রবিবার ২৮শে মার্চ, ২০২০ ইং ১৫ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

দায়িত্ব নিয়েই কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বেন ঢাকার দুই মেয়র

আপডেটঃ 12:15 pm | February 29, 2020

বিশেষ প্রতিনিধিঃ শপথ নিয়েছেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিট করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূর তাপস। এখন অপেক্ষা মে মাসের। কেননা উভয় সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী মে মাসে। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন নতুন মেয়র ও কাউন্সিলররা। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গুসহ বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন ঢাকার দুই নগর পিতা।

বৃহস্পতিবার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মশক নিধনের ব্যাপারে ঢাকার মেয়র ও কাউন্সিলরদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস এখনও আমাদের দেশে আসেনি। তারপরও আমরা আলাদা ব্যবস্থা নিয়েছি। ডেঙ্গু সমস্যা মোকাবিলায় এখন থেকেই মশা নিধনে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন করোনাভাইরাস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সময় ঢাকার দায়িত্ব বুঝে নেবেন আতিকুল ও তাপস। ঢাকায় এখনো এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী না পাওয়া গেলেও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঝুঁকি রয়েছে। তাই জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আর এই কাজ নাগরিক সেবাদানকারী সংস্থা হিসেবে সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। এর বাইরে জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি তো আছেই। তাছাড়া বায়ু ও শব্দ দূষণ, খাল-ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা ও নতুন এলাকায় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করে পরিকল্পিত উন্নয়ন করা মেয়রদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে করপোরেশনের অন্যান্য কাজ গুছিয়ে পরিকল্পনার তেমন সময় পাবেন না। তাই দায়িত্ব নেওয়ার আগের আড়াই মাস কাজ ভাগ করে পরিকল্পনা এগিয়ে রাখতে পারেন।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আগামী জুন মাস থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে বর্ষার বৃষ্টি শুরু হতে পারে। ওই সময় বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা ছাড়াও মশার বংশ বিস্তার ঘটতে পারে। বিশেষ করে এডিস মশার প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঢাকার দুই মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বর্ষা শুরু হবে। এই বর্ষায় রাজধানীতে ফের জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাত হলে নগরীর বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। যদিও জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনের না। তবুও নগরবাসীর জলাবদ্ধতা হলে নগরবাসীর সমালোচনার মুখোমুখি হতে পারেন মেয়রদ্বয়। তাছাড়া নির্বাচনের আগে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রম্নতিও দিয়েছিলেন তারা।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়রের একার পক্ষে এত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে পরিকল্পনার মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে এসব সমস্যার সমাধান করতে না পারলে দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে ঢাকা।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, নতুন মেয়ররা দায়িত্ব নিয়েই ঢাকার সব সমস্যা সমাধান করতে পারবেন না। বিশেষ করে আসন্ন বর্ষায় যে জলাবদ্ধতা হবে, তা সমাধানের পুরো দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হতে নেই। এর সঙ্গে ওয়াসার খাল, ড্রেন ও রাজউকের ভবন অনুমোদনের বিষয় জড়িত। দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও রাজউকের মধ্যে সমন্বয় করতে পারলে ঢাকার বড় সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়র নতুন হলেও সিটি করপোরেশনে যারা কাজ করবেন; তাদের সবার অভিজ্ঞতা আছে। উত্তরের মেয়র আগেও এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই কাজের ক্ষেত্রে কেনো সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে সিটি করপোরেশনের কাজের পাশাপাশি সেবা সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।

মেয়রদের দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়টুকু ঢাকার সমস্যা সমাধানে গবেষণা করে পরিকল্পনা তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবীব। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের হাতে নাগরিক সমস্যা সমাধানের সব ক্ষমতা না থাকলেও নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে মেয়রদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তাই তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে এগুতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবেলার ক্ষেত্রে ক্রাশ প্রোগ্রাম, ফগিং করা বা প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করলেই হবে না। এর জন্য জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বের প্রস্তুতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সিলরদের নিয়ে স্থায়ী কমিটি তৈরি করে এর কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে ফেলতে হবে, যাতে দায়িত্ব গ্রহণের পর আর সময়ক্ষেপণ না হয়।

বর্তমানে থাকা ১৪টি স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বাড়ি ও কর্মক্ষেত্র নিরাপদ করার জন্য অগ্নিনিরাপত্তা, জলাধার সংরক্ষণ এবং উন্মুক্তস্থান ও খেলার মাঠসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি যোগ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, অঞ্চল ও ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করে এসব স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক কাজগুলো করতে পারেন। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে নাগরিক সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পস্ন্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা মেয়রদের সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা শেয়ার করতে পারেন। নতুন কাউন্সিলরদের কাছ থেকে ওয়ার্ডভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কাজগুলো ভাগ করে বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। এর মধ্যে এলাকাভিত্তিক জলাবদ্ধতা, যানজট ও ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানে কী করা যায় তার খসড়া তৈরি করে রাখতে পারেন। এতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আর সময় নষ্ট হবে না। সরাসরি কাজ শুরু করতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, গত ১ ফেব্রম্নয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিজয়ী হন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূও তাপস। এরপর বৃহস্পতিবার শপথ নিলেও দায়িত্ব নিতে অপেক্ষা করতে হবে আরও প্রায় আড়াই মাস।

এর আগে ২০১৫ সালের গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেযর নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন। ওই বছরের ৬ মে শপথ নেন আনিসুল হক আর সাঈদ খোকন শপথ নেন ৭ মে। আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১১ মাস ডিএনসিসিতে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন আতিকুল ইসলাম। নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে ভোটের আগে পদত্যাগ করতে হয় তাকে। বর্তমানে সংস্থাটির ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। আর নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দক্ষিণে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এখনও দায়িত্বে আছেন সাঈদ খোকন।