শুক্রবার ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

Ad

সর্বশেষঃ

মাদকের রেড জোন হালুয়াঘাট সীমান্ত……………… মাদক নেশায় ঝুঁকছে যুবক

আপডেটঃ ৪:৩৭ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ২৩, ২০১৮

ওমর ফারুক সুমন, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) থেকেঃ  মাদকের রেডজোন হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে হালুয়াঘাট সীমান্তসহ আশপাশের এলাকা। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল এমনকি হেরোইনের মতো ভয়ংকর মাদকের সাথেও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে অনেক মাদক ব্যবসায়ীর। মাদকের ভয়াল ছোবলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যুব সমাজ।মাদক নির্মূলে সরকারি- বেসরকারি ভাবে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও কোনো ভাবেই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। নিত্য নতুন কৌশলে দেশের সীমান্ত দিয়ে হরহামেশাই দেশে প্রবেশ করছে মাদক। এক সময় গোপনে মাদক ব্যবসা চলতো। কিন্তু ইদানীং অনেকটা খোলামেলা ভাবেই মাদকের ব্যবসা চলছে। প্রশাসন বারবার তা নির্মূলের ঘোষনা দিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে বেড়েই চলছে মাদক কেনাবেচা আর সেবন। মাঝে মাঝে ছোটখাটো কিছু মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও বেশিরভাগই রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তেমনি কিছু উল্লেখযোগ্য চিত্র ফুটে উঠেছে। গত ২০ জুলাই মেকিয়ারকান্দা গ্রামের রমজান আলী (৪০) কে ২০ কেজি গাঁজাসহ আটক করে পুলিশ। একই সাথে ৬ এপ্রিল ২ কেজী গাঁজাসহ আতুয়াজঙ্গলের কফিল উদ্দিন (৪০) নামে একজনকে আটক করে হালুয়াঘাট থানা পুলিশ। ১০ এপ্রিল ভারালিয়াকোনা গ্রামের শাহালম (২৭) নামে একজনকে ৩০পিচ ইয়াবাসহ আটক করে। ২৯ ডিসেম্বর ঘোষবেড় গ্রামের মিঠুন মানখিন (২৮) কে ৪ বোতল ভারতীয় মদসহ আটক হয় পুলিশের কাছে। তেমনি ১৮ অক্টোবর ধোপাগুছিনা গ্রামের লাকী (২৫) ও তার শশুর আব্দুল জব্বার ওরফে গেনু মিয়া ৫ গ্রাম হেরোইন ও গাঁজাসহ আটক হয়। ৪ নভেম্বর ২২ পিচ ইয়াবা ও মদসহ মাঝিয়াল গ্রামের জাহাঙ্গীর (৩০) ও শাহজাহান (৩২), মনিকুড়া গ্রামের আয়নাল হক (৩৬) ও আব্দুল খালেক (৫০) আটক হয়। ৫ অক্টবর ২ শত গ্রাম গাঁজাসহ ধারা বাজারের ময়না আক্তার (৪৫) আটক হয়। শুধু তাই নয়, ১২ শত বোতল ফেনসিডিলসহ ভারালিয়াকোনার সুরুজ ও আধা কেজী হেরোইনসহ পূর্ব নরাইলের এক যুবকের আটকের ঘটনাও রয়েছে। এর বাহিরেও প্রচুর আটকের ঘটনা আছে। তারপরেও প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেড়েই চলছে এ ব্যবসা। নিয়ন্ত্রন হচ্ছেনা কোনভাবেই।
বিভিন্ন জরিপ বলছে, দেশের সব শ্রেণির কম বেশি মানুষ এখন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বাদ যাচ্ছে না নারী-কিশোর ও শিশু। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়। বিশেজ্ঞরা বলছে দেশের ৯৫ শতাংশ মাদক আসে বিদেশ থেকে। মাদক আগ্রাসন ঠেকাতে না পারলে আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে প্রতিবছর শুধু নেশার পেছনে খরচ হবে ৬০ হাজার কোটি টাকা। তাই মাদক চোরাচালানের সকল রুটে কঠোর নিরাপত্তা বাড়াতে হবে।
মাদক নিয়ে জাতীয়ভাবে কিছু তথ্যচিত্র তুলে ধরা হলো, মাদকদ্রব্য ও নেশা প্রতিরোধ নিরোধ সংস্থা (মানস) সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে মাদক সেবনের সঙ্গে ৭০ লাখ মানুষ জড়িত। মানস বলছে, দেশে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যাও এখন ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২০ সালের ভেতরে দেশে অন্তত এক কোটি লোক নেশায় আসক্ত হবে। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন ৬৫ লাখ মাদকাসক্ত। এছাড়া মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। সে হিসেবে এদেশে ১৩ লাখের বেশি নারী মাদকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আর ৮৪ শতাংশ পুরুষ মাদকাসক্তের মধ্যে ৮০ শতাংশ যুবক। তাদের ৪৩ শতাংশ বেকার। ৫০ শতাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িত। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী, শিশু ও কিশোররা মাদক ব্যবসায় জড়িত। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী দেশে আসক্তদের ৯০ ভাগ কিশোর ও তরুণ। তাদের শতকরা ৪৫ ভাগ বেকার এবং ৬৫ ভাগ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট। আর উচ্চ শিক্ষিতের সংখ্যা ১৫ শতাংশ। এছাড়া আরেক জরিপে বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে ৩৫ শতাংশ, ছিনতাইয়ে ১২ শতাংশ, মানব পাচারের সহায়তার কাজে ১১ শতাংশ, দুর্র্ধষ সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী হিসেবে ৫ শতাংশ ও অন্যান্য ভ্রাম্যমাণ অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ। পাশাপাশি বোমাবাজিসহ অন্যান্য সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ১৬ শতাংশ পথশিশু। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে অন্তত ২০০ গডফাদার মাদক ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের আবার প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নেটওয়ার্ক রয়েছে। সবমিলিয়ে সারা দেশে অন্তত ১ লাখ ৬৫ হাজার মাদক বিক্রেতা আছে। অনেক সময় অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দেয় আবার নতুন করে অনেকে ব্যবসায় যুক্ত হয়। এ হিসাবে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা আরো কম বেশি হতে পারে। তবে গডফাদাররা মাদকের যোগানদাতা হলেও পাইকারি ও খুচরা ১ লাখ ৬৫ হাজার মাদক ব্যবসায়ী সারা দেশে মাদকের বিস্তার ঘটায়। তাদেরকে ঘিরে আরো ছিঁচকে মাদক ব্যবসায়ীর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। তথ্যমতে গত একবছরে হালুয়াঘাট থানায় মাদক মামলা হয়েছে ৯৮টি, ধর্ষণ মামলা হয়েছে প্রায় ৩০টি, চুরির মামলা ১০টি, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা ৩০ টির মতো। ২৫০ এর অধিক আসামীকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। সুত্রে জানা যায়, ২৫০ জনের মাঝে ১৫০ জনের অধিক শুধুমাত্র মাদক মামলার আসামীই রয়েছে। মাদকের বিষয়ে হালুয়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা বরাবরই লড়াই চালিয়ে থাকি। ইহা নির্মূলে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, আমি নতুন যোগদান করার পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছি। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে ইয়াবা ও গাঁজাসহ আটকও করেছি। আমরা মাদকের বিষয়ে কাউকে ছাড় দিবোনা। তিনি তার জন্যে সকলের সহযোগীতা কামনা করেন।