সোমবার ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

না.গঞ্জে সাত খুন, বিভক্ত আইনজীবীরা মুখোমুখী

আপডেটঃ ১০:২২ অপরাহ্ণ | মে ২৭, ২০১৪

নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের খুনীদের বিচার দাবির আন্দোলনে একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন আইনজীবীরা।

আলাদা আলাদা সংগঠনের ব্যানারে তারা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। একে অপরকে প্রতিহত করার ঘোষণাও দিচ্ছেন তারা। সাত খুনের বিচার চেয়ে আইনজীবীদের এ কর্মকাণ্ডকে অনেকেই বুমেরাং আন্দোলন হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।

আওয়ামীলীগ সমর্থিত আইনজীবীদের সংগঠন সম্মিলিত আইনজীবী পরিষদের নেতারা আইনজীবী সমিতির নেতাদের নাম উল্লেখ করে বলেন, একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের অপরাজনীতির প্রেসক্রিপশনে প্রভাবিত হয়ে তারা উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিয়ে মামলার তদন্তের পিঠে ছুরি ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। তারা জামায়াত শিবিরের এজেন্ডা বাস্তাবায়নে কাজ করছে। তারা নূর হোসেনকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে।

আর প্রতিপক্ষ আইনজীবী সমিতির নেতারা অভিযোগ তুলছেন, সম্মিলিত আইনজীবী সমিতির নেতারা খুনীদের দালাল হিসেবে মাঠে নেমেছে। আবার উভয়পক্ষই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও জেলা পুলিশ সুপারকে ব্যর্থ বলে দাবি করছেন।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত সাত খুনের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবিতে আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচিতে এমন পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন।

এছাড়াও ঘটনার এক মাস পর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো খুনীদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম নেতারা।

দুপুর ১২টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতের সামনে মানববন্ধন করেন সম্মিলিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপুর সভাপতিত্বে মানববন্ধন চলাকালীন সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাদের মানববন্ধনের সাথে যোগ দেয় প্রজন্ম ৭১ এর ব্যানারে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এর আগে সকাল ১১টায় তারা নারায়ণগঞ্জ আদালতের সামনের রাস্তায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুটে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে তারা আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের মানববন্ধনে যোগ দেন।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী সংগঠনের নেতা এবং প্রজন্ম৭১ এর ব্যানারে উপস্থিত সবাই নারায়ণগঞ্জ-৪( ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

সম্মিলিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদের মানববন্ধন চলাকালীন সংক্ষিপ্ত সমাবেশে আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিচার দাবি করা হচ্ছে। আইনজীবী সমিতিতে আমাদেরও ৬ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে। তারা আমাদের কোনো কথা শোনেন না। একটি বিশেষ মহলের অপরাজনীতির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বক্তব্য দেয়া হচ্ছে।

সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য উল্লেখ করে খোকন সাহা বলেন, নূর হোসেন নাকি জনৈক গৌর দার কাছে কলকাতায় আছেন এ তথ্য তার কাছে আছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য নাই নূর হোসেন কোথায় আছে। উনি কীভাবে জানলেন নূর হোসেন কলকতায় জৈনক গৌর দার কাছে আছে। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানাচ্ছি।

সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রসঙ্গ টেনে খোকন সাহা বলেন, ‘সাতজনের লাশ উদ্ধার হওয়ার পর মেয়র আইভী একটি পরিবারের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেছিলেন তিনি সব জানেন। তিনি যদি জেনেই থাকেন কারা খুনী তাহলে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।’

একটি পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে খোকন সাহা বলেছেন, ‘পত্রিকায় দেখেছি নূর হোসেন পালিয়ে যাওয়ার পর পরই গিয়াসউদ্দিন তার মার্কেট দখল করেছে। গিয়াসউদ্দিন কীভাবে জানতো যে নূর হোসেন পালিয়ে যাবে আর এই সুযোগে গিয়াসউদ্দিন মার্কেট দখল করে নিবে। তাই গিয়াসউদ্দিনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানাচ্ছি।’

খোকন সাহা আরো বলেন, ‘সমিতির ১৭ জনের মধ্যে ৬ জন আমাদের। আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা করছেন। গত জানুয়ারি মাসে বনভোজনের জন্য ৫ লাখ টাকা আর শতাধিক গাড়ি এনেছেন। সমিতির সাবেক সভাপতি বারী ভূঁইয়াও এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা জামায়াত শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে।’

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান দিপু বলেছেন, ‘এজাহার নামীয় আসামিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। পুলিশ সুপার বলেছিলেন নূর হোসেন তাদের নজরদারিতে আছে। তাহলে নূর হোসেন পালিয়ে গেল কীভাবে। কোনো আসামি গ্রেপ্তার করা হলোনা অথচ পুলিশ সুপার বলছেন মামলার তদন্তকাজ শেষ পর্যায়। এজাহারের কোনো আসামি গ্রেপ্তার না করে উনি তদন্ত শেষ করলেন কীভাবে?’

আইনজীবী সমিতির নেতাদের উদ্দেশ করে অ্যাডভোকেট দিপু বলেন, ‘স্বার্থন্বেষী মহলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তদন্তের পিঠে ছুরি মারতে চাইছে তারা। তারা নূর হোসেনকে বাঁচাতে চাইছে। নূর হোসেনকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। সাত খুনের সঙ্গে যে ৫ জন বিএনপি নেতা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনজীবী সমিতির কোনো বক্তব্য নাই। সন্ত্রাসীদের কোনো দল নাই। উল্টাপাল্টা কথা বলে কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে তাদের প্রতিহত করা হবে।’

অপরদিকে, জেলা আইনজীবী সমিতির মানববন্ধন চলাকালীন সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, ‘নূর হোসেনের রক্ষিতা নীলার বিরুদ্ধে মামলা করে নূর হোসেনে বিচার চাওয়া যায় না।’ প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তদন্তকাজ শেষ করুন ইন্টারপোলেন নামে কোনো নাটক সাজালে চলবে না।’

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘একমাস অতিবাহিত হলেও ঘটনার রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ তদন্তকারী সংস্থা ও সরকার। ইন্টারপোলেন বিষয়টি সত্য নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কিছু জানে না। অপহরণের সময় অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের ড্রাইভার তার মোবাইলে অপরহণের ভিডিও চিত্র ধারণ করেছিলো। সেই ভিডিও চিত্র বর্তমানে পুলিশের কাছে আছে। ভিডিও চিত্র দেখলেই বোঝা যায় কারা কারা খুনের সঙ্গে জড়িত। তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। নূর হোসেনের সঙ্গে একজন জনপ্রতিনিধিও জড়িত।’

অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান আরও বলেন, ‘কে নূর হোসেনের আশ্রয়দাতা, কে তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। সেটা শামীম ওসমান আর নূর হোসেনের কথোপকথন শুনলেই বোঝা যায়। অডিও প্রকাশ হওয়ার পর শামীম ওসমানের করা সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যই প্রমাণ করে ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের পাশাপাশি শামীম ওসমানও জড়িত।’

সম্মিলিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদের নেতাদের খুনীদের দালাল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা দালাল লেলিয়ে দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করছে। আমরা আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ আছি। জেলা আইনজীবী সমিতিতে কোনো বিরোধ নেই। আমরা চন্দন সরকারসহ সাতজনের হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার বিচার চাই। সে হোক কোনো র‌্যাব কর্মকর্তা, কোনো সন্ত্রাসী বা কোনো জনপ্রতিনিধি।’

এদিকে, দুপুর ২টায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ খান ভাষানী বলেছেন, ‘আমরা অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আছি। বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আলাদা আলাদা কর্মসূচি পালন করা হলেও দাবি আমাদের একটাই চন্দন সরকারের খুনীদের বিচার করতে হবে।’

কারা এবং কোন পক্ষ এ হত্যা মামলার তদন্তকাজ ভিন্নখাতে প্রভাহিত করার চেষ্টা করছে সেটা প্রশাসনের লোকজন ভাল ভাবেই বোঝে বলে উল্লেখ করেন অ্যাডভোকেট ভাষানী।

উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে একসঙ্গে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। মামলায় কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে মোট ১২ জনকে আসামি করা হয়।

গত ৩০ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয় জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয়। গত ৩ মে নূর হোসেনের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার এবং রক্তমাখা মাইক্রোবাস জব্দ করে। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় আরো ৭ জনকে।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাব-১১ এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এরপর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন।

গত ১০ মে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সভায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেনকে থানা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।