শনিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

ভারত যাচ্ছেন বিএনপির দশ নেতা

আপডেটঃ ৭:২০ অপরাহ্ণ | মে ২৬, ২০১৪

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগেই ভারতীয় জনতা পার্টি- বিজেপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার খবরে নরেন্দ্র মোদিকে আগাম অভিনন্দন জানিয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। এজন্য সরকার গঠনের পরপরই ‘দাদার আশীর্বাদ’ নিতে চাইছে দলটি।

দলের এক দায়িত্বশীল নেতা এমনই ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, সে অনুযায়ী কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দলের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেছে বিএনপির হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে নরেন্দ্র মোদি শপথ গ্রহণের পরপরই ভারত সফরে যাচ্ছেন বিএনপির ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল।

সূত্রটি আরো জানায়, মোদি সরকার গঠনের পর বিপুল উৎসাহ নিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। নির্বাচনের আগে ‘চরম ভারতবিদ্বেষী’ হলেও এখন সে দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তারা। নেতারা মনে করছেন, বিজেপির জয় এবং ভারতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন স্বস্তি এনে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকটা হতাশায় নিমজ্জিত দল বিএনপিকে।

দলটির নেতারা আশা করছেন, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অমীমাংসিত ইস্যু এবং বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে’ জনগণের পাশে থাকবে ভারতের নতুন সরকার। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে সময় অনুযায়ী ভারতের নতুন সরকার ‘চাপ প্রয়োগ’ করবে- সে আশাও পোষণ করেন তারা। তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক রয়েছে সেটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নয়, আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে সম্পর্ক। দুই দেশের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে বিএনপি এখন এক নম্বর অ্যাজেন্ডা বলে মনে করছে। সূত্রমতে, দলটি মনে করছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এবং পরে যেভাবে আন্দোলন হয়েছে তা অতীতে খুব একটা হয়নি। সারা দেশ থেকে রাজধানীকে কার্যত যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু ঢাকায় আন্দোলন না জমার কারণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করা যায়নি। এর পেছনে দল সাংগঠনিকভাবে যতটা না ব্যর্থ, তার চেয়ে সরকারের মারমুখী আচরণ মূল বাধা হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করে বিএনপি। তা ছাড়া ভোটারবিহীন নির্বাচন করেও সরকার বন্ধু দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছে। বিএনপি ভোটারবিহীন নির্বাচনের চিত্র, হত্যা, গুম ও অপহরণ ইস্যুসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা-পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের কাছে সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করলেও তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

দলের ওই সূত্র আরো জানায়, নির্বাচনের পরে বিএনপির একটি দক্ষ বিশ্লেষক দল এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় যে বিষয়টি উঠে এসেছে সেটি হচ্ছে, সরকারের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ভারতের কংগ্রেস সরকার। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে ভারতের রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ‘নগ্নভাবে’ সমর্থন করেছিল। বিষয়টি বিএনপির মাথাব্যথার কারণ হলেও দলটির বিশ্বাস ছিল, ভোটারবিহীন নির্বাচনে কংগ্রেসের সমর্থন তেমন কোনো কাজে আসবে না। অন্তত ভারত ছাড়া অন্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকরা এমন আভাসই দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কংগ্রেসই বিএনপির সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ আরো ব্যাপক হয়ে দেখা দিয়েছে। সেজন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এই মুহূর্তে বিএনপির এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ভারত সফরে যেতে পারেন। প্রতিনিধিদলে স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য এম কে আনোয়ার, ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির আহ্বায়ক শফিক রেহমান, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দলের ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান, প্রাক্তন পররাষ্ট্রসচিব ও ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক, প্রাক্তন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান, প্রাক্তন সচিব সাবিহ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ থাকবেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য থেকে তারেক রহমানও বিজেপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে উষ্ণ যোগাযোগ রাখছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

দলের অপর একটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের পরে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময়ে সরকারকে সময় দেওয়ার কথা বলে মূলত ভারতের লোকসভা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাই ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় বিএনপির জন্য কাঠফাটা রোদের পরে এক ফোঁটা বৃষ্টির মতোই মনে হচ্ছে। অন্তত ফলাফলের আগেই তড়িঘড়ি করে অভিনন্দন জানানো সে বিষয়কেই প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করেন দেশের রাজনৈতিক মহল।  সেজন্য কঠোর ভারতবিদ্বেষী মনোভাব থেকে ইতিমধ্যে সরে এসেছে দলটি। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই দলের নেতাদের ‘মুখে কুলুপ’ দিতে বলেছে দলের হাইকমান্ড। সভা-সেমিনারে দলের বক্তাদের ভারত প্রসঙ্গে নেতিবাচক কথা বলা এক প্রকার নির্ধারিত থাকলে এখন ভারত সম্পর্কে কোনো কথা বলছেন না তারা। এমনকি দলের চেয়ারপারসনও বিষয়টি এড়িয়ে চলেছেন। সর্বশেষ ২৪ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতির প্রতিবাদ সভায়ও ভারত প্রসঙ্গে একটি বাক্যও বলেননি তিনি। অথচ লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রতিটি অনুষ্ঠানে ভারত প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতা জানিয়েছেন, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ ভুল ছিল। এবার দল সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে চায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক কূটনৈতিক প্রভাব প্রত্যাশা করলেও কার্যত বিমুখ হয়েছে দলটি। সেজন্য এবার কূটনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার প্রচেষ্টার পাশাপাশি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান রাইজিংবিডিকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই যে, এখানে দুই দেশের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। দেশের সঙ্গে দেশের নয়।

তিনি বলেন, এ অবস্থায় যখনই এই দুই দেশের মধ্যে কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন হয়, তখনই সেই সম্পর্কে ধস নামে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক তা-ই হয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নয়। যে কারণে আজকে ভারতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার যারপরনাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

ড. মঈন বলেন, যেটা প্রয়োজন তা হচ্ছে এ দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা। একমাত্র এভাবেই দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। বিজেপি সরকার আসার পর সময়ই বলে দেবে যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে।

ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানে এগিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন দলের অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত সমমর্যাদার। বাংলাদেশের যেসব ন্যায্য অধিকার আছে সে বিষয়ে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত যেমন তার গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখেছে, তেমনি বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে’ জনগণের পাশে থাকবে।

একই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আহমদ আযম খান রাইজিংবিডিকে বলেন, ভারতের গণমানুষের মতামতের ভিত্তিতে একটি সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের যে সরকার দেশ পরিচালনা করছে তা জনগণের মতামতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। সেজন্য দেশে অতি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে ভারতের নতুন সরকার চাপ প্রয়োগ করবে বলে আশা করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাইজিংবিডিকে বলেন, ভারত গণতন্ত্র চর্চা করা বিশ্বের একটি মডেল দেশ। তারা গণতন্ত্রের গভীর শেকড়ে পৌঁছে গেছে। তারা গণতন্ত্রকে যেভাবে শ্রদ্ধা করে তেমনি অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উত্তরণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যতটুকু অবদান রাখা সম্ভব ভারত সেটি করবে বলে বিএনপি বিশ্বাস করে।

তিনি বলেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়কে জনগণের বিজয় হিসেবেই বিবেচনা করে বিএনপি। ভারতের নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মির্জা আলমগীর বলেন, ‘ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে এই দেশের জনগণের মনোভাবকে মূল্যায়ন করে কাজ করবে।’