মঙ্গলবার ১৫ই জুলাই, ২০১৯ ইং ১লা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

টিকিট ব্ল্যাকার এরশাদ, এক অন্তহীন কালো কাহিনীর জনক…………

আপডেটঃ ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ | জুন ২৫, ২০১৯

হামিদুর রহমান অভিঃ-নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃনেত্রকোণা রেল স্টেশনের টিকিট ব্ল্যাকার এরশাদ, যার কালো কাহিনী হয়ত বলে শেষ করা যাবে না। যতই খোজ করছি তার অনৈতিক কর্মকান্ডের হিসেবের খতিয়ানটি যেন ততই বড় হচ্ছে। ভেবেছিলাম তাকে নিয়ে আর কিছু লিখব না। কিন্তু তা আর পারলাম না। খোঁজ নিতে গিয়ে যা দেখলাম তাতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়েছে, তা হচ্ছে টিকিট ব্ল্যাকিং করে এরশাদ যতটুকু দুর্নাম কুড়িয়েছে তার চেয়েও অনেক বেশি অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে সে। কিন্তু ঐ অপরাধগুলো নেত্রকোণা রেলওয়ে কলোনীপাড়া এলাকাকে কেন্দ্র করে এবং ঐ এলাকার সাধারণ মানুষের সাথেই করেছে যারা একটা ধমকের পরে আর মাথা তুলে তাকানোর সাহস রাখেনি তাই চাপা পরেছিল এতদিন। এরশাদ ও তার বাহিনীর অন্যায়-অত্যাচারে কলোনীবাসী এতটাই কোনঠাসা হয়ে পরেছিল যে, প্রতিবাদ কি, কিভাবে করতে হয় তাই তারা ভুলে গিয়েছিল। প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি, হুমকি, ধমকি, মারপিট, জোরপূর্বক অন্যায় কাজ করানোসহ এমন কোন বাজে কাজ বাকি নেই যা করেনি এই এরশাদ ও তার বাহিনী।
নেত্রকোণা রেলওয়ে কলোনীপাড়া এলাকায় গত কয়েকদিন ব্যাপক অনুসন্ধান করে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তাতে আমিই বিস্মীত হয়েছি। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ঐ এলাকার ভাল-খারাপ সমস্ত কিছুই পরিচালিত হতো এরশাদের কথায়। তাই প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিটাও লাগতো শতভাগ। অন্যথায় শুরু হতো মারধর, বাজে মেয়ে দিয়ে ফাঁসিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, পুলিশ দিয়ে হয়রানি, হুমকি-ধমকীসহ আরও অনেককিছু। তার এসব অন্যায় কাজে খুব কাছ থেকে শতভাগ সহযোগীতা করতো, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য উসমান মিয়া, শাহীনূর হত্যা মামলার প্রধান আসামী ও জুয়াড়ী সোহেল মিয়া, একসময়ের রিক্সাচালক সুবেল, রং মিস্ত্রী বরুন ওরফে বোরহান, বাবু (১), বাবু (২), মিন্টু মিয়া, সাগর মিয়াসহ আরও অনেকেই। মেয়ে সংক্রান্ত সমস্ত কাজের সহযোগী হিসেবে মিনা আক্তার ও সহুরা দ্বায়িত্বে থাকলেও মোটামুটিভাবে সব ব্যাপারেই প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল তাদের বলে জানায় এলাকাবাসী। এরশাদ ও তার বাহিনীর অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে অঝোর ধারায় কেঁদেছেন বেশ কয়েকজন। বলেছেন তাদের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ।
কথা হয় রেলস্টেশনের চায়ের দোকানদার শওকত মিয়ার ছেলে রাজীব মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, এরশাদ আমার বাবার উপর এই এলাকারই পুতুলী নামক এক মহিলার মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ আনে। আমরা জানতাম আমার বাবা নির্দোষ কিন্তু এরশাদ বাহিনীর ভয়ে এতটাই আতংকিত ছিলাম যে, ঠিকভাবে প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি। এরশাদ এই সুযোগে ঝামেলা শেষ করার নামে হাতিয়ে নেয় ৭৪ হাজার টাকা। এব্যাপারে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় সেই মেয়ের মা পুতুলীর। পুতুলী জানান, এরশাদ আমাকে বাধ্য করছে তাদের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে। নইলে আমাকে ও আমার মেয়েকে প্রানে মেরে ফেলার হুমকী দিয়েছিল। ঘটনা মীমাংসা শেষে তারা আমাকে ২০হাজার টাকা দিলেও কিছুক্ষন পরে আবার তা সুকৌশলে হাতিয়ে নিয়ে যায়। উল্টো চাপে ফেলে আমার কাছ থেকে আদায় করে নেয় আরও ১০ হাজার টাকা।
রেলওয়ে কলোনী এলাকার বাসিন্দা দ্বীগেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথের ছেলে বিজয় দেবনাথ, পেশায় রিক্সাচালক। তার বিরুদ্ধে থাকা মাদক মামলার একটি কাগজ নিয়ে এসে বলেন- এই কাগজটি দেখিয়ে বারবার আমার কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছে এরশাদ, মিনা ও বরুন। সব মিলিয়ে আমি তাদেরকে প্রায় ১লক্ষ টাকা দিয়েছি। যখনই দিতে ব্যর্থ হয়েছি তখনি টানতে হয়েছে জেলের ঘানি। এভাবে অন্তত তিনবার জেলে যেতে হয়েছে আমাকে। আমাকে দিয়ে তারা গাঁজার ব্যবসাও করিয়েছে। ব্যবসার লাভের একটা বড় অংশ নিতো তারা। তারাই গাঁজা সংগ্রহ করে দিতো, আমি বিক্রী করে দিতাম। তাদের কথামত না চললেই জেলে যেতে হত আমাকে। তাই অনেক সময় তাদের অন্যায় আবদার রাখতে গিয়ে এবং আমার জীবন বাঁচানোর স্বার্থে অন্যায় করতে বাধ্য হয়েছি আমি।
একই এলাকার মৃত আব্দুল গফুরের স্ত্রী চায়ের দোকানদার জাহানারা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, চারটি মেয়ে সন্তান রেখে আমার স্বামী মারা গিয়েছেন নয় বছর হলো। এই রেলওয়ে কলোনীতে একটি ছোট চায়ের দোকান করে কোনরকমে সংসার চালাই আমি। আমার একটা মেয়ে একটা ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে কোর্টের মাধ্যমে বিয়ে করে। এই সুযোগ নেয় এরশাদ বাহিনী। তাদেরকে টাকা না দিলে তারা আমার মেয়েকে আমার বাড়ি আসতে দিবে না। মেয়েকে বাড়ি আনতে তাদের অন্যায় আবদার মেনে নিতে বাধ্য হই আমি। ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে আমার মেয়েকে আমার কাছে আসতে দেয় তারা। এখানেই শেষ নয়। তারা বার বার আমার মেয়ে ও জামাইকে এলাকা থেকে বের করে দিবে ও পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে যাবে বলে আদায় করে করে নেয় লক্ষাধিক টাকা। এলাকায় কারো সাথে আমার কখনো ঝগড়া লাগলে দুপক্ষকে দিয়েই মামলা করিয়েছে এরশাদ। পরে মীমাংসায় বসে দুপক্ষের কাছ থেকেই হাতিয়ে নিয়েছে বড় অংকের টাকা।
ভীকচান মিয়ার স্ত্রী কবিতা আক্তার জানান, আমার মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর তার সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। শারিরিকভাবেও লাঞ্ছিত করতো তার শশুর বাড়ির লোকজন। এই বিষয়টি এরশাদ ও মিনাকে বলার পর তারা ডিভোর্স দেয়ার পরামর্শ দেয়। আমিও তাদের কথামত মেয়েকে বাড়ি নিয়ে আসি। সামাজিকভাবে সালিশ ডেকে ৫০হাজার টাকার বিনিময়ে বিয়ের ব্যাপারটি শেষ দেশ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আমার হাতে আসে মাত্র ৩০ হাজার টাকা। বাকী টাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে মিনা জানায় এটা তারা খেয়ে ফেলেছে। তারা আমার টাকা দিয়ে আনন্দ ফুর্তি করছে কিন্তু আমার বৃদ্ধ বাবা টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে।
হাবলু মিয়ার স্ত্রী জহুরা আক্তার বলেন, আমার স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণ মামলা সাজায় এরশাদ বাহিনী। আজ হাজিরা, কাল পুলিশ রিমান্ড, পরশু জামিন এভাবে এক এক সময় হাতিয়ে নেয় বিভিন্ন অংকের টাকা। পরিশেষে মীমাংসার কথা বলে দাবী করে ৫লক্ষ টাকা। কিন্তু এত টাকা দেয়ার মত সামর্থ্য ছিলনা আমার। তাই দফারফা হয় ১লক্ষ টাকায়। আমি আমার স্বামীকে বাঁচানোর জন্যে আমার সর্বস্ব্য বিক্রী করে তাদের হাতে তুলে দেই এই টাকা। এরপর শুরু হয় মামলা উঠিয়ে আনার জন্যে টাকা নেয়া। এভাবে বারবার টাকা দিতে দিতে সবমিলিয়ে তা ২লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কথা হয় এই এলাকার বাদল মিয়ার ছেলে রিক্সাচালক মঞ্জিল মিয়ার সাথে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বাড়িতে থাকা দুটো গাছ কেটে নিয়ে যেতে চায় এরশাদ। বাঁধা দিতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। বাঁধা দেয়ার দিন রাতেই চুরি ও ছিনতাই মামলায় আটক হয় সে। ১৫দিন জেল খেটে মুক্তি পায় সে। জেল থেকে বের হয়ে এসে পুনরায় রিক্সাচালানো শুরু করে সে। দুইদিন যেতে না যেতেই তার কাছে দাবী করা হয় ১০হাজার টাকা। অন্যথায় আবার পুলিশ, আবার জেল। বেচারা ৫হাজার টাকা এরশাদের হাতে পুরে দিয়ে সাময়িকভাবে রেহাই পায় এরশাদের হাত থেকে। এরপর এরশাদ শুরু করে নতুন চাল। মঞ্জিল মিয়াকে বাধ্য করে গাঁজা ও হেরোইনের ব্যবসা করায়। মঞ্জিল মিয়া জানায়, তারাই আমাকে এসব মাদকদ্রব্য এনে দিতো। আমি বিক্রী করে দিতাম। তাদের কথা না শুনলে জেলে যেতে হবে তাই ভয়ে আমি এসব কাজ করছি। আমি এসব কাজ করা অবস্থায় ৪ বার আটক হয়ে দুইবার জেল খাটছি। আর দুইবার ৩০হাজার টাকার বিনিময়ে থানা থেকেই ছাড়িয়ে এনেছে এরশাদ। পরে জানতে পারি, এরশাদই আমাকে আটক করিয়েছে এবং আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আবার আমাকে মুক্তও করিয়েছে। বিনিময়ে তার ব্যবসা হইছে।
রেলওয়ে কলোনীর মোঃ ফরেজ আলী মিয়ার ছেলে সজিব মিয়া জানান, এরশাদ ও তার বাহিনীর একটু আধটু প্রতিবাদ করতাম আমি। ফেইসবুকে তার বিরুদ্ধে একটু লিখেছিলাম। যার জন্যে শাস্তি স্বরুপ আমার বাড়িতে থাকা দুটো গাছ কেটে নিয়ে যায়। আমার ফিসারীর দখল নেয় সে। কয়েকধাপে তাকে টাকা দিয়ে আমার ফিসারী ফেরত নিলেও গাছদুটো ফেরত পাইনি। তাদের হাতে মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছি অনেকবার। তাদের হুমকী ধমকীর শিকার হয়েছি অজ¯্রবার।
এরকম অত্যাচার নির্যাতনের চিত্রের অনুসন্ধানে যতটুকু উঠে এসেছে তা ১০ভাগের এক ভাগও নয়। রেলওয়ে কলোনীপাড়া এলাকার এমন কোন পরিবার নেই যে পরিবারের কোন সদস্য এই বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়নি। আজ এরশাদ শাহীনূর হত্যা মামলায় জেলে। তার বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যও জেলে। অনেকেই আবার পলাতকও। পুলিশ তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্যে জোর চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। এরশাদ ও তার বাহিনী রেলস্টেশন ও কলোনীপাড়ায় শান্তির সুবাতাস বইছে। নেই কোন টিকিট ব্ল্যাকিং। নেই কোন অত্যাচার, অবিচার। নেত্রকোণা রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মোঃ রাফি উদ্দিনও বলেন, এবার ঈদের আগে বা পরে যাত্রীদের বাড়ি ফেরা বা কর্মে ফেরা নিয়ে প্রচুর চাপ থাকলেও কেউ টিকিট পায়নি, কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হইছে অথবা টিকিট ব্ল্যাকিং হইছে এমন অভিযোগ নেই। সবাই টিকিট পাইছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ট্রেনে যাতায়াত করছে। মোহনগঞ্জ-ঢাকা রুটে ট্রেন চালু হওয়ার পর এতটা সুশৃংখল অবস্থা কখনো ছিল বলে মনে হয়না