মঙ্গলবার ২৪শে জুন, ২০১৯ ইং ১১ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

যেভাবে উত্থ্যান হয় নেত্রকোণা রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট ব্ল্যাকার -এরশাদের

আপডেটঃ ১১:৪৬ অপরাহ্ণ | মে ২৫, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক : নেত্রকোণা: সাম্প্রতিক সময়ের নেত্রকোণার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো, নেত্রকোণা পৌর এলাকার রেলওয়ে কলোনীপাড়ায় পরকীয়ায় বাঁধা দেয়ায় গর্ভবতী নারী খুন। এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত এরশাদ মিয়া ও তার বাহিনীর অনৈতিক কর্মকান্ড আজ নতুন কিছু নয়। যা বাহির থেকে সরাসরি দেখতে গেলে খুব একটা চোখে না পড়লেও ভিতরে ভিতরে তা ছিল সীমাহীন।
 
মূলত এরশাদ নেত্রকোণা রেলওয়ে স্টেশনে একটা চায়ের স্টলের মালিক হলেও রেলওয়ে স্টেশন ও কলোনী এলাকায় তার একক আধিপত্যতা, জুলুম, হুমকী, ধমকী, তার পেটুয়া বাহিনী কর্তৃক মারপিট কলোনীবাসীর ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। ট্রেনের টিকিট ব্ল্যাকিং ছিল তার আয়ের মূল রাস্তা। চায়ের স্টল থেকে রাজনীতিতেও তুলনামুলকভাবে একটু বেশিই এগিয়ে গিয়েছিল সে। এরশাদ একসময়ে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বিএনপি রাজনীতির সাথে। তারপর অবস্থা বুঝে আওয়ামীলীগ দলীয় কিছু নেতার ছত্রছায়ায় এসে তার তেলেস্মাতি দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় নেত্রকোণা পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদবীটাও।
 
নেত্রকোণা পৌর শহরের উত্তর সাতপাই এলাকার বিএডিসি রোডে বাড়ি এই এরশাদের। বয়স আনুমানিক ৩৬ বছর। পিতা কিতাব আলী। তারা তিন ভাই ও এক বোন। সেই সবার থেকে বড়। অপর দুই ভাই আহাদ মিয়া ও সামাদ মিয়াও ব্যবসায়ী। নেত্রকোণা বড় স্টেশনে টং দোকান রয়েছে তাদের। বোন বিবাহিত। স্বামীর বাড়ি পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নে। ব্যক্তিজীবনে এরশাদ তিন সন্তানের জনক। পড়াশোনায় কখনোই ভাল ছিলনা এরশাদ। সাতপাই (৩) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কোন রকমে ৫ম শ্রেণি পাশ করে ১৯৯৪ সালে নেত্রকোণা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় এরশাদ। বছরের মাঝামাঝি সময়েই শারিরিক সমস্যা ও ফাঁকিবাজির কারনে বন্ধ হয় তার পড়াশোনা।
 
পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে রেলক্রসিং বাজারে কাঁচামালের ব্যবসা শুরু করে এরশাদ। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকে এরশাদ স্টেশনের অপর এক ব্যবসায়ীর ছেলে কালামের (খুন হওয়া মহিলার বড় ভাই) সহযোগীতায় নেত্রকোণা রেল স্টেশনে একটি টং দোকান নিয়ে পান/সিগারেটের ব্যবসা দাঁড় করায়। এর বছর দুই এক পর টং দোকানের পাশাপাশি একটা চায়ের দোকান দিয়ে ব্যবসা বাড়ায় এরশাদ। এভাবেই চলতে থাকে তার দিন।
 
দিন যেতে থাকে বাড়তে থাকে এরশাদের ব্যবসার জৌলুসতা। ভাল চায়ের দোকান হিসেবে এরশাদের নাম ডাক ছড়িয়ে পরতে থাকে আশপাশের এলাকাগুলোতে। এই চায়ের আড্ডাকে কেন্দ্র করেই শহরের বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের সাথে আস্তে আস্তে সখ্যতা গড়ে উঠে এরশাদের। সময় যেতে থাকে আর বাড়তে থাকে এরশাদের বিএনপি প্রীতি। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তার বিএনপি দলীয় কোন পদ-পদবী না মিললেও ধীরে ধীরে সে দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডে সক্রিয় হতে থাকে। আর তার এই সক্রিয়তায় জড়ো হতে থাকে নেত্রকোণা রেলওয়ে কলোনী পাড়ার বেশ কিছু অন্ধ (নিরক্ষর) মানুষ। এভাবেই কেটে যায় বিএনপি সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল।
 
২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ। নির্বাচনের পর গঠিত হয় নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের নির্বাচিত কমিটি। সেই কমিটির এক জ্যেষ্ঠ নেতার ব্যক্তিগত চেম্বার ছিল এরশাদের চায়ের দোকান থেকে মাত্র দুইশ গজের ভিতরেই। সেই সুযোগে এরশাদ যাতায়াত বাড়াতে থাকে সেই নেতার চেম্বারে। তখন রেলওয়ে কলোনীপাড়ার সমস্ত বিচার, দরবার পরিচালিত হতে থাকে সেই চেম্বার থেকেই। এসমস্ত বিচার, দরবারের জজের ভূমিকা নেন সেই ছাত্রলীগ নেতা, আর এরশাদ বনে যায় কলোনীপাড়ার নেতা। সুযোগসন্ধানী এরশাদ তার কর্মকান্ড এমনভাবেই পরিচালনা করতে থাকে যে তার সক্রিয়তায় ঢাকা পরে যায় তার বিএনপি প্রীতি। দল পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবর্তন আসে তার চালচলনেও। সেই চেম্বার থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যায় নেত্রকোণা জেলা আওয়ামীলীগের কার্যালয় পর্যন্ত।
 
এভাবে চলতে থাকলেও খুব বেশিদুর আগানোর আগেই ছাত্রলীগের আবার কাউন্সিল চলে আসে এবং পরিবর্তন হয় এরশাদের মাথার উপর থাকা বিশেষ ছায়ার। এবার এরশাদ দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন একই ঘরে থাকা দুই (ছাত্রলীগ ও যুবলীগ) নেতার আশ্রয় প্রশ্রয় পাওয়ার আশায়। একটা সময় সে তা পেয়েও যায়। পেয়ে যায় তার উপরে উঠার সিঁড়ি। নতুন উদ্যমে নতুন নেতার সাথে মিশে শুরু করে নতুন রাজনীতি। এরশাদ ডাক দিলে কয়েকশত মানুষ একসাথে জড়ো হতো তাই জেলার বেশ কিছু নেতা এরশাদের ভান্ডারে থাকা এই মানুষগুলোকে দিয়ে বিভিন্ন স্বার্থ হাসিল করার লক্ষ্যে তাকে শেল্টার দিয়েছেন প্রতিনিয়ত। এদিকে এরশাদের জীবনে আশির্বাদ হয়ে আসে ২০১৩ সালে হাওর এক্সপ্রেস ও ২০১৬ সালে চালু হওয়া মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস নামীয় দুটো রেলগাড়ি।
 
তিন বছরের ব্যবধানে দুটো ট্রেন চালু হওয়ার শুরু থেকেই এরশাদ শুরু করে টিকিট কালোবাজারির ব্যবসা। মোহনগঞ্জ-ঢাকা রুটের এমন কোন ট্রেনযাত্রী বাকী নেই বোধ হয় যিনি এই এরশাদকে চিনেন না। কারণ, স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে টিকিট পাওয়া না গেলেও পাওয়া যেত তার কাছে। বাড়তি টাকা দিলে টিকিট ম্যানেজ করে দেওয়ায় এরশাদ হয়ে উঠে বেশ পটু। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে তার কালো টাকার পরিমান, বাড়তে থাকে অহংকার। যে কলোনীবাসীর সহযোগীতায় এরশাদ চা স্টলের মালিক থেকে নেতা হওয়ার অবস্থানে পৌছে সেই কলোনীবাসীর কাছেই মারাত্মক হুমকীর কারন হয়ে উঠে সে। ধীরে ধীরে এরশাদ নেত্রকোণা রেলওয়ে কলোনীতে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করে।
 
এমতাবস্থায় শেল্টারদাতা সেই সব নেতাদের আনুকুল্যে তার ভাগ্যে মিলে যায় স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেত্রকোণা পৌর শাখার যুগ্ম আহ্বায়কের পদ। এই পদ পাওয়ার পর এরশাদ হয়ে উঠেন অপ্রতিরোধ্য। কলোনীবাসীর কপালে নেমে আসে এরশাদের অন্যায়, অত্যাচারের ভয়াল থাবা। তার অন্যায় অত্যাচারের বর্ননা দিতে গিয়ে কলোনীবাসী জানান, “এরশাদ আমাদের বেশ কয়েকটা পরিবারকে পথে বসাইছে। রেল কলোনীতে যেকোন অনুষ্ঠান করতে গেলে আগে তাকে চাঁদা দিতে হতো। কোন বাচ্চা প্রসব নিলেও সেই পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিতে ছাড়েনি এরশাদ। আমাদের বাড়ি ঘরে থাকা গাছপালাও কেটে নিয়ে গেছে অনেকসময়। আমরা বাঁধা দেয়ার সাহসই পাইনি। যদি কেউ কখনো প্রতিবাদ করছে তাহলে তাকে তার পেটুয়া বাহিনী দিয়ে মারপিট করাতো। এরশাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ একাধিক মামলাও হয়েছে। কিন্তু সেইসব মামলার বাদীদের উপর নেমে আসতো অমানসিক নির্যাতন। তাদের অত্যাচারে বাদী এই রেলওয়ে কলোনী ছেড়ে পালিয়েছে এমন রেকর্ডও রয়েছে। অনেক সময় পুলিশ দিয়ে হয়রানিসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলখাটানোর নজিরও কম না। মিথ্যা ধর্ষণ মামলা দিয়ে মীমাংসার কথা বলে এই রেলওয়ে কলোনী এলাকা থেকে এরশাদ কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আজ এরশাদের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে খুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে এরশাদ বাহিনী। কিন্তু এতদিন আমরা রেলওয়ে কলোনীবাসী মানসিকভাবে খুন হয়েছি প্রতিনিয়ত।
 
দুই-আড়াইমাস আগের কথা। অতি সামন্য একটি বিষয় নিয়ে সাতপাই রেলক্রসিং বাজার সংলগ্ন শাওন নামের এক ছাত্রলীগ নেতার ব্যক্তিগত চেম্বারে হামলা চালায় এরশাদ বাহিনী। ভাংচুর করা হয় জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিসহ চেম্বারটি। এঘটনায় অভিযোগ দায়ের করা হলে রেলক্রসিং বাজারে দরবারে আর ঝগড়া বিবাদ করবে না মর্মে ক্ষমা চেয়ে ঘটনাটি নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় এরশাদ। উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার মাথার উপরে থাকা ছায়াটুকুও হারিয়ে ফেলে সে। হয়ত খানিকটা লজ্জিত হয়ে এবং নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এরশাদকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় সেই যুবলীগ নেতা। আর তাই নতুন ছায়ার সন্ধানে নামে এরশাদ। ছায়া পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দেয় জেলা আওয়ামীলীগের এক নেতার কাছ থেকে। সেই আওয়ামীলীগ নেতার সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক চলতে শুরু হয় এরশাদের। তাই পুরাতন শেল্টার হারিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে সে।এরশাদের করা একের পর এক অন্যায়কে প্রতিহত করতে রেলওয়ে কলোনীবাসী একত্রিত হয়ে জাতীয় শ্রমিক লীগের আওতায় থাকা পৌর শ্রমিক লীগ নামের একটি সংগঠনের কমিটি করে এর কার্যক্রম শুরু করে। অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে কমিটির কার্যক্রম। রেলওয়ে কলোনীর মুষ্টীমেয় কয়েকজন ব্যতিত সবাই এই কমিটির সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে যা মারাত্মক ঈর্ষার জন্ম দেয় এরশাদের মনে।তাদের একাত্মতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ফন্দি আঁটতে থাকে এরশাদ। সুযোগের সন্ধানে নামে সে।
 
অবশেষে তার মনে জন্ম নেয়া প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে রেলওয়ে কলোনীপাড়ার আব্দুস সালামের পরিবার। ১৮/০৫/১৯ তারিখ রাতে হত্যা করা হয় পৌর শ্রমিকলীগের সভাপতি ওহিদ মিয়ার ছোটবোন ও আব্দুস সালামের গর্ভবতী স্ত্রী শাহীনূর (২৬) কে। উক্ত ঘটনায় নেত্রকোণা মডেল থানায় এরশাদ মিয়াসহ বিশজনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাই ওহিদ মিয়া। মামলার বিবরণে জানা যায়, এরশাদ বাহিনীর অন্যতম সদস্য সোহেল মিয়ার সাথে পরকীয়া সম্পর্ক ছিল একই এলাকার এক মহিলার।
 
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সোহেল মিয়া ঐ মহিলার সাথে যখন যৌন সম্পর্কে লিপ্ত ছিল তখন দেখে ফেলেন শাহীনূর এবং বাধা দেন তিনি। এতে ক্ষীপ্ত হয়ে প্রাণনাশের হুমকী ধমকী দিয়ে চলে যায় সোহেল মিয়া। এই ঘটনার জেরে রাত দুইটার দিকে সেহরীহ্ খাওয়ার জন্যে পার্শ¦বর্তী টিউবওয়েলে পানি আনতে গেলে এরশাদের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয় শাহীনুরের উপর। এসময় ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত হয় শাহীনূর। শাহীনূরের আত্মচিৎকারে তার খালাত বোন লাকী আক্তার ছুটে আসলে তাকেও মারপিট করে আহত করে। আহতদেরকে চিকিৎসা দেয়ার জন্যে দ্রুত নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার শাহীনূরকে মৃত ঘোষনা করে।
 
আজ সমস্ত কলোনীবাসী একত্রিত। নেতারাও এসে দেখা করে কথা বলে যাচ্ছেন শাহীনূরের আত্মীয়-স¦জনদের সাথে। ন্যায় বিচার পাইয়ে দেয়ার আশ্বাসও দিচ্ছেন তারা। প্রশাসনও সর্বোচ্চ ভুমিকা রাখার ব্যাপারে আশ্বস্ত করছে বারবার। কিন্তু যাদের যা ক্ষতি হয়ে গেছে তা কি কখনো পুরন হবে? আজ এরশাদ ও তার বাহিনী শাস্তির ভয়ে পলাতক রয়েছে। কলোনীবাসীর উপর নেই কোন অত্যাচার, অন্যায়, অবিচার। তাদের সকলের দাবী, শাহীনূরের খুনীদের ধরে এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার।