রবিবার ২৮শে মার্চ, ২০২০ ইং ১৫ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

স্বল্প আয়ের মানুষের টিকে থাকা দায়

আপডেটঃ 12:22 pm | February 29, 2020

নিজস্ব প্রতিবেদক :চ্যানেল সেভেন- এবার একই সঙ্গে বাড়লো নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবাপণ্য বিদ্যুৎ ও পানির দাম। এতে দেশের মানুষের জীবনযাপনের খরচ আরো বাড়লো। এমনিতে চাল, পিয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি, আদা-রসুনসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের অতিরিক্ত দামে অস্বস্তিতে রয়েছে সাধারণ মানুষ। চালের দাম বাড়ানো হয়েছে কয়েক দফা। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ ও পানির মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা দ্রব্যের দামকে আরো উসকে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে, ব্যাপকভাবে চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে; ওই অনুপাতে আয় না বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা পড়েছেন বিপাকে। পারিবারিক ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আয় ও ব্যয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। মাসিক আয়ের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগই ব্যয় হয় বাড়ি ভাড়ায়। সঙ্গে যোগ হয় পোষ্যদের স্কুল-কলেজের বেতন, যাতায়াত ভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়। এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্যুত-পানিসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে।

জানা গেছে, আগামী মার্চ থেকে বিদ্যুৎ ও পানির দাম বৃদ্ধি কার্যকর হবে। ফলে চাহিদা অনুসারে সরবরাহ না মিললেও এপ্রিল থেকে গ্রাহককে পানি ও বিদ্যুতের জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৫.৩ শতাংশ। দাম বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি হতদরিদ্র গ্রাহকদের (লাইফলাইন ট্যারিফ, ৫০ ইউনিট পর্যন্ত) ক্ষেত্রে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সারাদেশের জন্য প্রযোজ্য হলেও পানির দাম বৃদ্ধি কার্যকর হবে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর গ্রাহকদের জন্য।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো দরকার ছিলো না। এমনকি গণশুনানিতে দাম বাড়ানোর পক্ষে কোনো যুক্ত দেখাতে পারেনি প্রস্তাব নিয়ে আসা বিতরণ কোম্পানিগুলো। তিনি বলেন, মূলত বিদ্যুৎ খাতে যে লুটপাট চলছে, তা অব্যাহত রাখতে অযৌক্তিক ব্যয় থেকে সরে আসার চেষ্টা করেনি বিইআরসি।

এদিকে, ঢাকা ওয়াসার প্রতি হাজার লিটার পানি আবাসিকে বেড়েছে ২৪.৯৭ শতাংশ ও বাণিজ্যিক ৭.৯৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম ওয়াসার আবাসিক প্রতি হাজার লিটার পানিতে ২৫ শতাংশ এবং বাণিজ্যিকে ৯.৯৪ শতাংশ দাম বেড়েছে।
ঢাকা ওয়াসার বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতি ১ হাজার লিটার পানির অভিকর আবাসিকে ১১.৫৭ টাকার স্থলে ১৪.৪৬ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ৩৭.০৪ টাকার স্থলে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পানির বাড়তি দাম আগামী ১লা এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।

এই দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকদের। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকদের মাসিক বিদ্যুতের খরচ ১০০ টাকার ওপর বাড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পানির জন্য বাড়তি ব্যয়।
এছাড়া কয়েক মাস ধরে বেশ কয়েকটি ভোগ্যপণ্য এবং পিয়াজসহ প্রায় সব ধরনের সবজি ও মসলার বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। আগে সব ধরনের মসলার পেছনে যা ব্যয় হতো এখন তারও চেয়ে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে শুধু পিয়াজের পেছনে। বারবার জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বাসভাড়া ও যাতায়াত খরচ। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বেড়েছে পণ্যমূল্যও। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

এর প্রমাণ মেলে ক্যাবের জরিপে। তথ্যমতে, গত এক বছরে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে আয় বেড়েছে ৪-৬ শতাংশ। আয় আর ব্যয় ব্যবধান বেড়েছে ১০-১১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস, নিত্যপণ্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে বেশ কয়েক গুণ। পারিবারিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কমে যাচ্ছে সঞ্চয়। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ডিসেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়ায় ৫.৭৫ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে আরেক ধাপ কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৫৭ শতাংশে, যা নভেম্বরে ছিল ৬.০৫ শতাংশ। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের মূল্যস্ফীতির হিসাবে গরমিল রয়েছে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্প হুমকির মুখে। আবার বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানো হলো। এতে শিল্প উৎপাদন, বিশেষ করে পোশাক খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বাধাগ্রস্ত হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

এদিকে, রমজান আসতে এখনো দেড় মাস বাকি। এরই মধ্যে হু হু করে বাড়ছে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, ময়দা, রসুন, আদা, মাছ, মুরগি, দুধ, ডিম, খেজুরসহ সব কিছুরই দাম বাড়তি। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপে মধ্যবিত্তের এখন টিকে থাকাই দায়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য যাতে না বাড়ে সে জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। রমজানে সবধরনের পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির পাঁয়তারা ও অবৈধ মজুদ রোধে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। মন্ত্রণালয় জানায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর খোলাবাজারে ভর্তুকি মূল্যে সর্বোচ্চ ২০ গুণ বেশি রমজানসংশ্লিষ্ট ছয় পণ্য বিক্রি করবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।

বেসরকারি ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা খায়রুল হোসেন বলেন, পরিবারের চাপে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন। এখন যা বেতন পান তার একটা বড় অংশ দিয়ে ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করেন। বাকি অংশ দিয়ে বাড়ি ভাড়া দেন। এরপর যা থাকে তা দিয়ে কোনো রকমে সন্তানের স্কুলের বেতন আর মাসিক হিসাবের চাল কেনেন। মাস শেষ হওয়ার আগেই হাত খালি হয়ে যায়। ফলে ধার-কর্য করে চলতে হয় মাসের শেষ সপ্তাহ। এটা কয়েক বছর ধরেই হয়ে আসছে। এরপর হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে ঋণ করা ছাড়া কোনো পথও খোলা থাকে না।

ঢাকায় রংয়ের কাজ করেন কামাল হোসেন। তিনি বলেন, সারা মাসে আয় করেন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। থাকেন রাজধানীর বাড্ডা এলাকায়। দুই রুমের আধা পাকা বাড়ির ভাড়া ৮ হাজার টাকা। সঙ্গে যোগ হয় বিদ্যুৎ ও পানি ও গ্যাস বিলের জন্য আরো ২ হাজার টাকা। এক মেয়ে স্কুলে যায়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। কিন্তু একজন হাউস টিউটর রেখেছেন। সেখানে প্রতি মাসে গুনতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। পক্ষঘাতগ্রস্ত মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে হয় প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা। মাসে খুব বেশি হলে ৪ থেকে ৫ দিন মাছ কিংবা মাংস কিনতে পারেন পরিবারের সদস্যদের জন্য। তাও তেলাপিয়া কিংবা নলা মাছ আর বয়লার মুরগি। কোরবানি ছাড়া গরুর মাংস প্লেটে জোটে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি সব সময়ই নিম্ন ও মধ্য শ্রেণির মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে। এবার সেটা একটু বেশিই হয়েছে। কেননা, গত কয়েক মাস ধরে পিয়াজসহ অন্যান্য সবজির বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানো হলো। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি পণ্যের দাম বাড়ানোয় শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে। সাধারণ মানুষের জীবনে এর আঘাত আসবে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। তার মতে, বিদ্যুতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে এ খাতে দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, মানুষের ওপর বোঝা চাপানোর আগে দুর্নীতি বন্ধ করা উচিত।

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে হতাশার কথা জানিয়েছেন। এমন একসময় বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানো হলো, যখন করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের পুরো অর্থনীতি প্রায় স্থবির। চীন থেকে কাঁচামাল না আসায় বেশকিছু শিল্পোদ্যোক্তা হাত গুটিয়ে আছেন। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও পানির মূল্য বৃদ্ধি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে শিল্পের উৎপাদন খরচ। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে শিল্প-কারখানা।

বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, চার বছরে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নানা কারণে আমাদের খরচ বেড়েছে ২৯.৪০ শতাংশ। তার বিপরীতে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের দাম কমিয়েই যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত শিল্পের জন্য ভালো হলো না।

বিকেএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বর্ধিত বিদ্যুৎ বিলের এই ভার বহন করার ক্ষমতা শিল্পের নেই। বিদ্যুতের বিল বাড়ানো তো উচিতই হয়নি। বরং আগামী দুই বছরের জন্য কমানো দরকার ছিলো।