মঙ্গলবার ২৪শে জুন, ২০১৯ ইং ১১ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

পেসাপালোয় এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ-নেই প্রচার !

আপডেটঃ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ | মে ২৯, ২০১৯

স্পোর্টস: নদীমাতৃক দেশের মতো এখন ক্রীড়ামোদী বাংলাদেশ। খেলা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণ। তার মধ্যে বেশি অংশ দখল করে আছে ক্রিকেট। তারপরই আছে ফুটবল। বাকি যতটুকু আবেগ থাকে তা অন্যান্য খেলার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। তাই ক্রিকেট ফুটবলের মতো প্রচার অন্য খেলা পায় না। এই দুই খেলা বাদে খুব কম খেলাই আছে যা মানুষ চিনে। আর তাই হারিয়ে যায় কত অর্জন। তেমনই একটা খেলা পেসাপালো। এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়েও কোন বাহবা তো দূরের কথা এমনকি প্রচারও পেলো না বাংলাদেশ পেসাপালো নারী ও পুরুষ দল।

‘পেসাপালো’ আমাদের দেশে একদম নতুন আর অপরিচিত একটি খেলা। তাতে কি নতুন হলেও কয়েকদিন আগে এই খেলায় ৬ বছর ধরে ভারত, ৪ বছর ধরে খেলা নেপালকে হারিয়ে পুরুষ এবং নারী উভয় বিভাগেই এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

মাত্র এক বছরেরও কম সময়ে এই খেলাকে নিজদের আয়ত্বে এনেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিলের ১৯-২০ তারিখে প্রথমবারের মতো জাতীয় লিগও করেছে বাংলাদেশ পেসাপালো অ্যাসোসিয়েশন। এশিয়া কাপ আয়োজনের প্রস্তাবের সুযোগ লুফে নিয়ে নতুন এই খেলায় নিজেদের নাম শক্ত করে খোদাই করে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ ও ১৯ মে বসে এশিয়ান পেসাপালো চ্যাম্পিয়নশিপ।

সিনিয়র পুরুষ ও নারী, জুনিয়র বালক ও বালিকা এবং যুব পুরুষ- এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে হয় প্রতিযোগিতা। সেখানে ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চারটি ক্যাটাগরিতেই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। শুধু যুব পুরুষে নেপালকে হারিয়ে শিরোপা জেতে ভারত।

শিরোপা জয় করলেও, তেমন কোনো স্বীকৃতি মেলেনি খেলোয়াড়দের। ভারত জাতীয় দল হারলেও, মাত্র একটা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তাদের গণমাধ্যম ফলাও করে সংবাদ প্রচার করেছে। কিন্তু এদেশের গণমাধ্যমের চোখ এড়িয়ে গেছে সংবাদটি !


এতে হতাশ হলেও বসে নেই পেসাপালো খেলোয়াড়রা। আসছে নভেম্বরে ভারতের পুনেতে বসবে পেসাপালো বিশ্বকাপের দশম আসর। এরইমধ্যে বিশ্ব আসরের জন্য কোয়ালিফাই করেছে বাংলাদেশ। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে লড়তে নিজেদের তৈরি করছে তুলনামূলক তরুণ বয়সের খেলোয়াড়রা।

এ ব্যাপারে পেসাপালো দলের কোচ ও ক্রীড়া সাংবাদিক মুনাওর আলম নির্ঝর নিজের ফেসবুক ওয়ালে কষ্টের সঙ্গে লেখেন পেসাপোলোতে তার অভিজ্ঞতা ‘যেহেতু আমি সদ্য পেসাপালোর এশিয়া কাপ শেষ করলাম, তাই এটা নিয়ে আমার লেখার মত অনেক গল্প আছে। বেশিরভাগই স্রোতের বিপরীতে লেখা।’

এ ধরণের একটা টুর্নামেন্ট করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন পড়ে। অনেক স্পন্সর থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ বলেই হয়তো এই টুর্নামেন্টে ছিল না কোনো স্পন্সর। কারণ এখানে গ্ল্যামার নেই।

আগে ভাবতাম বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া খেলাগুলো এগিয়ে নিতে স্পন্সরদের অনেক ভূমিকা থাকে। কিন্তু সে ভুল ভেঙেছে। একজন স্পন্সর এই খেলায় বড় পোস্ট না পাওয়ায় এক কর্মকর্তাকে শাসাচ্ছিলেন এই বলে, দেখি টুর্নামেন্ট কিভাবে কর?

যায় হোক, তিনি ভেবেছিলেন অর্থাভাবে টুর্নামেন্টটা হবে না। শেষ পর্যন্ত হয়েছে। বিদেশিদের কোনো সমস্যা হতে দেয়া হয়নি, যাতে দেশের বদনাম হয় সেজন্য। কষ্ট করেছে দেশের ছেলে-মেয়ে। স্পন্সর না থাকায় কিছু খেলোয়াড়কে ডেইলি পাঁচ ঘণ্টা জার্নি করে গিয়ে অনুশীলন করতে হয়েছে। আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয়টা ছিল জুনিয়র দুই দলের জার্সি নিয়ে।

সিনিয়ার দুই দলের জার্সি খেলার আগেই পাওয়া গেছিল। একজন স্পন্সর রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু স্পন্সর নেই তাই খেলার আগের দিনও পাওয়া যাচ্ছিল না জুনিয়ার দুই দলের জার্সি। বিষয়টা খুবই হতাশার এবং কষ্টের।

যারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, তাদের ভাগ্যই এত খারাপ। যাইহোক অ্যাসোসিয়েশনের আগ্রহে শেষ মূহুর্তে এই দুই দলের জন্য শুধু বাংলাদেশের পতাকা লাগানো জার্সির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যেখানে ছিল না কোনো খেলোয়াড়ের নাম কিংবা জার্সি নম্বর। ছেলে-মেয়েগুলা তবুও খেলেছে। আর তারা যেন নিজেদের শান্তনা দিচ্ছিল এই বলে, জার্সির জন্য না দেশের জন্য খেলছি।

এই লেখাটা লেখার কারণ। আমাকে প্রায়ই অনেকে বলে, অমুক স্পন্সরই দেশের ক্রীড়াঙ্গন বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের বলতে ইচ্ছে হয়, তারা তাদের যেটুকুতে স্বার্থ উদ্ধার হয় সেটুকু টিকিয়ে রেখেছেন। অথচ দেশের জন্য তারাই কিছু করছেন না। এর চেয়ে বরং অল্প খেয়ে পাঁচ ঘণ্টা জার্নি করে জার্সির পরোয়া না করে দেশের জন্য খেলা ছেলে-মেয়ে গুলো দেশকে অনেক বেশি কিছু দিচ্ছে। কোটি কোটি টাকা বেতন পাওয়া অনেক গ্ল্যামার্স খেলোয়াড়ের চেয়েও অনেক বেশি।

তিনি তার আরো একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের উদ্দ্যেশে লেখেন, সময় হইছে। কয়েকটা বিষয় ক্লিয়ার করা খুব জরুরি। এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল তিনটি দল। ভারত, বাংলাদেশ আর নেপাল। বাংলাদেশ সিনিয়ার নারী-পুরুষ এবং জুনিয়ার বালক-বালিকাসহ মোট চারটি ক্যাটাগরিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়। আর ভারত হয়েছে শুধু যুব বালক বিভাগে।

সিনিয়ার নারী এবং জুনিয়ার বালিকার ফাইনালেও ছিল রেকর্ড। দুটি ফাইনালেই আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। আর এই দুই ফাইনালের একটিতেও কোনো হোম কিংবা রান করতে পারেনি ভারত। ছেলেদের খেলাতেও আমাদের সিনিয়র এবং জুনিয়র দল ছিল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন।
এবার আসি আমার অর্জনে। একমাত্র কোচ হিসেবে এক টুর্নামেন্টে দুইটা ট্রফি আমার। প্রথমবার কোচ হিসাবেও শিরোপা জয়।
এতকিছু বলার কারণ আছে। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের খেলোয়াড় অফিসিয়াল, অ্যাসোসিয়েশন এমনকি মিডিয়াও তাদেরকে এশিয়া কাপ জয়ী বলে দাবি করে যাচ্ছে লাগাতার। যেখানে ৫ ট্রফিতে তাদের অর্জন মাত্র একটা। যেন তাদের মধ্যে কোন লজ্জাবোধ বা কোন আত্মসম্মানবোধ কিছুই নেই।

বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন দলগুলো এদেশের মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পায়নি- এটা নিয়ে এখন আর আফসোস নেই। তবে এই লেখাটা আমি এদেশের মানুষের জন্য লিখিনি। শুধু লিখলাম, আমাদের সেসব খেলোয়াড়দের জন্য যারা ভারতের আচরণে কষ্ট পাচ্ছে তাদের জন্য। তাদের জানালাম তারা কি অর্জন করেছে। আর বাংলাদেশ দলকে আর একবার আমার পক্ষ থেকে সম্মান জানালাম।

বেসবলের আদলে ব্যাট ও বলের খেলা হলো পেসাপালো। ফিনল্যান্ডের জাতীয় এ খেলাটি ১৯২০ সালে আবিষ্কার করেন লৌরি ‘তাহকো’ পিকালা। এশিয়া মহাদেশে নতুন হলেও, ইউরোপে এটি বহুল প্রচলিত। বিশেষত ফিনল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও নর্ডিক অঞ্চলে নিয়মিত খেলা হয় পেসাপালো।এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, কানাডা ও উত্তর আমেরিকায় এটির যথেষ্ট প্রচলন রয়েছে। এশিয়াতে জাপান ও চীন অনেক আগে থেকেই আয়ত্ব করেছে এ খেলা। ১৯৫২ সালের অলিম্পিকে ডেমেস্ট্রেশন খেলার স্বীকৃতি পায় পেসাপালো।

তিন বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় পেসাপালো বিশ্বকাপ।এক এক দলের চার ইনিংস করে মোট আট ইনিংসে খেলা হয় পেসাপালো। অফেন্সে (ব্যাটিং) ১২ ও ডিফেন্সে (ফিল্ডিং) ৯ জন করে খেলোয়াড় থাকে একটি দলে। বেশি রান করা দল জয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়। বেসবলের সঙ্গে পেসাপালোর প্রধান পার্থক্য হলো উলম্ব পিচিং (বোলিং)। পিচার ব্যাটারের সামনে থেকে পিচিং প্লেটের ওপর টার্গেট করে নীচ হতে উপরের দিকে উলম্ব করে বল নিক্ষেপ করে। ব্যাট দিয়ে বল মেরে দৌড়ে তিনটি বেস ঘুরে রানার (ব্যাটার) নিরাপদে ‘হোম বেসে’ পৌঁছাতে পারলে একটি রান ধরা হয়।