর্কীয় অভিজ্ঞতা নিয়েছেন ৫৩ শতাংশ, একাধিক যৌন সঙ্গী রয়েছে ৩৩ শতাংশের। এদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ কখনো না কখনো গ্রেফতার হয়েছেন।

মাদকাসক্ত নারী : নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ইয়াবা সেবন করেন। যাদের বেশির ভাগই পারিবারিক কলহ ও বন্ধুদের প্ররোচণায় নেশায় আসক্ত হন। অন্যদিকে পুরুষ মাদকাসক্তদের মধ্যে ৪১ শতাংশ ইয়াবা সেবী। এদের বেশি ভাগ নিজের আগ্রহ ও বন্ধুদের প্ররোচণায় মাদকসেবন করেন। নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে পারিবারিক কলহের কারণে ৩৭ শতাংশ, বন্ধুদের প্ররোচনায় ৩৩ শতাংশ মাদক গ্রহণ শুরু করেন। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ নানা কারণে মাদকাসক্ত হন। এদের মধ্যে বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্কীয় অভিজ্ঞতা রয়েছে ২৯ শতাংশের এবং একাধিক যৌন সঙ্গী আছে ২৩ শতাংশ নারী মাদকাসক্তের।
হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার : আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ মাদক আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি দেশি মুদ্রা পাচার হচ্ছে। কিন্তু ফ্যামেলি হেলথ ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যানে বলা হয়, প্রতি বছর ভারত থেকে প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরণের মাদকদ্রব্য দেশে আসে। এরমধ্যে শুধু ফেন্সিডিলই আসে ২২০ কোটি টাকার। শতকরা ৬০ ভাগ মাদকাসক্ত মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে।

বিশেষজ্ঞের অভিমত : ইয়াবাসহ সকল মাদক প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের উপর গুরুত্ব দিয়ে মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা ‘মানস’ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ইয়াবা একটি মারাত্মক নেশা যা সেবনের ফলে মনুষ্যত্ব লোপ পায়। ফলে যে কোন ধরণের কাজ করতে পারে। যা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের সুন্দর শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে মাদকের বিষাক্ত থাবায়। তারা ধীরে ধীরে দুর্ধষ অপরাধীতে পরিণত হচ্ছে। জেলা শহর-শহরতলী এমনকি গ্রামগঞ্জেও দ্রুত বেড়ে চলছে মাদকাসক্ত শিশু-কিশোর। শুধু গাঁজা নয় এইসব শিশুরা বর্তমানে ড্যান্ডিতেও আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বস্তি এলাকার শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: মোহিত কামাল বলেন, সন্তানের প্রতি পারিবারিক অবহেলা আর শিক্ষার যথোপযুক্ত পরিবেশের অভাবে শিশুদের জন্য মাদক ভয়ঙ্কর সমস্যা হয়ে উঠছে। পরিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের কারণে মধ্যবিত্ত ও উচ্চচিত্ত পরিবারের কিশোররাও মাদকাসক্ত হচ্ছে। তারা মাদকদ্রব্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করছে ইয়াবা ট্যাবলেট।
পেশা জীবীদের মধ্যে ডাক্তার, সাংবাদিক, এ্যাডভোকেট এমনকি আমরা যাদের মানুষ গড়ার কারিগড় হিসেবে অ্যাখা দিয়ে আসছি সেই শিক্ষকও রয়েছে মাদকাসক্তের তালিকায়। অনেক পুলিশ মাদক সেবন ও ব্যবসায় জড়িত। বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ.কে এম শহিদুল হক এক মানিকগঞ্জ পুলিশ লাইন্সে বিশেষ কল্যাণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছেনÑ কতিপয় সদস্যদের জন্য পুলিশের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। দেখা যায় অনেক পুলিশ সদস্য মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা অনেকে মাদক সেবন করে। ইতিমধ্যে দু’চারজন ধরাও পড়েছে, চাকরিও চলে গেছে এবং মামলার আসামী হয়েছে। ওই সমস্ত সদস্যদের জন্য পুলিশের সমস্ত অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

 বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন পরিচালিত শাসন ব্যব¯থায় মাদকের বিরুদ্ধে যে র্দুবার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। মাদক নির্মূলে নতুন যে আইন প্রনয়ন করা হয়েছে হচ্ছে সরকারের যুগান্তকারী এক একটি পদক্ষেপ। এই খানে কথা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেশকে সুরক্ষা দেওয়া এবং মাদকাসক্তকে আইনের আওতায় এনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। সেই সাথে সরকারি ভাবে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে জনসচেনতা বৃদ্ধি করতে পারবে। সরকারের এসকল কর্মসূচী পাশাপাশি আমাদের সকলের অবশ্যই আমাদের পরিবারসহ প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবসহ সম্মিলিত ভাবে নিজ নিজ পরিবার থেকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।