শুক্রবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং ৩রা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

নরসিংদী জেলা প্রশাসনের দৃঢ় ভূমিকায় ব্রহ্মপুত্র নদে নতুন প্রাণের সঞ্চার….

আপডেটঃ ১২:৫০ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার-: নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী পৌর শহর এলাকার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদকে দখল মুক্ত করায় মরে যাওয়া এ ব্রহ্মপুত্র নদে যেন নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে। মাধবদী শহর পরিণত হতে যাচ্ছে নদী বাহিত এক মডেল শহরে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালা বাস্তবায়নে বদ্ধকর নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন এর পরিকল্পনা ও দিক নির্দেশনায় নরসিংদী সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার(ভূমি) মোঃ শাহআলম মিয়া উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেন। বিগত ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে এ নদ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ব্রহ্মপুত্র নদের প্রায় ৫কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে ১৫৭ জন ব্যক্তি অবৈধভাবে ১ থেকে ১৩ তলা বিশিষ্ট ২৫৬টি ভবন স্থাপন করে ব্রহ্মপুত্র নদকে মৃত প্রায় করে রেখেছিল। জল হারিয়ে ফেলেছিল তার প্রবাহ। বোঝার কোন উপায়ই ছিল না যে এখানে একটা নদ আছে বা ছিল।
নদ তার অস্তিত্ব হারিয়ে পরিণত হয়েছিল শিল্প অধ্যুষিত মাধবদী এলাকার শিল্প-কলকারখানার নির্গত পঁচা পানির এক ডোবায়। পরিবেশ হয়ে উঠেছিল বিষময়। ব্রহ্মপুত্র নদের মাধবদী বাজার এলাকায়ই ছিল প্রায় ১০০টি বহুতল অবৈধ ভবন।
তাঁত শিল্পকে কেন্দ্র করে মাধবদী থানা এলাকা আজ সমৃদ্ধ এক বৃহৎ শিল্প নগরীতে পরিণত হয়েছে। সারা বাংলাদেশের লোক এখানে ব্যবসায়ের সাথে সম্পৃক্ত।
প্রায় আট লক্ষ লোকের বসবাস এখানে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যাংক,বীমা ও অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান। সুযোগ বুঝে অসাধু ব্যাক্তিবর্গ স্থানীয় তহসিল অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরের ব্যাপক অংশ নাল জমিতে শ্রেণিভুক্ত করে গড়ে তুলেছিল ভবনের পর ভবন।
ফলে মাধবদী বাজার-শহরের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া প্রশস্ত্র উত্তাল তরঙ্গে বহমান ব্রহ্মপুত্র নদের চিত্র বদলে যায়। পরিণত হয় পঁচা পানির ডোবা সরু খালে। মাধবদী পরিণত হয় পানি নিস্কাশন বিহীন শহরে। অল্প বৃষ্টিতেই মাধবদী শহর তলিয়ে যেত পানিতে।
একসময় যেই ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে মাধবদী বাজার-শহর, অবৈধ দখলদারদের কারণে সেই নদ পরিণত হয়েছিল পরিবেশ দূষণের এক পঁচা ডোবা-নালায়। হারিয়ে যায় সেইদিন,যে দিন এ নদেই সওদাগররা আসতো তাদের মাল বহনকারী বড় বড় নৌকা নিয়ে।
নরসিংদী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মাধবদীর পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের প্রাণ বাঁচাতে ২০১৪ সালে অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন শুরু করে জেলা প্রশাসন। কয়েক ধাপে ২০১৭ সালে তালিকা প্রণয়ন চূড়ান্ত হয়। ২০১৯ সালে তালিকা মোতাবেক ১৫৭ জন অবৈধ দখলদারকে তাদের দখলে থাকা অবৈধ স্থাপনা নিজ উদ্্েযাগে নিজ নিজ খরচে সড়িয়ে নেয়ার জন্য নোটিশ দেয়া হয়।
নোটিশ পেয়ে ১০৬ জন অবৈধ দখলদার তাদের অবৈধ স্থাপনা সড়িয়ে নেন। বাকী ৫১ জন অবৈধ দখলদারের স্থাপনার নথি সৃজন করে গত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে উচ্ছেদ অভিযান কার্যক্রম শুরু হয়।
জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন মহোদয়ের বিচক্ষণ দিকনির্দেশনায় নরসিংদী সদর এসি(ল্যান্ড) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহআলম মিয়ার নেতৃত্বে মাধবদী বাজার এলাকায় ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী সাতশত মিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে যেয়ে একাধিক মামলার সম্মূখিন হতে হয়েছে জেলা প্রশাসনকে।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ফলে কতিপয় ব্যবসায়ী ভাড়াটিয়া দোকানদার আপাতত: দৃষ্টিতে সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ্য হলেও স্থায়ীভাবে উপকৃত হওয়ার স্বপ্নে উল্লাসিত এলাকার জনগণ।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ফলে নদের প্রশস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে আগের মতো নৌপথে কম খরচে ব্যবসায়ীগণ মালামাল পরিবহনে যেমন সুযোগ পাবেন, তেমনি পরিবেশ হবে দূষণ মুক্ত। অপরদিকে, নদ পরিবাহিত মাধবদী শহর পরিণত হবে আধুনিক সাজে সজ্জ্বিত নান্দনিক শহরে। হয়তোবা অচিরেও স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাংলার ঐতিহ্যবাহী সাঁতার প্রতিযোগিতা আর নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতারও আয়োজন হবে প্রাণ ফিরে পাওয়া এই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে। অচিরেই ব্রহ্মপুত্র নদ পরিবাহিত শীতল বাতাসে প্রাণ জুড়াতে শুরু করবে মাধবদীবাসী।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন,“অবৈধ দখল থেকে সকল নদ-নদী উদ্ধার করতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদ-নদী আমাদের জাতীয় সম্পদ।
আর সরকারি সম্পদ রক্ষায় নরসিংদী জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। যা করেছি বা করছি তার সবটুকুই জনকল্যাণে করেছি। শুধু জেলার প্রধান কর্মকর্তা হিসেবেই নয় পারিবারিকভাবেই আমি মানুষের কল্যাণমুখী কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করি। সকলের সহযোগিতা পেলে মাধবদীকে সকল ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ মুক্ত একটি মডেল শহরে পরিণত করে যাবো।
নদী উদ্ধার ও খনন কাজের সার্বিক দায়িত্ব প্রাপ্ত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লে.কর্নেল কিসমত হায়াত বলেন, এটা আসলে ব্রহ্মপুত্রের একটা শাখা নদ । নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্ধ হয়ে মূল ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছে। লাঙ্গলবন্ধে হিন্দুদের পবিত্র স্থান অনুষ্ঠান হয় প্রতিবছর। হিন্দু ধর্মীয় মানুষজন ব্রহ্মপুত্রের জলকে পবিত্র গঙ্গা জল মনে করে। সেই পবিত্র নদ তো শিল্পকারখানা,বাজার আর মানুষের ত্যাগ করা বর্জ্যে পঁচা নালায় পরিণত হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করছেন। স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য লে.কর্ণেল(অব:)মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু বীর প্রতীক, মাধবদী পৌরসভার মেয়র আলহাজ¦ মোশারফ হোসেন প্রধান আমাদের সহযোগিতা করছেন।
অনেকে অবৈধভাবে দখল করে নদীকে ব্যবহার করেছেন। এভাবে তো আর নদীকে ব্যবহার করতে দেয়া যায় না। সরকারী পরিকল্পনা মোতাবেক নদীকে নদীর পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
যাদের বয়স বর্তমানে ৩০ বছর,তারাও এটাকে একটা ভাল নদী হিসেবে দেখেছিল। সেই পরিবেশ আমরা ফিরিয়ে আনবো। আর এলাকাবাসীর দাবী হিসেবে নদের দু’পাশ ঘেষে আড়াই কিলোমিটার ব্যাপী হেটে চলার রাস্তাসহ বিশেষ সৌন্দর্যমন্ডিত করা হবে মাধবদীকে।
সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কোর সার্বিকভাবে কাজ করছে। নরসিংদী জেলা নদী রক্ষা কমিটির বিশেষ সভা গত ৭ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন এঁর সভাপতিত্বে হয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের প্রধান আসবেন কার্যক্রম দেখতে।
তিনি আরো বলেন, ২০১৭ সাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী ব্রহ্মপুত্র নদ খননের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ২০১৭ সালে স্থানীয় জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাদের পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে যখন খনন কার্য শুরু হয়,তখন তারা আমাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়। গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে নরসিংদীর মাধবদী পৌর এলাকার চার কিলোমিটার ব্যাপী উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়। আশাকরি ২০২১সালের মার্চের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে পারবো।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন- সেনাবাহিনী,পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নরসিংদী জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় সেনাবাহিনী কর্তৃক নদী উদ্ধার ও খনন কার্যক্রম চলছে। নদী খননের কাজ সার্বিকভাবে সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়েছে। সিএস রেকর্ড মোতাবেক এ কাজ করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি আমরা।
তিনি বলেন, সারা নরসিংদীতে ২৩১ কিলোমিটার নদী খননের মধ্যে ১৫০কিলোমিটারের খনন কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদ উদ্ধারে অবৈধ দখলদারদের স্থাপনা উচ্ছেদ কাজে নেতৃত্বদানকারী সদর এসি(ল্যান্ড) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহআলম মিয়া বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে জনকল্যাণে ব্যাপক মানুষের স্বার্থে মাননীয় জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন স্যারের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনায় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে এলাকাবাসীসহ সকলের সহযোগিতায় নদের তীর থেকে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছি।
মাধবদীবাসী এখন সুস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাধবদীতে বসবাস করতে পারবে। শুধু নদ-নদী থেকেই অবৈধ দখলদার মুক্ত করায় সীমাবদ্ধ নই; জেলার সকল সরকারি সম্পদ রক্ষায় জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সরকারি সম্পদ থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মাধবদী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর, মাধবদী শাখা ‘সূজন সুশাসনের জন্য নাগরিক’ এর সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন মাধবদীর পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ উদ্ধারের কাজে সম্পৃক্ত জেলা প্রশাসন,সেনাবাহিনীসহ সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, বহমান ব্রহ্মপুত্র নদ ফিরে পাওয়ার আনন্দে এলাকাবাসী আনন্দিত।
উদ্ধারের পর এ নদে যেন আর বর্জ্য ফেলা না হয়। ফেলতে দেয়া না হয়। বর্জ্যপূর্ণ অবস্থা যেন ফিরে না আসে কোনদিন, জেলা প্রশাসন যেন সেদিকে খেয়াল রাখেন এটা এলাকাবাসীর দাবী। নদের দু’পাশে যে রাস্তা করা হবে সেখানে যেন আমরা প্রাণ খুলে সুন্দর পরিবেশে সকাল-বিকাল হাটতে পারি সে অপেক্ষায় এলাকাবাসী দিন গুনছে।