মঙ্গলবার ১৫ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১লা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

বিমানবন্দরে কড়াকড়ি…

আপডেটঃ ১:৪৮ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ২৪, ২০২০

বিশেষ প্রতিনিধি:- আকাশপথে করোনা পজিটিভ যাত্রী আসার হার অনেকাংশে কমে গেছে। বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ সংখ্যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তবে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হযরত শাহজালালসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর দিয়ে করোনা আক্রান্ত রোগী বিদেশ থেকে দেশে প্রবেশ করছেন। সিভিল এভিয়েশনসহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কড়াকড়ি থাকার পরও সনদ ছাড়া যাত্রীরা টাকার বিনিময়ে হেলথ কার্ড পাচ্ছেন। এ কাজে কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল-আহসান বলেন, আমরা চাই সবাই আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক। একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি যদি দেশে-বিদেশে যাওয়ার হেলথ কার্ড পান তাহলে এটা দুঃখজনক। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি বিদেশে চলে গেলে সেসব দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
নেগেটিভ সনদ ছাড়া করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের (সেকেন্ড ওয়েভ) সংক্রমণ ঠেকাতে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া বিদেশ থেকে আগত যাত্রী সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত যাত্রীদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে গত ৫ ডিসেম্বর নির্দেশনা জারি করে বেবিচক।
এতে বলা হয়, দেশি-বিদেশি কোনো ফ্লাইটেই আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করানো করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। নির্দেশনা অমান্য করায় রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ একাধিক দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইন্স ও এর যাত্রীদের আর্থিক জরিমানা করেন বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট ৬২ হাজার ৬৪৪ জন যাত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। তাদের মধ্যে এক হাজার ৮২১ জন যাত্রী আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরির করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া চলে আসেন। কেউ কেউ আবার এন্টিজেন টেস্টে করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া আবার কেউবা করোনা পজিটিভে আক্রান্ত হওয়া সত্তে¡ও চলে আসেন। সনদ ছাড়া যারা এসেছেন তাদেরকে সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি ও আশকোনা হজ ক্যাম্পে স্থাপিত কোয়ারেন্টিন সেন্টারে এবং পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। চলতি মাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রুটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৬৪৪ জন। এই সময়ে কোয়ারেন্টিনে থাকা রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে তিন হাজার ৮৭৩ জন (৩০৪ জন কোয়োরেন্টিন), দুই হাজার ৯৫৭ জন (কোয়োরেন্টিন ১৯৫ জন), তিন হাজার ২২৩ জন (কোয়োরেন্টিন ২৩৫ জন) তিন হাজার ৫ জন (কোয়োরেন্টিন ৮০ জন), তিন হাজার ৫১৯ জন ( কোয়োরেন্টিন ৪৮ জন), পাঁচ হাজার ৭৩৬ জন (কোয়োরেন্টিন ১১৮ জন), তিন হাজার ৮৪৭ জন (কোয়োরেন্টিন ৩০ জন), চার হাজার ১৩৫ জন (কোয়োরেন্টিন ২৩ জন), তিন হাজার ৮৮১ জন (কোয়োরেন্টিন চার জন), চার হাজার ৫০ জন (কোয়োরেন্টিন ২৬৫ জন), চার হাজার ২৭৯ জন (কোয়োরেন্টিন একজন), চার হাজার ৩৭৩ জন (কোয়োরেন্টিন ৪১৬ জন)। সর্বশেষ গত ২০ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে ২১ ডিসেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৭টি ফ্লাইটে মোট চার হাজার ৩১৩ জন দেশে ফেরেন। ২৭টি ফ্লাইটের মাত্র একটি ফ্লাইটে (এসবি ৩৮৮৪) একজন করোনা পজিটভ রোগী আসেন। তাকে আশকোনায় কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠানো হয়।
করোনার আরটি পিসিআর নেগেটিভ রিপোর্ট ছাড়া কিংবা করোনা পজিটিভ যাত্রী নিয়ে আসাসহ বিভিন্ন কারণে যেসকল এয়ারলাইন্সকে জরিমানা করা হয় তাদের মধ্যে মালদিভিয়ান এয়াইলাইন্সকে ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, এয়ার এশিয়াকে এক লাখ টাকা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ৩০ হাজার টাকা, সউদী এয়ারলাইন্সকে দুই লাখ টাকা এবং ইতিহাদকে এয়ারওয়েজকে দুই লাখ টাকা।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, বেবিচকসহ বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার ব্যাপক তৎপরতা ও কঠোরতার ফলে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স আরটি পিসিআর ল্যাবরেটরিতে করা করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া যাত্রী পরিবহন করছে না। শুরুর দিকে কোনো কোনো ফ্লাইট সর্বোচ্চ তিন শতাধিক সনদ ছাড়া যাত্রী পরিবহন করলেও বর্তমানে তা এক দুইজনে নেমে এসেছে।
এর আগে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে বিদেশ গমনকারীদের জন্য চলতি বছরের ২৩ জুলাই থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক করে সরকার। এ জন্য বিদেশগামী যাত্রীদের ১৬টি নির্ধারিত পিসিআর ল্যাব থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করাতে অনুরোধ জানানো হয়। এতকিছুর পরেও আকাশপথে করোনার নেগেটিভ সনদ ছাড়া যাত্রী আসছে। তারা হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে নেমে টাকার বিনিময়ে নানা ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে শাহ আমানত ও ওসমানী বিমানবন্দরেও।
করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া কোনো যাত্রীকে বিমানে ওঠানো যাবে না বলে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থাকলেও সেটি মানছে না অনেক এয়ারলাইন্স। খোদ রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ার বাংলাদেশ বিমানও সুযোগ পেলেই উপেক্ষা করছে সরকারের এই নির্দেশনা। ইতোমধ্যে এই নির্দেশ অমান্য করায় বিমান, সৌদিয়া এয়ারলাইন্স ও এয়ার এরাবিয়াকে মোটা অংকের টাকা জরিমানা করা হয়েছে। লিখিতভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকেও হেলথ টোকেন দিয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা। সেইসঙ্গে করোনা নেগেটিভ সনদ না থাকলেও অনেককে হেলথ টোকেন দেয়া হচ্ছে। এতে অনেক যাত্রীকে বিদেশ থেকে আবার বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোও হয়েছে। স¤প্রতি শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ উল আহসান এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর একটি চিঠিও দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী কোভিড-১৯ টেস্টের সনদ পরীক্ষা করে শুধু নেগেটিভ সনদধারীদের হেলথ টোকেন দেয়ার নিয়ম। কিন্তু ১৭ নভেম্বর দায়িত্বরত এক স্যানিটারি ইন্সপেক্টর করোনা পজিটিভ সনদ থাকা সত্তে¡ও কয়েকজন যাত্রীকে হেলথ টোকেন দেন। সাউদিয়া এয়ারলাইন্সযোগে ওইসব যাত্রী সউদী আরব গেলেও পরবর্তীতে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। এছাড়া গত ২০ নভেম্বর হেলথ ডেস্কে দায়িত্বরত অপর এক স্যানিটারি ইন্সপেক্টর যাত্রীর কোভিড-১৯ পজিটিভ সনদ থাকার পরও হেলথ টোকেন দেন। পরে ওই যাত্রীকে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বোর্ডিং কার্ড ইস্যু না করে ফেরত পাঠিয়ে দেন। পরে তাকে বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য বিভাগ কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে।
বেবিচকের অনুযায়ী বিএমইটি কার্ডধারী বাংলাদেশি কর্মীরা যে দেশে আছেন সেখানকার পিসিআর ল্যাবে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা সহজলভ্য না হলে তারা অ্যান্টিজেন বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য পরীক্ষার সনদ নিয়ে দেশে আসতে পারবেন। এছাড়া বিমানবন্দরে কর্মরতদের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ যাত্রী, ক্রু ও উড়োজাহাজ জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে করতে হবে। বিশেষ করে চীন, সউদী আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যে চলাচল করা ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কার্যকর। কিন্তু অনেক বিমান সংস্থা এ নির্দেশনা মানছে না। স¤প্রতি ১০টির বেশি এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে পাঁচশ’র বেশি যাত্রী করোনা সনদ ছাড়াই শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেন। কিছুদিন আগে সউদী এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মকবুল ও মহসিন নামে দুই যাত্রী করোনা পজিটিভ সার্টিফিকেট থাকার পরও দেশে আসেন। পরে তাদের বিমানবন্দর থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।
করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় চলতি বছরের শুরুর দিকে কয়েক লাখ যাত্রী দেশে আসেন। সে সময় কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কাই করা হয়নি। বরং বিমানবন্দরের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ২ থেকে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে করোনা আক্রান্ত যাত্রীকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়। অনেকে পজিটিভ সনদ নিয়ে এলেও বিমানবন্দরে টাকার বিনিময়ে তা নেগেটিভ করা হয়। এমন কয়েকটি ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে।